বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে শুরু হয়েছে হে ফেস্টিভ্যাল-সাহিত্যের উত্সব। যাকে বলা যেতে পারে বাংলা ও ইংরেজি সাহিত্যের মেলবন্ধন। প্রতিবছরই এর জৌলুস বাড়ছে। গতকাল বৃহস্পতিবার চতুর্থবারের মত তিনদিনব্যাপী এ উত্সব শুরু হলো ঢাকায়। এবার উত্সবের শ্লোগান: ‘মনের বাধাকে অতিক্রম করে ভিন্নভাবে গল্প বলি’।
উত্সবে ১৩টি দেশ থেকে এসেছেন কবি-সাহিত্যিকরা। সারাদিন ধরে সাহিত্যিক ও সাহিত্য রসিকদের আড্ডা, আলোচনা ও প্রশ্ন-উত্তরে মুখর ছিল বাংলা একাডেমির সবুজ চত্বর। তরুণ লেখকরা যেমন প্রতিটি আলোচনায় অংশ নিয়েছেন, তেমনি স্বনামধন্য কবি-লেখকরাও অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন আলোচনায়। তাদের সরব উপস্থিতিতে প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে উত্সব চত্বর।
সকালে ‘হে ফেস্টিভ্যাল অব লিটারেচার এন্ড দ্য আর্টস’ নামের এ উত্সবের উদ্বোধনী পর্বে বক্তব্য প্রদান করেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক, নরওয়ের লেখক উইলিয়াম ডালরাম, পেন ইন্টারন্যাশনাল এর প্রেসিডেন্ট কবি ও প্রাবন্ধিক জন রালস্টন সোল, ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম ও পয়েট্রি স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ও শিক্ষক মিমি কালভাটি। ফেস্টিভ্যালের পরিচালক তাহমিনা আনাম উদ্বোধনী অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন। ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন ফেস্টিভ্যালের পরিচালক সাদাফ সায সিদ্দিকি। অনুষ্ঠানের শুরুতে সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়।
সৈয়দ শামসুল হক বলেন, ‘আমরা এসব উত্সব আয়োজনের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানুষের অভিজ্ঞতাকে আহরণ করে নতুন পথ আবিষ্কারের কথা ভাবতে পারি।’ তিনি বলেন, ‘বাংলা একাডেমির কাজ শুধু ভাষা ও বুদ্ধিভিত্তিক চর্চা করা নয়, বিদেশের সাথে এদেশের সাহিত্য ও সংস্কৃতির আদান-প্রদান করাও। আমি মনে করি এই বিবেচনায় একাডেমি এই উত্সবের সাথে একত্রিত হয়েছে।’
কবি ও প্রাবন্ধিক জন রালস্টন সোল বলেন, ‘বিশ্বায়ন ও আন্তর্জাতিকিকরণ নামে বিশ্বে যা কিছু বিবেচিত হচ্ছে আমি মনে করি এটা ঠিক নয়। কারণ একেকটি রাষ্ট্রে একেক ধরনের রাজনীতি, সমাজনীতি তথা সংস্কৃতি বিরাজ করে, সেখানে বিশ্বায়নের নামে কোনকিছু চাপিয়ে দিলে তা অন্য রাষ্ট্রের চিন্তার বিপরীতে অবস্থান নেয়।’ মাহফুজ আনাম বলেন, ‘আমি মনে করি মুক্ত আলোচনার মাধ্যমে চিন্তার বিনিময়ের মধ্য দিয়ে একটি নতুন চিন্তার উদয় হতে পারে। এজন্য হে ফেস্টিভ্যালের মতো বিভিন্ন দেশের মানুষের সমাবেশ জরুরি।’
উত্সবের প্রথম দিনে মোট ২৬টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এসব অধিবেশনে সাহিত্য আলোচনা যেমন হয়েছে এর পাশাপাশি ছিল গল্প পাঠ, কবিতা আবৃত্তি ও সঙ্গীত পরিবেশনা। উত্সবে দর্শনার্থীদের জন্য ত্রিশের অধিক স্টলে বিক্রি হচ্ছে দেশ-বিদেশের বই এবং রকমারি খাবার। প্রথম দিনের অনুষ্ঠান চলে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত।
মনের কথা তো কবিতাতেই বলি: জয় গোস্বামী
হে ফেস্টিভ্যালে হেমন্তের হিম হিম বিকালে কবিতার উষ্ণতা ছড়ালেন এ সময়ের বাংলা কবিতার অন্যতম জনপ্রিয় কবি জয় গোস্বামী। তার আগে তিনি বলেন, ‘কথা বলা কঠিন এরচেয়ে কবিতা পড়া সহজ। কবিতা আগেই লেখা রয়েছে। কথা তো ভাবতে হবে, ভেবে ভেবে বলতে হবে। আমার মনের কথা তো কবিতাতেই বলি।’ এরপর তিনি একে একে পাঠ করেন তার জনপ্রিয় সব কবিতা: মেঘবালিকা, মালতিবালা স্কুল, আমরা তো অল্পে খুশি ও পাগলি তোমার সঙ্গে। দর্শকদের অনুরোধেও পড়লেন বেশ কটি কবিতা। এ পর্ব সঞ্চালন করেন কবি আসাদ চৌধুরী। শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন কবি শিহাব শাহরিয়ার। দর্শক সারিতে এ সময় উপস্থিত ছিলেন সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক, আনোয়ারা সৈয়দ হক, ইত্তেফাক এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেন, লেখক আনিসুল হক, জয় গোস্বামীর স্ত্রী কাবেরী গোস্বামী প্রমুখ।
প্রসঙ্গত, ১৯৮৮ সালে যুক্তরাজ্যের ওয়েলসের হে-অন-ওয়াই শহরের ব্রেকন বিকন ন্যাশনাল পার্কে প্রথম শুরু হয় ‘হে ফেস্টিভ্যাল’। শহরের নাম অনুসারে এ উত্সবের নামকরণ করা হয়েছে।