চালকের আসনে থাকা নেহা জামিন পাননি চার মাসেও

দুর্ঘটনা, দুর্ঘটনাই। কিন্তু হত্যার উদ্দেশ্যে দুর্ঘটনা? তাও কী সম্ভব? এমনই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে রাজধানীতে ঘটে যাওয়া একটি সড়ক দুর্ঘটনা। আর এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। গত ১১ জুলাই গভীর রাতে মহাখালীর বিএএফ শাহীন কলেজের সামনে কালো রঙের একটি প্রাইভেটকার (ঢাকা মেট্রো-গ-২৯-০৩৫০) ফ্লাইওভারের সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা তেজগাঁও থানার একটি ভ্যানকে সজোরে ধাক্কা দেয়। নিহত হন চালকের বামপাশের আসনে বসে থাকা তরুণ মোস্তামসির আশরাফ শুভ্র (২৭)। আহত হন পিকআপ ভ্যানে থাকা এক পুলিশ ও দুই আনসার সদস্য। তবে অক্ষত ছিলেন চালকের আসনে থাকা তরুণী জান্নাতি হোসেন নেহা (২৩)। তিনি নিহত শুভ্রর ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ও ব্যবসায়ীক অংশীদার। ঘটনার পর পরই পুলিশ তাকে আটক করে। পরে তাকে আসামি করে তেজগাঁও থানার সাব-ইন্সপেক্টর সরদার নিজামুল বাদী হয়ে থানায় মামলা করেন। পুলিশ নেহাকে আদালতে পাঠায়। ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দুর্ঘটনার বর্ণনা দেয়ার পর আদালতের নির্দেশে নেহাকে পাঠানো হয় কারাগারে। আর ঘটনার ১১ দিন পর শুভ্রর চাচা আব্দুল হান্নান খান বাদী হয়ে আদালতে হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় আসামি করা হয় নেহা, তার বাবা দেলোয়ার হোসেন, দুই ভাই জুবায়ের, জুনায়েদ ও নেহার স্বামী রেমন সিদ্দিককে। বর্তমানে দুইটি মামলাই তদন্ত করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডি। সিআইডি তিন দফায় নেহাকে ১৫ দিনের রিমান্ডে  নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে। জামিন মেলেনি নেহার। গত চার মাস ধরে তিনি রয়েছেন কারাগারে। অপরদিকে গ্রেফতারের ভয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন নেহার বাবাসহ অন্য আসামিরা।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডি পরিদর্শক উত্তম কুমার বিশ্বাস বলেন, একদিকে দুর্ঘটনা জনিত মামলা অন্য দিকে হত্যা মামলা। তদন্ত করতে গিয়ে অনেক প্রশ্নের জবাব উত্তর মিলছে না।
তিনি বলেন, কী কারণে দুর্ঘটনা ঘটেছে তা নির্ধারণের জন্য বিআরটিএ-এর একটি উচ্চতর তদন্ত কমিটি গঠনের জন্য আদালতের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে। আদালত থেকে এ সংক্রান্ত কোন আদেশ গতকাল পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।
তিনি আরো বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে নেহা কিছু প্রশ্নের জবাব পরিষ্কার করতে পারেননি। এ বিষয়গুলোর জন্য তার বাবাসহ অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু তাদের খুঁজে না পাওয়ায় তা সম্ভব হচ্ছে না। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, নেহার ড্রাইভিং লাইসেন্স রয়েছে। তা জব্দ করা হয়েছে। আবার শুভ্রর ময়না তদন্ত রিপোর্টে মৃত্যুর কারণ হিসেবে দুর্ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়।
তবে চার মাসে মামলার অগ্রগতি কী– এমন প্রশ্নের জবাবে তদন্ত কর্মকর্তা বলেন, কোন অগ্রগতি নেই। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী অনেক সাক্ষী থাকলেও তাদের কারো ঠিকানা লিখে রাখেনি পুলিশ। ফলে প্রত্যক্ষদর্শী কোন সাক্ষীর সঙ্গে কথা বলা যায়নি। শুধু তিন পুলিশ সদস্যের সাক্ষ্য নেয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ঘটনার দিন রাতে শুভ্রর গাড়ি চালককে বিদায় দেন নেহা। শুভ্রর গাড়ি চালককে বিদায় দিয়ে নেহা কেন সেই গাড়ি চালাচ্ছিলেন-এর কোনো উত্তর দিতে পারেননি নেহা।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, নেহা ও শুভ্রর বন্ধুত্বের বাইরেও ছিল ব্যবসায়িক সম্পর্ক। আর সেই কারণেই সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে নানা সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। তাছাড়া ঘটনাটি ঘটেছিল শেষ রাতে। তবে ঘটনার পরপর পুলিশের সন্দেহ না হলেও শুভ্রর পরিবারের পক্ষ থেকে মামলা করার পরই নানা প্রশ্নের জন্ম নেয়।
দুই পরিবারের সঙ্গে কথা বলেছেন তদন্ত কর্মকর্তা। তারা জানিয়েছেন, রেস্টুরেন্ট ব্যবসার কারণে তারা প্রায়শই রাত করে বাসায় ফিরতেন। তারপরও হিসাব মেলানো যাচ্ছে না অনেক কিছুর।
ঘটনার এক বছর আগে নেহার সঙ্গে শুভ্রর পরিচয় হয়। এরপর তারা পার্টনারশিপে অনলাইন মিউজিক ও গেম শপ চালু করেন। নেহা নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগের সম্মানের ছাত্রী। বাসা নিকুঞ্জ এলাকায়। নেহার বাবা দেলোয়ার হোসেন পেশায় ট্রাভেল এজেন্সির ব্যবসায়ী। গ্রামের বাড়ি শরীয়তপুর জেলার জাজিরা উপজেলায়।
নিহত মোস্তামসির আশরাফ শুভ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (আইবিএ) থেকে এমবিএ পাস করেছিলেন। তার বাবার নাম আবদুল মান্নান। তিনি সর্বশেষ ফরিদপুরের জেলা ও দায়রা জজ ছিলেন। বর্তমানে সচিবালয়ের কাছে অবস্থিত ভূমি নিবন্ধন অধিদফতরের মহাপরিদর্শক বা আইজিআর (ইন্সপেক্টর জেনারেল অব রেজিস্ট্রেশন) হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। বাসা উত্তরার ৬ নম্বর সেক্টরে। গ্রামের বাড়ি ঢাকার দোহার থানার মোকছেদপুরে।

মামলার তদন্ত সূত্র জানায়, আদালতে জবানবন্দিতে নেহা জানান, ঘটনার দিন ‘বনানী থেকে তাদের গাড়িটি ফ্লাইওভার হয়ে জাহাঙ্গীর গেটের দিকে যাচ্ছিল। মহাখালী ফ্লাইওভার থেকে গাড়িটি নিচে নামার সময় একটি সিএনজি অটোরিকশাকে বাঁচাতে গিয়ে তারা দুর্ঘটনায় পড়েন। দুর্ঘটনার সময় তার সিটবেল্ট বাঁধা ছিল। কিন্তু শুভ্রর সিটবেল্ট বাঁধা ছিল না।