তিন বিমান বন্দর দিয়েই চোরাচালান

বাংলাদেশকে সোনা চোরাচালানের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে আন্তর্জাতিক সোনা চোরাকারবারীরা। সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ থেকে এসব সোনা হযরত শাহজালাল (র.) বিমানবন্দর, চট্টগ্রাম শাহ আমানত ও সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে আসে। এরপর নানা হাত ঘুরে সোনা যায় তার গন্তব্য ভারতে। সোনা গলিয়ে স্বর্ণালংকার বানিয়ে সেগুলো আবার পাঠানো হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে। বেশির ভাগ সোনা আসে শাহজালাল বিমানবন্দর দিয়ে। এর মধ্যে মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ সোনা ধরা পড়ে। দুবাই থেকে চোরাচালান সিন্ডিকেটটি নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। কাস্টমস গোয়েন্দা বিভাগ, বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা, স্বর্ণ ব্যবসায়ী ও সোনা চোরাচালানে জড়িত ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানা গেছে।

জানা গেছে, বাংলাদেশ বিমানের ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, পাইলট, ক্রুসহ ক্ষমতাধর কর্মকর্তারা সোনা চোরাচালানের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে জড়িত। ইতিমধ্যে বিমানের চিফ ক্যাপ্টেন আবু মোহাম্মদ আসলাম শহীদ, ডিজিএম এমদাদ হোসেন ও ম্যানেজার (সিডিউল) মোজাম্মেল হোসেনসহ ৯ জনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করছে। জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানিয়েছে কার মাধ্যমে কিভাবে বিমানে করে সোনা আসতো দেশে।
বর্তমানে ভারতের বিমানবন্দরে প্রতি ভরি সোনার জন্য শুল্ক দিতে হয় ৪২০০ টাকা। সেখানে বাংলাদেশে শুল্ক দিতে হতো দেড়শ’ টাকা। ২০১৪-২০১৫ অর্থ বছরে বিদেশ থেকে আনা প্রতি ভরি সোনার জন্য তিন হাজার টাকা শুল্কহার ধার্য করা হয়। এছাড়া ভারতের নাগরিকরা প্রচলিত সঞ্চয়ী মাধ্যম অর্থাত্ ব্যাংক বা প্রতিষ্ঠানে সঞ্চয়ে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। তারচেয়ে বরং তারা নগদ টাকায় স্বর্ণ কিনে সেগুলোই জমিয়ে রাখতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ভারতীয়রা অনেক বেশি স্বর্ণালংকার পরতে পছন্দ করেন। ভারতীয়দের এই প্রবণতার কারণে সোনার অনেক চাহিদা থাকায় সিন্ডিকেট বাংলাদেশ হয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে সোনা আনায়। সিন্ডিকেটই ঠিক করে কিভাবে বিমান বন্দর থেকে চালানটি বের হবে এবং তা কোন কোন পথে কার মাধ্যমে তাদের হাতে পৌঁছবে।
সূত্র আরেকটি তথ্য জানায় যে, চোরাচালানের সোনার বার বিভিন্ন মাধ্যমে ভারতের দক্ষ কারিগর হাতে পৌছলে তারা শুরু করেন আসল কাজ। অর্থাত্ সোনা গলিয়ে তারা বানান দৃষ্টিনন্দন সব অলংকার। দক্ষ কারিগরদের হাতে তৈরি এই স্বর্ণালংকারের চাহিদা ভারতজুড়ে ও ভারতের বাইরে। এই সোনার বড় অংশই স্বর্ণালংকারে রূপ নিয়ে চলে যায় দুবাইয়ে। এভাবেই সোনা চোরাকারবারীরা সোনা পাঠাচ্ছে ও সোনার অলংকার নিচ্ছে।
যে কারণে বিমান কর্মকর্তা ছিলেন
ধরা-ছোঁয়ার বাইরে
বহু বছর ধরে বাংলাদেশ বিমানের পাইলট, ক্রুসহ ইঞ্জিনিয়ার বিভাগের এক দল কর্মকর্তা কর্মচারী, কাস্টমসের এক শ্রেণির কর্মকর্তা, বিমান বন্দরের এক শ্রেণির কর্মকর্তা সোনা চোরাচালান সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত। দেশে যখন সোনা আসে তখন এই কর্মকর্তারাই তাদের নিজ নিজ দায়িত্বে থাকেন। এমনও হয়েছে সিন্ডিকেট বিমানের সবকয়টি সিট ভাড়া করে নিতো। ফলে সাধারণ যাত্রী উঠত না, সিট খালি থাকতো। তখন বিমানের স্টাফরা বিমানের বডির ভিতরে করে সোনা নিয়ে আসতো। শাহজালাল (র.) আন্তর্জাতিক বিমান বন্দর দিয়ে গত বছরের ২৪ জুলাই ১২৪ কেজি (সাড়ে ৩ মণ) সোনা বিমানের বডির ভেতরে আনা হয়। কাস্টম গোয়েন্দা বিভাগ ঐ সোনা উদ্ধার করেন। ঐ সময় গোয়েন্দা বিভাগ নিশ্চিত হন যে, বিমানের কর্মকর্তা পাইলট, ক্রু ও ইঞ্জিনিয়ার বিভাগের একটি চক্র এর সঙ্গে জড়িত। এ বছরের ২৬ এপ্রিল একই বিমানবন্দরে ১০৫ কেজি সোনা বিমানের