মাদ্রাসা শিক্ষার পর এবার মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার জন্যও পৃথক অধিদপ্তর করার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যমে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থা সরাসরি মন্ত্রণালয়ের অধীনে চলে যাবে। আর শুধু উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের জন্য বর্তমান অধিদপ্তরই কাজ করবে।
শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ইত্তেফাককে বলেন, মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য পৃথক অধিদপ্তর করার উদ্যোগ নিচ্ছি। আমরা মাদ্রাসার জন্য পৃথক অধিদপ্তর করেছি। পর্যায়ক্রমে মাধ্যমিকের জন্যও হবে। তবে এ বিষয়ে অর্থ প্রয়োজন। সার্বিক বিষয় বিবেচনা নিয়েই আমাদের এগুতে হবে।
বর্তমানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষার জন্য পৃথক অধিদপ্তর রয়েছে। এছাড়া মাধ্যমিক ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার জন্য রয়েছে পৃথক ‘মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর’ (মাউশি)। অধ্যাপক পদমর্যাদার শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তারা মাউশির মহাপরিচালক হিসাবে নিয়োগ পান।
দেশের মাদ্রাসা শিক্ষাকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে গত অক্টোবরে আলাদা একটি অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠা হয়। ‘মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর’ নামে এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে দেশের ১৬ হাজার ২১৩টি মাদ্রাসা পরিচালিত হবে। এ অধিদপ্তর প্রতিষ্ঠার জন্য ৫০টি পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। শিক্ষা ভবনের পঞ্চম তলায় পাঁচ কক্ষ বিশিষ্ট অধিদপ্তরের প্রাথমিক কার্যালয় করা হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল রয়েছে প্রায় ২০ হাজার। এর মধ্যে সরকারি ৩২৭টি, বেসরকারি ১৮ হাজার ৮৮১ টি, এর বাইরেও রয়েছে মাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় কলেজ, মাদ্রাসা, কারিগরি ও কলেজ স্তরের শিক্ষার চেয়ে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার ব্যাপ্তি বেশি। এ স্তরের প্রতিষ্ঠান, শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীও বেশি।
১৯৪৭ সাল পর্যন্ত দেশে মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল ছিল ২ হাজার ৩০টি। পরে ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ সালে নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয় ৫ হাজার ১৯১টি। পরবর্তীতে ১৯৭১ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত নতুন মাধ্যমিক স্কুল হয় ৪ হাজার ৪৪২টি, ১৯৯১ থেকে ২০০০ পর্যন্ত নতুন ৫৯৯৫টি এবং ২০০১ থেকে ২০১২ পর্যন্ত ১ হাজার ৯৪৪টি নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠা হয়। ২০ হাজার মাধ্যমিক স্কুলের শিক্ষার্থী ৯০ লাখের বেশি এবং শিক্ষক ২ লাখ ৩০ হাজার। এছাড়া তৃতীয় শ্রেণী ২১ হাজার, চতুর্থ শ্রেণীর ৫০ হাজার কর্মচারী এবং ৮ হাজার সহকারি লাইব্রেরিয়ান রয়েছে। এত সংখ্যক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষার্থী ও জনবলের জন্য পৃথক একটি অধিদপ্তর জরুরি বলে জানিয়েছেন শিক্ষকরা।
মাদ্রাসার জন্য পৃথক অধিদপ্তর করা হলেও মাধ্যমিক স্তরের জন্য পৃথক অধিদপ্তরের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছিল আরো আগে। পৃথক মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর গঠনের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে ২০০৯ সালের ২৪ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি সার সংক্ষেপ পাঠানো হয়েছিল। এতে বলা হয়, ‘বর্তমান মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের পক্ষে দেশের মাধ্যমিক স্তরের বিপুল সংখ্যক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় পরিদর্শন ও ব্যবস্থাপনার সমন্বয় সাধন প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে কোনরূপ গবেষণামূলক পরামর্শও তারা সরকারকে দিতে পারছে না।’ এতে আরো বলা হয়, মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য একটি পৃথক অধিদপ্তর করা গেলে উক্ত অধিদপ্তর মাধ্যমিক শিক্ষা ব্যবস্থাপনা সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন, চলামান বিশ্বের শিক্ষা সম্পর্কে গবেষণা ইত্যাদি কাজসহ সরকারকে মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রয়োজনীয় পরামর্শ প্রদানের মাধ্যমে সামগ্রিকভাবে শিক্ষা ব্যবস্থায় ইতিবাচক অবদান রাখতে সক্ষম হবে। কিন্তু ঐ সময়ে মাধ্যমিকের জন্য পৃথক অধিদপ্তর করা হয়নি। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শিক্ষা ক্যাডারের নেতারা চাইছেন না মাধ্যমিক শিক্ষার জন্য পৃথক অধিদপ্তর হোক। এ কারণে এটি বারে বারে পিছিয়ে যায়।
তথ্য অনুযায়ী, মাউশির অর্গানোগ্রাম ১৯৮৩ সালে প্রণীত হয়, যা ১৯৮৪ সালে কার্যকর হয়। ১৯৮৪ সালে অধিদপ্তরের অধীনে ৪টি বিভাগীয় কার্যালয়, ২১টি জেলা শিক্ষা অফিস, ১০৫টি সরকারি কলেজ, ১০টি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ৩টি সরকারি মাদ্রাসা এবং ১৭৪টি সরকারি স্কুলসহ সর্বমোট ২৯২টি প্রতিষ্ঠান ছিল। এছাড়া ঐ সময়ে মাত্র ১০৬ কোটি টাকা সরকারি অনুদান প্রদানের মাধ্যমে প্রায় ৯ হাজার বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসার কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রিত হতো এ অধিদপ্তরের মাধ্যমে।
শিক্ষকরা অভিযোগ করেছেন, উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের সাথে যুক্ত থেকে পরিচালিত মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের এসে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকরা নানাভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। একটি অধিদপ্তরের অধীনে থাকায় মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকরা বৈষম্যেরও শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন শিক্ষকরা। পৃথক অধিদপ্তর গঠন হলে সারা দেশের শিক্ষক-কর্মচারীদের হয়রানি ও ফাইল জট কমবে, বাড়বে সেবার মান। তাদের মতে, পৃথক অধিদপ্তর করা হলে ঘুষ, অনিয়মও কমবে।