সন্দেহের তালিকায় পঞ্চান্ন হাজার মুক্তিযোদ্ধার সনদ

সন্দেহের তালিকায় এখন সরকারি গেজেটভুক্ত অন্তত ৫৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধার সনদ। বর্তমানে (১০ নভেম্বর ২০১৪ পর্যন্ত) গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা দুই লাখ নয় হাজার। এর মধ্যে লালমুক্তিবার্তা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিস্বাক্ষরিত সনদ এবং মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের তালিকায় (যা ভারত থেকে পাওয়া) নাম নেই ওই ৫৫ হাজার মুক্তিযোদ্ধার। এই তালিকায় সরকারি চাকরিজীবী যেমন রয়েছেন, তেমনি বেসরকারি ব্যক্তিও রয়েছেন।

দলীয় বিবেচনা বা অন্যান্য অজ্ঞাত কারণে এসব ব্যক্তির নাম মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে গেজেটভুক্ত করা হয়ে থাকতে পারে বলে সন্দেহ মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের। মন্ত্রণালয়ের মতে, সরকারি সুযোগ-সুবিধা নিতে বিশেষ উদ্দেশ্যে এসব ব্যক্তির নাম মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। অনেক সময় উপজেলা, জেলা থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের ভোট পরিস্থিতি অনুকূল রাখতেও এ ধরনের কাজ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা গতকাল বুধবার ইত্তেফাককে বলেন, গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই-বাছাই করে দেখা গেছে ৫৫ হাজার ব্যক্তিকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার কোনও আইনগত ভিত্তি নেই। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ বিষয়ে এসব ব্যক্তির কোন দালিলিক প্রমাণ নেই। তবুও তারা মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে গেজেটভুক্ত হয়েছেন। নিচ্ছেন সকল সরকারি সুযোগ-সুবিধা।
লালমুক্তিবার্তা, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতিস্বাক্ষর করা সনদ এবং মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে পাওয়া তালিকা—এই তিনটি মিলিয়ে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা এক লাখ ৮০ হাজার বা এর কিছু কমবেশি।
গত ৫ জানুয়ারির পর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান আ ক ম মোজাম্মেল হক। তিনিই ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা চিহ্নিত করার উদ্যোগ নেন। এ প্রক্রিয়ায় ইতিমধ্যে এক হাজার ৫৪৯ জনের সনদ জাল বলে সেগুলো বাতিল করা হয়েছে। সনদ বাতিলের কারণে সচিবসহ বেশ কয়েকজন চাকরিও হারিয়েছেন। ১৮২ জন সরকারি চাকরিজীবীর অবসরকালীন সুযোগ-সুবিধা বাতিল করা হয়েছে। মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে অতিরিক্ত এক বছর চাকরি করার কারণে নেয়া অর্থও তাদের পেনশন থেকে কেটে নেয়া হচ্ছে।
অপরদিকে ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য বলে মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে গেজেটভুক্ত হওয়াদের নামও বাতিল করে গেজেট করা হয়েছে। এসবের বাইরে ৫৫ হাজারের সনদ বাতিল করে গেজেট করতে শিগগির জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিলে উত্থাপন করা হবে বলে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। বর্তমানে মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক দেশের বাইরে থাকায় তার বক্তব্য জানা সম্ভব হয়নি।
শঙ্কায় কোটায় চাকরি পাওয়া মুক্তিযোদ্ধার সন্তান ও সুবিধাপ্রাপ্তরা: মন্ত্রণালয় বলছে, যাদের সনদ জাল তাদের সন্তান, নাতি-নাতনি কেউ মুক্তিযোদ্ধা বা তাদের পোষ্য কোটায় সরকারি চাকরি বা অন্যান্য সুবিধা ভোগ করলে তা বেআইনি হবে। এখন অনুসন্ধান করা হবে বাতিল করা সনদের উত্তরাধিকারী কেউ এমন সুবিধা ভোগ করছেন কি না। যদি কেউ ওই কোটায় চাকরি নিয়ে থাকেন তবে তা আইন অনুযায়ী বাতিল হবে। অন্যান্য সুবিধাও বাদ দেয়া হবে।
প্রসঙ্গত, ১৯৭২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সরকারি, আধাসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান-সংস্থা ও করপোরেশনে চাকরি দেয়ার ক্ষেত্রে মুক্তিযোদ্ধা কোটা প্রবর্তন করা হয়। শতকরা ৩০ ভাগ পদ এ কোটায় পূরণের নির্দেশ রয়েছে ওই প্রজ্ঞাপনে। তবে ১৯৭৫ সালের পর থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত এই কোটা কার্যকরের ক্ষেত্রে কোন বাধ্যবাধকতা ছিল না। ১৯৯৭ সালে এ কোটা পূরণের বাধ্যবাধকতা দিয়ে মুক্তিযোদ্ধার পাশাপাশি তাদের সন্তানদের কোটায় চাকরিসহ মুক্তিযোদ্ধার সমান অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেয়ার সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়। ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের পাশাপাশি তাদের ওপর নির্ভরশীল স্ত্রী-নাতি, নাতনি, সকলকেই ওই সুযোগের আওতায় নিয়ে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। 
সন্দেহের তালিকায় থাকা ৫৫ হাজার সনদধারীর মধ্যেও অনেকের সন্তান বা নির্ভরশীলরা চাকরি পেয়েছেন। এসব সনদ জাল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে তাদের চাকরি নিয়ে জটিলতা দেখা দেবে—এই আশঙ্কায় রয়েছেন অনেকেই। অনেকে এ প্রতিনিধির সঙ্গে আলাপ চারিতায় বলেছেন, পিতা-মাতার সনদ জাল হলে সেই সনদের সুবাদে পাওয়া চাকরির ভবিষ্যত্ কি হবে।
নতুন আবেদন: গত ২ নভেম্বর শেষ হয়েছে নতুন করে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নাম লেখাতে আবেদনের শেষ সময়। এতে এক লাখ ৩৩ হাজার ব্যক্তি আবেদন করেছেন।
এর মধ্যে অনলাইনে এক লাখ ২৩ হাজার ১৭০টি আবেদন জমা পড়েছে। বাকি ১০ হাজার আবেদন জমা পড়েছে সরাসরি। এসব আবেদন যাচাই-বাছাই শেষে গেজেটভুক্ত করা হলে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা তিন লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
ওইসব আবেদন যাচাই-বাছাই করতে গত ১৪ সেপ্টেম্বর জামুকা (জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল) সভায় প্রতি উপজেলায় স্থানীয় সংসদ সদস্যের নেতৃত্বে কমিটি গঠন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সাত সদস্যের এ কমিটির প্রধান হবেন নির্বাচনী এলাকার সংসদ সদস্য। তাকে অবশ্যই মুক্তিযোদ্ধা হতে হবে। তিনি মুক্তিযোদ্ধা না হলে সে ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে ইতিপূর্বের যেকোনো মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সদস্য সভাপতি হবেন। তা পাওয়া না গেলে সে ক্ষেত্রে যুদ্ধকালীন কমান্ডার কমিটির সভাপতি হবেন। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের একজন প্রতিনিধি, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ জেলা ইউনিটের জেলা কমান্ডার, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ উপজেলা ইউনিটের উপজেলা কমান্ডার, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মনোনীত একজন মুক্তিযোদ্ধা প্রতিনিধি, বিভাগীয় দায়িত্বপ্রাপ্ত জামুকার সদস্য কর্তৃক মনোনীত একজন মুক্তিযোদ্ধা প্রতিনিধি এবং সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও)।

