বিসিএস ভাইভা নিয়ে সংশয়-অবিশ্বাস

বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) মৌখিক পরীক্ষা (ভাইভা) নিয়ে পরীক্ষার্থীদের মধ্যে সংশয় ও অবিশ্বাস ক্রমশ বাড়ছে। আওয়ামী লীগ-বিএনপি সব সরকারের আমলে বিসিএসের ভাইভা পরীক্ষার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ১০০ থেকে ২০০ নম্বরে উন্নীত করায় এ প্রশ্ন আরো জোরালো হয়েছে। পরীক্ষার্থীরা মনে করেন, রাজনৈতিক কারণেই ভাইভায় নম্বর বাড়ানো হয়েছে। এ সন্দেহ-অবিশ্বাস পরীক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা তৈরি করেছে। বিশিষ্ট শিক্ষাবিদরা এই সন্দেহ দূর করার জন্য মৌখিক পরীক্ষার নম্বর কমানোর দাবি জানিয়েছেন।
বরেণ্য শিক্ষাবিদ অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, পাবলিক সার্ভিস কমিশনে নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি স্থায়ী কমিটি থাকা জরুরি। এই স্থায়ী কমিটি না থাকার কারণেই সরকার পরিবর্তনের সাথে সাথে পিএসসিতেও পরিবর্তন আসে। ফলে সরকার প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পায়। এই প্রভাব বিস্তারের কারণে বিসিএস পরীক্ষা নিয়ে আস্থাহীনতা সৃষ্টি হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, পাকিস্তান আমলে মৌখিক পরীক্ষা ২শ নম্বরের ছিল। তখন কিন্তু মৌখিক পরীক্ষা নিয়ে কোন প্রশ্ন ওঠেনি। পরে এটি ১শ করা হয়। এখন আবার ২শ নম্বর করা হয়েছে। মেধাবীদের উত্সাহিত করতে বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা ১শ করা উচিত।  সংশ্লিষ্টদের মতে, পাবলিক সার্ভিস কমিশনে বরাবরই সরকার সমর্থকদের নিয়োগ দেয়া হয় বলে অভিযোগ আছে। বিএনপির আমলে বিএনপি সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী এবং আওয়ামী লীগের আমলে আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরাই নিয়োগ পেয়ে আসছেন। এসব কারণে বিসিএস পরীক্ষা নিয়ে শিক্ষাবিদ ও পরীক্ষার্থীদের মাঝে এক ধরনের সংশয় ও অবিশ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে। মৌখিক পরীক্ষা ১শ থেকে ২শ করার ফলে এই সংশয় ও অবিশ্বাস ঘনিভূত হয়। পাকিস্তান আমল থেকেই মৌখিক পরীক্ষা ছিল ২শ নম্বরের। কিন্তু পিএসসির প্রতি এক ধরনের নেতিবাচক ধারণার পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৫ সালের মার্চে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার বাধ্য হয়ে বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০০-এর পরিবর্তে ১০০ নির্ধারণ করে। ২৭তম ও ২৮তম বিসিএস পরীক্ষায় ১শ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা কার্যকর ছিল। ২০১০ সালে বাংলাদেশ/সিভিল সার্ভিস (বয়স, যোগ্যতা ও সরাসরি নিয়োগের জন্য পরীক্ষা) বিধিমালা ১৯৮২-এর সংশোধনী এনে বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ১০০’র বদলে পুনরায় ২০০ করার বিধান করা হয়। ২৯তম বিসিএস থেকে লিখিত পরীক্ষার ৯০০ ও মৌখিক পরীক্ষার ২০০ নম্বর মিলে মোট ১১০০ নম্বরে বিসিএস পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। যদিও ৩৫তম বিসিএসে এসে সিলেবাসের ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়। সেখানে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২শ বহাল রাখা হয়েছে। তবে মৌখিক পরীক্ষায় পাস নম্বর ৪০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করা হয়েছে।
বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণেচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শাহীনুর রহমান, মাসুদুর রহমান, আক্তার হোসেন, শিরিন সুলতানা জানান, বিসিএস পরীক্ষা নিয়ে সংশয়-অবিশ্বাস একদিনে তৈরি হয়নি। পিএসসি সংশ্লিষ্টদের কর্মকাণ্ডের কারণেই এমনটি হয়েছে। এজন্য দেশের চলমান বাস্তবতা বিচার করে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর আবার ১০০ করার দাবি উঠেছে। আসন্ন ৩৫তম বিসিএসে অংশগ্রহণকারী অধিকাংশ পরীক্ষার্থীই এ দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ইত্তেফাককে বলেন, সব সরকারের আমলেই বিসিএস পরীক্ষায় নানা রকম অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। এজন্য শিক্ষাবিদ থেকে শুরু করে সবাই বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষার নম্বর কমানোর সুপারিশ করেছিল। একপর্যায়ে অনিয়ম ঠেকাতে মৌখিক পরীক্ষা ১শ করা হয়। পরবর্তীতে সেটি আবার ২শ নম্বরের করাটা উচিত হয়নি। এটি ১শ করলে ভালো, তবে ৫০ নম্বরের করা গেলে আরো ভালো হয়।
তিনি আরো বলেন, পিএসপিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে সব সময়ই দলীয় লোকদের বসানো হয়। এ কারণেই বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষার নম্বর কোন ভাবেই ২শ রাখা ঠিক হবে না।
‘২শ নম্বরের করার যুক্তি নেই’
পিএসসির সাবেক সদস্য অধ্যাপক ড. আশরাফুল ইসলাম চৌধুরী ইত্তেফাককে জানান, ছাত্রদের সুবিধার্থে আমরা বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষায় ২শ নম্বর থেকে ১শ করেছিলাম। কারণ বোর্ড ইচ্ছা করলে একজন ছাত্রকে ৯০ শতাংশ নম্বর দিতে পারে। এক্ষেত্রে ১শ এর মধ্যে সে হয়তো ৯০ পেতো। কিন্তু এখন তো সে ১৮০ পাচ্ছে। এতে প্রকৃত মেধা মূল্যায়িত হচ্ছে না। তবে কি কারণে আবার মৌখিক পরীক্ষা ২শ নম্বরের করা হলো তার সুনির্দিষ্ট কোন যুক্তি দেয়া হয়নি।
তিনি আরো বলেন, পিএসসির একক ক্ষমতা চেয়ারম্যানের। সদস্যদের এখানে কিছুই করার নেই। কারণ চেয়ারম্যানই ভাইভা বোর্ড গঠন করেন। তিনি ইচ্ছা অনুযায়ী পছন্দের লোকদের দিয়ে বোর্ড করতে পারেন। পছন্দের প্রার্থীদের জন্য আগে থেকে বোর্ড সদস্যদের নির্দেশনা দিতে পারেন। চেয়ারম্যান ইচ্ছা করলে সবকিছুই করতে পারেন।
মৌখিক পরীক্ষায় প্রভাব বিস্তার প্রসঙ্গে পিএসসির চেয়ারম্যান ইকরাম আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষায় কোনভাবেই প্রভাব বিস্তারের সুযোগ নেই। কারণ পরীক্ষা শুরুর মাত্র ১৫ মিনিট আগে কোন বোর্ডে কে থাকবেন তা জানানো হয়। এমনকি বোর্ডের সদস্যরাও জানেন না কোন বোর্ডে কে আছেন। পরীক্ষার্থীরাও পরীক্ষার অল্প সময় আগে বোর্ডের সদস্যদের সম্পর্কে জানতে পারেন। এছাড়া বোর্ডের চেয়ারম্যান ও সদস্য এবং পরীক্ষার্থীদের মোবাইলসহ ইলেকট্রনিক ডিভাইস নিয়ে যাওয়া সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। ফলে কারোর পক্ষে বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষায় প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব নয়।
২শ নম্বরের মৌখিক পরীক্ষা প্রসঙ্গে পিএসসি চেয়ারম্যান বলেন, অনেক বিচার-বিশ্লেষণ ও আলাপ-আলোচনা করে বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষায় ২শ নম্বর রাখা হয়েছে। দুই বছর ১ হাজার নম্বরের মধ্যে মাত্র ১শ নম্বর ছিল মৌখিক পরীক্ষায়। কিন্তু সেটির সুফল পাওয়া যায়নি। তাই এখন ১১শ নম্বরের মধ্যে ২শ নম্বর মৌখিক পরীক্ষায় রাখা হয়েছে।
ভাইভায় ২শ নম্বর সবচেয়ে উত্তম বলে দাবি করে তিনি বলেন, বিসিএস মেধাবীরাই নিয়োগ পেয়ে আসছেন। আগামীতেও পাবেন। কারোর তদবির বা সুপারিশ করার সুযোগ নেই। পিএসসির প্রতি পরীক্ষার্থীদের আস্থা রাখার আহবান জানান তিনি।