বডিতে লুকোনো অবস্থায় উদ্ধার করে। এ দুটি চালান ছিল এ যাবত্ কালের বৃহত্। এ চালানের গন্তব্য বিমান বন্দরের পর কোথায় ছিল তা জানা যায়নি। চোরাচালান সিন্ডিকেটই সংশ্লিষ্টদের ডিউটি বণ্টন করতেন। এ সকল কর্মকর্তা, পাইলট, ক্রু ও বিমান বালাসহ সংশ্লিষ্টরা দীর্ঘদিন একই ফ্লাইটে কিংবা একই স্থানে দায়িত্ব পালন করে আসছে। তাদেরকে শীর্ষ প্রশাসনও বদলি করতে পারেনি। শীর্ষ প্রশাসনের কোন কর্মকর্তা তাদের বদলি করতে গেলে উল্টো তিনি নিজেই বদলি কিংবা হয়রানির শিকার হন। শীর্ষ প্রশাসনের এক শ্রেণির কর্মকর্তা সোনা পাচার সিন্ডিকেট থেকে নিয়মিত ভাগ পেয়ে থাকেন বলেও অভিযোগ আছে।
কাস্টমস গোয়েন্দা বিভাগ সূত্রে জানা যায় যে, বর্তমান সরকারের গত ১৭ মাসে ৬৭৭ কেজি সোনা উদ্ধার এবং ৮৮ জনকে হাতে নাতে গ্রেফতার করা হয়েছে। এদের মধ্যে বিমান, সিভিল এভিয়েশন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছে। বহনকারীদের সংখ্যা বেশি। ১০৫ কেজি সোনা উদ্ধারের সময় এক বিমান ক্রুকে গ্রেফতার করা হয়। এ ঘটনার পর ১১ কেজি সোনাসহ সিভিল এভিয়েশনের একজন ও বিমানের এক প্রটোকল অফিসারকে গ্রেফতার করা হয়। অপর একটি সূত্র জানায়, সোনা উদ্ধারের পরিমাণ আরও দ্বিগুণ। বিভাগীয় মামলা দায়েরের অজুহাতে বেশির ভাগ ছাড়া পেয়ে যায়। বিভাগীয় মামলায় কাস্টমস বিভাগের জড়িত কর্মকর্তা কর্মচারী রয়েছে।
শুল্ক তদন্ত ও গোয়েন্দা অধিদফরের মহাপরিচালক ড. মাইনুল খান বলেন, এ দফতরের কর্মকর্তারা সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছে। যার কারণে বিমান বন্দরে সোনা পাচারকারীরা সহজে ধরা পড়ছে। বড় ধরনের ঝাকি খাচ্ছে সিন্ডিকেটসহ সংশ্লিষ্টরা। কাস্টমসের দায়িত্ব সোনা উদ্ধার ও গ্রেফতার করা। পরে থানায় মামলা হওয়ার পর তদন্তভার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর বর্তায়। গ্রেফতারকৃতদের সুষ্ঠু বিচার হলে সোনা পাচার কমে যাবে। এদেশের বিমান বন্দরকে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করার সাহস পাবে না আন্তর্জাতিক সোনা পাচার সিন্ডিকেটরা।
সোনা বহনকারীদের অধিকাংশ দুবাইসহ বিভিন্ন দেশে চাকরি করে। তাদের বিদেশে নেয়া থেকে শুরু করে চাকরি দেয়া পর্যন্ত দায়িত্ব নেয় পাচারকারী সিন্ডিকেট। তারা দেশে ফেরার পথে সিন্ডিকেট ধরিয়ে দেয় সোনার চালান। এ ছাড়া বিদেশে কর্মরতদেরও সিন্ডিকেট প্রলোভন দেখিয়ে চোরাচালানে রাজী করায়। এজন্য তাদের নগদ অর্থ কিংবা বিমানের আসা যাওয়ার টিকেট দেয়া হয়। গ্রেফতারকৃতদের কয়েকজন স্বীকার করেন, লোভে পড়েই তারা এ কাজ করে ধরা খেলেন।
আরো জানা গেছে, দুবাই বিমান বন্দর কিংবা অন্যান্য বিমান বন্দরে মোটা অংকের টাকার লোভ দেখিয়ে সোনা ভর্তি লাগেজ দেয়া হয় একজন সাধারণ যাত্রীকে। বহনকারী ব্যক্তির ও লাগেজের ছবি তুলে দুবাই থেকেই ছবি পাঠানো হয় এদেশের সিন্ডিকেট সদস্যের কাছে। লাগেজ বহনকারী ব্যক্তিকে সিন্ডিকেট জানিয়ে দেয় যে, আপনি ঢাকা বিমান বন্দরে নামার পর আমাদের লোকজন গ্রহণ করবে। আপনার কিছুই করতে হবে না। বিমান কর্মকর্তা পাইলট ও ক্রু ছাড়া এভাবেও সোনা চোরাচালান হচ্ছে।
চট্টগ্রাম ব্যুরোর ইত্তেফাকের স্টাফ রিপোর্টার শামীম জানান, ২০১৩ সালে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমান বন্দরে মাত্র ৮টি মামলা হয়েছে। গ্রেফতার হয়েছে ৮ জন। এ বছর গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ১৬টি মামলা হয়েছে। গ্রেফতার হয়েছে ২৫ জন। উদ্ধারকৃত সোনার পরিমাণ ২৫০ কেজি এবং মূল্য প্রায় ৯৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা। বিমানবন্দর দিয়ে যে পরিমাণ সোনা আসে তার ৫ ভাগের এক ভাগ মাত্র উদ্ধার হয়। বাকি সোনা নিরাপদে সিন্ডিকেট পার করে নিয়ে যায়।

সিলেট ব্যুরোর স্টাফ রিপোর্টার হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জানান সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়েও একইভাবে সোনা আসছে। তবে বিমান বন্দরের কাস্টমস কর্মকর্তা ইব্রাহিম বলেন, এ বিমান বন্দর নিয়ে সোনা কম পাচার হয়ে থাকে। যদি আসেও তা ধরা পড়ে যায়।