২০০১ সালের নভেম্বর মাসে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করে বিএনপি সরকার। ২০০৩ সাল থেকে সরকারিভাবে তালিকা করে মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেট প্রকাশ হয়। মন্ত্রণালয় গঠিত হওয়ার পর মুক্তিযোদ্ধাদের পৃথক দুটি তালিকা থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের নাম সংগ্রহ করা হয়। এর মধ্যে একটি ছিল মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট সংরক্ষিত ভারতীয় ভলিয়ম বুক। এ তালিকায় মুক্তিযোদ্ধা ছিল ৬৯ হাজার ৮৩৩ জন। এর আগে ১৯৮৬-৮৭ সালে এরশাদ সরকার জাতীয় তালিকা প্রণয়ন করে এক লাখ দুই হাজার ৪৫৮ জনের নাম চূড়ান্ত করে। বিএনপি সরকার ভারতীয় ভলিয়ম বুককে প্রাধান্য দিয়ে ১৯৯৪ সালে নতুন তালিকা করলে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৬ হাজার। ১৯৯৮ সাল থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের খসড়া তালিকায় মুক্তিযোদ্ধা ছিল এক লাখ ৮৬ হাজার ৭৯০ জন। সর্বশেষ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে (২০০১-০৬) গেজেটে প্রকাশিত মুক্তিযোদ্ধা এক লাখ ৯৮ হাজার ৮৮৯ জন। তবে জোট সরকারের গঠিত জাতীয় কমিটি কর্তৃক অনুমোদিত মুক্তিযোদ্ধা দুই লাখ ১০ হাজার ৫৮১ জন। আর বর্তমান সরকারের তথ্য মতে, প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ২ লাখ ৯ হাজার।