অসৌজন্যমূলক আচরণের প্রতিশোধ নিতে শফিউল খুন: র‌্যাব সদর দফতর

 
অসৌজন্যমূলক আচরণের প্রতিশোধ নিতেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. এ কে এম শফিউল ইসলাম লিলনকে খুন করা হয়েছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি ও রাজশাহী জেলা যুবদলের সদস্য আব্দুস সামাদ পিন্টুর স্ত্রী মতিহার থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিনের ভাতিজি নাসরিন আক্তার রেশমা প্রশাসন ভবনে হিসাব শাখার সেকশন অফিসার। র্যাবের কর্মকর্তা কমান্ডার মাহমুদ খান বলেন, ‘নাসরিন আক্তার রেশমার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণের ঘটনার জের ধরেই অধ্যাপক শফিউল খুন হয়েছেন।’ রবিবার এক সংবাদ সম্মেলনে র‌্যাব  সদর দফতরের পক্ষ থেকে এ সব কথা বলা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়— রেশমার সাথে অধ্যাপক শফিউলের বেশ কয়েকবার অসৌজন্যমূলক আচরণে ঘটনা ঘটায় বিষয়টি নিয়ে মধ্যস্থতা করার জন্য পিন্টু রাজশাহী জেলা যুবদলের আহ্বায়ক ও রাবি ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন উজ্জ্বলের দারস্থ হন। বিষয়টি নিয়ে উজ্জ্বলের নেতৃত্বে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে সিদ্ধান্ত অনুযায়ী উজ্জ্বল বিষয়টি নিয়ে প্রতিবাদ করার জন্য অধ্যাপক শফিউলের সঙ্গে দেখা করেন। সেখানেও উভয়ের মধ্যে বাক-বিতণ্ডা হয়। পরবর্তীতে তারা সিদ্ধান্ত নেয় যে, অধ্যাপক শফিউলকে এ জন্য শাস্তি দিতে হবে। এ জন্য রাজশাহীর কাঁটাখালী পৌর যুবদলের সাংগাঠনিক সম্পাদক আরিফুল ইসলাম মানিকের নেতৃত্বে খুনের অপারেশন পরিচালিত হয়। এই খুনের মিশনে অংশ নেব ১১ জন। এদের মধ্যে ৬ জনকে র্যাব গ্রেফতার করেছে। গ্রেফতারকৃতরা হলেন— রাবি ছাত্রদলের সাবেক সহসভাপতি আব্দুস সামাদ পিন্টু, কাঁটাখালী পৌর যুবদলের সাংগাঠনিক সম্পাদক আরিফুল ইসলাম মানিক, ইব্রাহিম খলিল বাবু, সবুজ শেখ, আল মামুন ও সিরাজুল ইসলাম কালু। খুনের মিশনে অংশ নেয়া ১১ জনের মধ্যে আরিফ, সাগর ও জিন্নাহ পুলিশের হাতে আগেই গ্রেফতার হয়েছে। এই খুনের নির্দেশদাতা রাজশাহী জেলা যুবদলের আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন উজ্জ্বল ও যুবদল নেতা হন্ডি ব্যবসায়ী জামাই বাবু পলাতক রয়েছেন। শনিবার রাতে রাজশাহী ও গাজীপুরে টঙ্গীতে অভিযান চালিয়ে এই ৬ জনকে গ্রেফতার করে র্যাব। তাদের কাছ থেকে হত্যায় ব্যবহূত চাপাতি, ছুরি ও হাসুয়া উদ্ধার করা হয়েছে।
রবিবার গ্রেফতারকৃত ৬ জনকে র্যাব সদর দফতরে সাংবাদিকদের সামনে হাজির করা হয়। গ্রেফতারের ঘটনায় র্যাব সদর দফতরে অনুষ্ঠিত সাংবাদিক সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক কর্নেল জিয়াউল আহসান, গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে.কর্নেল আবুল কালাম আজাদ, লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া শাখার পরিচালক কমান্ডার মাহমুদ খান, উপপরিচালক মেজর রুম্মন ও সহকারী পরিচালক ক্যাপ্টেন মাকসুদ।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়— পিন্টুর স্ত্রী প্রশাসন ভবনের হিসাব শাখার সেকশন অফিসার নাসরিন আক্তার রেশমা মতিহার থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আলাউদ্দিনের ভাতিজী। র্যাবের মিডিয়া এ্যান্ড লিগ্যাল শাখার পরিচালক কমান্ডার মাহমুদ খান বলেন, ঘটনার ১০/১৫ দিন পূর্বে পিন্টুর স্ত্রী নাসরিনের সঙ্গে অধ্যাপক শফিউল অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন। এ নিয়ে পিন্টুর সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয়। পিন্টু ওই  কথা কাটাকাটির বিষয় নিয়ে শিক্ষককে শায়েস্তা করার জন্য পরিকল্পনা করতে থাকেন। পরিকল্পনা অনুযায়ি জেলা যুবদলের আহ্বায়ক আনোয়ার হোসেন উজ্জলের কাছে ক্ষোভের কথা জানায়। উজ্জ্বল বিষয়টি নিয়ে শিক্ষক অধ্যাপক শফিউলের সঙ্গে কথা বলেন। সেখানে তাদের মধ্যেও উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয় এবং উজ্জ্বল অপমানিত বোধ করায় ওই শিক্ষককে সায়েস্তা করার পরিকল্পনা করেন। ঘটনার ৮-১০ দিন আগে একটি চায়ের দোকানে মানিক, উজ্জ্বল ও পিন্টু চা খান। সেখানে পরিকল্পনা হয় অধ্যাপক শফিউলকে শায়েস্তা করতে হবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী উজ্জ্বল ও পিন্টু তারই পরিচিত কাঁটাখালী পৌরসভার যুবদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মানিককে দায়িত্ব দেন।
