প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘কিছু রাজনৈতিক দল ও কতিপয় ব্যক্তি বর্তমান সরকারকে উত্খাতের জন্য নানা হুমকি দিচ্ছে, অনেক ষড়যন্ত্র করছে। তারা আন্দোলনের ডাক দিলেও জনগণ তাতে সাড়া দিচ্ছে না। এতেই প্রমাণ হয়, বর্তমান সরকারের ওপর বাংলাদেশের মানুষের সম্পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস রয়েছে।’ বুধবার জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী তার জন্য নির্ধারিত প্রশ্নোত্তর পর্বে আওয়ামী লীগের অধ্যাপক আলী আশরাফের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে এ সব কথা বলেন।
একই প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দিকহারা নাবিক যেমন লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে না, তেমনি সঠিক দিক-নির্দেশনা ছাড়া কোনো দেশও এগিয়ে যেতে পারে না। আমরা দেশকে দিক-নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছি। আমরা দীর্ঘমেয়াদি সুষ্ঠু পরিকল্পনা নিয়ে দেশকে এগিয়ে নিচ্ছি। বাংলাদেশের এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকবে, কেউ এটা পিছিয়ে নিতে পারবে না। এমনকি ২০২১ সালের আগেই আমরা মধ্য-আয়ের দেশে উন্নীত হতে পারব বলে আশা করছি।’
স্বতন্ত্র সদস্য ডা. রুস্তম আলী ফরাজীর এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘কমনওয়েলথ পার্লামেন্টারি অ্যাসোসিয়শন (সিপিএ) ও ইন্টার পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের (আইপিইউ) মতো দুটি আন্তর্জাতিক সংসদীয় ফোরামের শীর্ষ পদে বাংলাদেশের জয়ী হওয়ার ঘটনা বর্তমান সংসদের প্রতি বিশ্ব নেতৃবৃন্দের বিশ্বাস ও শ্রদ্ধার প্রতিফলন। এই জয় একদিকে যেমন বিরল অর্জন, তেমনি বহির্বিশ্বের সাথে আমাদের ক্রমবর্ধমান সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কেরই প্রমাণ। এর মধ্য দিয়ে এটি নিশ্চিত হয়েছে যে, গণতন্ত্র, উন্নয়ন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বর্তমান সরকারের অব্যাহত অগ্রযাত্রার বিষয়ে বিশ্ব সম্প্রদায় পুরোপুরি আস্থা রাখে।’
একই প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘দশম সংসদ নির্বাচনের পর আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে নিয়ে কোনো কোনো মহলের নেতিবাচক প্রচারণা সত্ত্বেও বাংলাদেশের জনপ্রতিনিধিদের আন্তর্জাতিক ফোরামে নির্বাচিত হওয়া এটিই প্রমাণ করে যে, সারা বিশ্বের সাথে বাংলাদেশের সৌহার্দ্রপূর্ণ ও পারস্পরিক সহযোগিতামূলক সম্পর্কের ভিত্তি ক্রমশ আরও জোরদার হচ্ছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশ যে আজ বিশ্বে একটি রোলমডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, সেটি আবারও সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতিনিধিত্বকারী এই দুটি আন্তর্জাতিক সংস্থার সর্বোচ্চ পদে নির্বাচিত হওয়ার মধ্য দিয়ে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। সরকারের বলিষ্ঠ পররাষ্ট্র নীতির ফলে বাংলাদেশ আজ বিশ্ব পরিমণ্ডলে একটি প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, কার্যকর ও অবদানক্ষম রাষ্ট্র হিসেবে দৃশ্যমানতা ও স্বীকৃতি লাভ করেছে। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি বিশ্ববাসীর শ্রদ্ধা এবং অকুণ্ঠ সমর্থন এ বিজয়ের অন্যতম একটি কারণ বলে আমি মনে করি।’
