বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে সোনা চোরাচালান চক্র শনাক্ত এবং এই চক্রের সদস্য মাহমুদুল হক পলাশ বিমান পরিচালনা পর্ষদ চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) জামাল উদ্দিন আহমেদের ‘ধর্মপুত্র’ হওয়ায় সরকারের শীর্ষ মহল বিব্রত। গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বিমান চেয়ারম্যানের অপসারণের দাবিও উঠেছে। বিষয়টি নিয়ে গতকাল শুক্রবার বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলেন বলে জানা গেছে। এ সময় প্রধানমন্ত্রী ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে বলেন, অবিলম্বে এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
এদিকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাইলটদের চাকরির বয়স ৫৭ থেকে তিন বছর বৃদ্ধির বিষয়টি দীর্ঘদিন যাবত্ আদালতে বিচারাধীন রয়েছে। কিন্তু মামলটি নিষ্পত্তি হওয়ার আগেই বিমান পরিচালনা পর্ষদ সম্প্রতি পাইলটদের চাকরির বয়স তিন বছর বাড়িয়ে দিয়েছে। তবে এ ব্যাপারে কোন প্রশাসনিক আদেশ না হলেও বয়স বৃদ্ধির সুবিধা ভোগ করছেন কোন কোন পাইলট। হাসনাইন চৌধুরী নামে বিমানের এক পাইলটের চাকরির বয়স শেষ হয়েছে গত ১১ অক্টোবর। কিন্তু তিনি এখনও চাকরিতে বহাল আছেন বলে জানা গেছে।
বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স পাইলট এসোসিয়েশনের (বাপা) একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা গতকাল ইত্তেফাককে জানান, বিমানের পাইলটদের চাকরির বয়স ৬০ বছর করার জন্য প্রায় চার বছর আগে আদালতে মামলা করে বাপা। কিন্তু মামলাটি ঝুলে থাকায় ৫৭ বছর পূর্তির কারণে অবসরে যেতে হতে পারে এমন কোন কোন পাইলট বিমানের পরিচালনা পর্ষদের সঙ্গে সমঝোতায় যান। সমঝোতা অনুযায়ী প্রায় চার বছর মামলা পরিচালনার খরচ বাবদ ৩০ লাখ টাকা পরিশোধ করার শর্তে চাকরি মেয়াদ বাড়াতে সম্মত হয় বিমান কর্তৃপক্ষ। বিমানের পরিচালনা পর্ষদ গত ১১ সেপ্টেম্বর এক সভায় পাইলটদের চাকরির বয়স ৬০ বছর করার সিদ্ধান্ত নেয়। এ সিদ্ধান্তের আগে বিমানের তহবিলে ৩০ লাখ টাকা জমা দিয়ে শর্ত পূরণ করা হয়। তবে বাপা’র তহবিল থেকে এই অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। অর্থের যোগান দেন বিমানের চিফ অব প্লানিং এন্ড সিডিউলিং ক্যাপ্টেন আবু মোহাম্মদ আসলাম শহীদ এবং বিমানের ঠিকাদার মাহমুদুল হক পলাশ। তারা উভয়েই গ্রেফতারের পর বর্তমানে গোয়েন্দা পুলিশের রিমান্ডে আছেন।
এর আগে ২০১২ সালে হজ্ব ফ্লাইট পরিচালনার সময় বাপা পাইলটদের চাকরির বয়স বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন দাবিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য ধর্মঘট শুরু করে। ফলে হজ্বযাত্রী বহনে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়। এই ধর্মঘট প্রায় সপ্তাহকাল চলে। এ ঘটনায় একটি তদন্ত কমিটি বাপা’র তত্কালীন সভাপতি ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমানসহ সাত জনকে অভিযুক্ত করে। কিন্তু পাঁচ মাস আগে মাহবুবুর রহমানকে অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে।
এদিকে বিমানের প্রায় ডজন খানেক ককপিট ও কেবিন ক্রু’র বিরুদ্ধে সোনা চোরাচালান সিন্ডিকেটের সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। জাতীয় পতাকাবাহী এ সংস্থার মার্কেটিং ও সেলস বিভাগের এক শ্রেণীর কর্মকর্তা এবং ঢাকার কতিপয় ট্রাভেল এজেন্টের বিরুদ্ধেও নানা অভিযোগ উঠেছে। বিতর্কিত এক কর্মকর্তা দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর যাবত্ মার্কেটিং বিভাগের দায়িত্বে রয়েছেন। ওই কর্মকর্তার অফিস কক্ষে সোনা চোরাচালানের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত মাহমুদুল হক পলাশ নিয়মিত ওঠাবসা করতেন।
বিমানের অপর একটি সূত্র জানায়, পলাশের স্ত্রী বিমানের একজন জুনিয়র পার্সার। ২০০৭ সালে তিনি সব ধরনের আর্থিক সুবিধা নিয়ে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসরে যান। দুই বছর পর আবার নিয়োগ পান। সম্প্রতি তিনি বিমানের একটি এয়ারবাস ৩১০ উড়োজাহাজে অপারেটিং ক্রু হিসেবে ঢাকা থেকে আবুধাবি যান। সেখানে দু’দিন অবস্থানের পর বিজি ০২৮ ফ্লাইটে আবুধাবি থেকে সিলেট হয়ে ঢাকায় আসেন। কিন্তু তাকে এই ফ্লাইটে এক্সিকিউটিভ ক্লাসে ভ্রমণের সুযোগ করে দেয়া হয়। অথচ কোন কেবিন ক্রু’র এক্সিকিউটিভ ক্লাসে ভ্রমণ সম্পূর্ণ আইনবহির্ভূত। ওই ফ্লাইটেই নাকি সোনার একটি বড় চালান ঢাকায় আসে।
প্রসঙ্গত, বিমানকে লাভজনক সংস্থায় পরিণত করার লক্ষ্যে সরকার ২০১১ সালের মার্চ মাসে ব্রিটিশ নাগরিক কেভিন জন স্টিলকে এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দুই বছরের জন্য নিয়োগ দেয়। তিনি ২০১৫ সালের মধ্যে বিমানকে লাভজনক করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। তখন শুরু হয় বিমানের অভ্যন্তরীণ সংস্কার কার্যক্রম। কিন্তু মাঝপথে এসে সংশ্লিষ্ট এক শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরোধিতার কারণে তার সংস্কার কার্যক্রম মুখ থুবড়ে পড়ে। চুক্তি অনুযায়ী চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার এক বছর আগেই কেভিন স্টিল ইস্তফা দিয়ে চলে যান। দীর্ঘ আট মাস যাবত্ ওই পদে আর কাউকে নিয়োগ দেয়া হয়নি। একজন পরিচালক ভারপ্রাপ্ত হিসেবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।