১৫ নভেম্বর দুপুর আড়াইটার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেসরকারি আবাসিক এলাকা বিহাস-সংলগ্ন চৌদ্দপায়া এলাকার আতাউরের বাড়ির পার্শ্বে কাঁচারাস্তার ওপর মানিক অধ্যাপক শফিউলকে রাস্তায় বাধা দেন। বাক-বিতন্ডার একপর্যায়ে সবুজ শেখ শিক্ষকের মাথায় চাপাতি দিয়ে কোপ দেন। সবুজের চাপাতির কোপে শিক্ষক মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ঘটনার পর যখন তারা দেখতে পান শফিউল তাদের চিনে ফেলেছেন, তখনই মামুন, আরিফ, বাবু ও কালু চাপাতি, হাসুয়া ও চাকু নিয়ে অধ্যাপক শফিউলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন।
র্যাব সদর দফতরে সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়—গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে মামুন বলেন, এ কাজের জন্য তিনি কোনো টাকা পাননি। শুধু বড় ভাই ও জেলা যুবদলের আহ্বায়ক বলেছেন সে কারণে বড় ভাইয়ের কথামতো এ কাজ করেছেন। স্যারকে হত্যার উদ্দেশ্য ছিল না।
সংবাদ সম্মেলনে আরো বলা হয়— গ্রেফতারকৃত যুবদল নেতা মানিক বলেছেন, এই কিলিং মিশনে অংশ নেয়া সাগর ব্যাটারিচালিত গাড়ি চালান ও রাজশাহীর কাটাখালী পৌরসভার ৫ নং ওয়ার্ড ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক, আরিফ টাইলস মিস্ত্রি ও কাটাখালী পৌরসভার যুবদলের সদস্য, জিন্নাহ যুবদলের সদস্য, বাবু ব্যাটারিচালিত গাড়ি চালান তিনি যুবদলের সদস্য, মামুন তার চাচাতো ভাই, জামাই বাবু মাছের ব্যবসা করেন, কালু মুদির দোকানদার ও যুবদল সদস্য এবং সবুজ যুবদল সদস্য। 
র্যাবের  সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়— যুবদলের নেতা-কর্মীদের পরিকল্পনায় অধ্যাপক শফিউল খুনের ঘটনার সঙ্গে জঙ্গি সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
এ দিকে, অধ্যাপক শফিউল খুনের ঘটনার পর আনসার আল ইসলাম বাংলাদেশ-২ নামের একটি জঙ্গি সংগঠন হত্যার দায় স্বীকার করে ফেসবুকে আপলোড করে। এই ফেসবুকে কে দায় স্বীকার করল, তা নিয়ে এখনো র্যাব ও পুলিশ তদন্তের কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি। তবে র্যাবের সংবাদ সম্মেলনে গ্রেফতারকৃতরা জানিয়েছেন— তারা ফেসবুকে এই স্বীকারোক্তি আপলোড করেননি। অন্যদিকে, আব্দুস সালাম পিন্টুর স্ত্রী নাসরিন আক্তার রেশমার সঙ্গে অধ্যাপক শফিউলের অসৌজন্যমূলক আচরণের ঘটনাটি নিয়ে খোদ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবনের পদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রশাসন ভবনের হিসাব শাখার একজন পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, ‘অধ্যাপক শফিউল প্রায়ই তার কক্ষে আসতেন। তাদের মধ্যে বন্ধুসুলভ সম্পর্কের জের ধরে আড্ডা চলত। কিন্তু কখনো তার কাছ থেকে হিসাব শাখার একজন সেকশন অফিসারের অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ পাননি। এমনকি অধ্যাপক শফিউল হিসাব শাখায় এলেও কখনো সেকশন অফিসার নাসরিন আক্তার রেশমার সঙ্গে কথা বলতেও দেখিনি। নাসরিন আক্তার রেশমার স্বামী পিন্টু ছাত্রদলের নেতা হলেও তার পরিবার কঠোর আওয়ামী পন্থী। বিশেষ করে রেশমার চাচা আলাউদ্দিন মতিহার থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। রেশমার মৃত বাবাও একসময় তুখোর আওয়ামী লীগ নেতা ছিলেন। এই পরিবারের সাথে অধ্যাপক শফিউলের কোনো অসৌজন্যমূলক আচরণের ঘটনা ঘটলে, সেটি পারিবারিকভাবেই সমাধান করা যেত।