রুস্তম আলী ফরাজীর সম্পূরক এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘বিএনপি আমলে ওআইসির মহাসচিব পদে এমন একজনকে প্রার্থী করা হয়েছিল, যিনি (সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী) যুদ্ধাপরাধী। তাকে তো কেউ সমর্থন করতে পারে না। যে কারণে প্রথম রাউন্ডে ২ ভোট এবং পরের রাউন্ডে নাকি শুধু নিজের ভোটটাই পেয়েছিলেন। কিন্তু সিপিএ ও আইপিইউতে আমরা যোগ্য প্রার্থী দিতে পারায় জয় এসেছে।’
‘যুদ্ধাপরাধীদের সাজা হওয়ায় স্বস্তি বোধ করছি’:
ঢাকা-১১ আসনের এ কে এম রহমতুল্লাহর এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘মানবতা-বিরোধী অপরাধের বিচারের মাধ্যমে বাংলাদেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ভিত আরো দৃঢ় হয়েছে। আমার বিশ্বাস, মানবতা-বিরোধী অপরাধীদের বিচারের মাধ্যমে উচিত সাজা নিশ্চিত করলে স্বাধীনতার জন্য যে লাখো শহীদ আত্মাহুতি দিয়েছেন এবং দুই লাখ মা-বোন ইজ্জত হারিয়েছেন, তাদের আত্মা শান্তি পাবে এবং তাদের পরিবারের সদস্যরা তৃপ্ত হবেন। আজকে তাদের সুষ্ঠু বিচারের মাধ্যমে সাজা কার্যকর করা শুরু হয়েছে, এ জন্য আমি সস্তি বোধ করছি।’
একই প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাই— বাংলাদেশের মানুষের দীর্ঘদিনের বিচার পাওয়ার প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে এক-এক করে সব জঘন্য মানবতা-বিরোধী অপরাধীদের বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে এবং যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাদের প্রতি প্রদত্ত শাস্তি বাস্তবায়ন করার জন্য আমরা অবিচল থেকে কাজ করে যাব।’
৩ কোটি ৮৭ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উত্পাদনের আশা:
ময়মনসিংহ-২ আসনের শরীফ আহমেদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার সব সময়ই কৃষিবান্ধব। ২০০৮ সালে খাদ্য উত্পাদন ছিল ৩ কোটি ৫৩ লাখ মেট্রিক টন। সে বছর ৩৪ লাখ ৬৬ হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি খাদ্যশস্য আমদানি করতে হয়েছে। এ বছর ৩ কোটি ৮৭ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য উত্পাদন হবে বলে আশা করছি।’
সশস্ত্র বাহিনীতে দেড় হাজার নারী:
হবিগঞ্জ-১ আসনের আব্দুল মুনিম চৌধুরীর এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারই প্রথম ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীতে মহিলা কমিশন্ড অফিসার নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। তারই ধারাবাহিকতায় সশস্ত্র বাহিনীতে বর্তমানে ১ হাজার ৪২৫ জন নারী চাকরি করছেন। এর মধ্যে সেনাবাহিনীতে ৯১২, নৌবাহিনীতে ২৭০ এবং বিমানবাহিনীতে ২৪৩ জন নারী কর্মকর্তা রয়েছেন।’
কলরেট কমানোর পরিকল্পনা নেই:
লক্ষ্মীপুর-৩ আসনের এ কে এম শাহজাহান কামালের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমানে মোবাইল ফোনের কলরেট প্রতি মিনিট সর্বনিম্ন ২৫ পয়সা থেকে সর্বোচ্চ ২ টাকা নির্ধারণ করা আছে। বর্তমানে বাংলাদেশে সব মোবাইল অপারেটরের গড় কলরেট প্রতি মিনিটে ৮৩ পয়সা। এটা বিশ্বের অন্যতম সর্বনিম্ন কলরেট হিসেবে বিবেচিত। মোবাইল ফোনের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন কলরেট পুনর্নির্ধারণ করার বিষয়ে সরকারের আপাতত পরিকল্পনা নেই।’
সরকারি শিক্ষক নিয়োগে পিএসসির আদলে কমিশন:
চট্টগ্রাম-৪ আসনের দিদারুল আলমের এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেন, ‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এর বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে গুণগত মান, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার জন্য পিএসসির আদলে একটি পৃথক কমিশন গঠনের চিন্তা-ভাবনা করছে সরকার।’