অগভীর পানিতে জাহাজ চলাচল ও অভ্যন্তরীণ নৌপথে ড্রেজিং

আমরা অনেকেই হয়ত খেয়াল করিনি, নদীনালা ব্যাপৃত বাংলাদেশে প্রধানত নৌযানে করেই বেশিরভাগ মালামাল পরিবাহিত হয়। বাস্তবেও তেমনটাই হওয়ার কথা। কারণ নৌযানই হচ্ছে মালামাল পরিবহনের সব থেকে সস্তা মাধ্যম। কথায় আছে, যেদিন পর্যন্ত নদ-নদীতে দু’চার ফুট পর্যন্ত পানিও থাকবে, নৌ পরিবহনই হবে সাশ্রয়ী মালামাল পরিবহনের প্রধান মাধ্যম।

আমার মনে আছে, বঙ্গবন্ধু সেতু তৈরির কাজ শুরু করার মাস ছয়েক আগে দক্ষিণ কোরিয়ার ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ‘হুন্দাই’ কোম্পানির কোরিয়ান প্রকল্প পরিচালক, উচ্চশিক্ষিত নেভাল আর্কিটেক্টকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন। উদ্দেশ্য, মাওয়া পয়েন্ট থেকে শুরু করে টাঙ্গাইলের ভুয়াপুর পর্যন্ত পদ্মা এবং যমুনা নদীর কম পানিতে চলাচল উপযোগী তিনখানা জাহাজ বানানো। সেসব দিনে এপথে চলাচলের জন্য এ নদী দুটোর কোনো কোনো স্থানে ছয়-সাত ফুটের বেশি পানির গভীরতা ছিল না। ওদিকে সেতু বানানোর প্রধান উপকরণ ‘পাইল’ বা সেতুর খুঁটিগুলোর দৈর্ঘ্য এবং ওজন বিবেচনায় এসব মালামাল বহন করার উপযোগী কোনো জাহাজও বাংলাদেশে ছিল না। এমন প্রতিকূল অবস্থা কাটিয়ে উঠার জন্য, আগেভাগেই তারা এ জাহাজ তিনটি বানিয়ে নেবার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে চট্টগ্রাম এবং মোংলা বন্দর থেকে আমার নিজের তত্ত্বাবধানে এসব ভারী মালামাল পরিবহন করেছি। আড়াইশ ফুট লম্বা, চল্লিশ ফুট প্রস্থ এ জাহাজ তিনটির প্রতিটিতে ১৭-১৮শ’ টন মালামাল নিয়ে কমবেশি ছয় ফুট পানিতে চলাচল করা যেত।

পরবর্তীতে আমি নিজেও, আট ফুট পানিতে চলাচল উপযোগী একটি দু’হাজার টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন জাহাজ বানিয়েছিলাম। এ জাহাজটি কম পানিতে খুলনা, নওয়াপাড়াসহ শীতলক্ষ্যা নদীর ঘোড়াশাল পর্যন্ত যেতে পারত। অন্যদিকে এ জাহাজের সমপরিমাণ ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন অনেক জাহাজই এসব স্থানে যেতে চাইলে পুরো ধারণক্ষমতার অর্ধেকের বেশি মালামাল বহন করতে পারে না। কারণ প্রচলিত পদ্ধতিতে বানানো দু’হাজার টনের একটি জাহাজ চলাচলের জন্য ১৪-১৬ ফুট পানির প্রয়োজন হয় ! তবে আশার কথা, ইদানীং বেশকিছু সিমেন্ট কোম্পানির মালিক আমার বানানো জাহাজের নকশার আদলে জাহাজ বানিয়ে কম পানিতে আনাগোনা করছেন। বর্তমানে এ ধরনের কোনো কোনো জাহাজ তিন হাজার টন মালামাল নিয়ে মংলা/চট্টগ্রাম-ঢাকা আসা-যাওয়া করে। এ কাজটি সর্বজনীন করার জন্য ‘ডিপার্টমেন্ট অব শিপিং’ চাইলে জাহাজ মালিকদের বুঝিয়ে বা নির্দেশনা জারি করে কম পানিতে চলাচল উপযোগী জাহাজের নকশা প্রণয়নের দিকে নজর দিতে পারেন। জাহাজের নকশা প্রণয়নের সময় নেভাল আর্কিটেক্ট ফার্মগুলোকেও এ ব্যাপারে খেয়াল রাখা উচিত। 

পলিমাটি বিধৌত বাংলাদেশে ড্রেজিং বা খনন করে নদীর নাব্যতা বজায় রাখা একটি দুরূহ এবং ব্যয়বহুল কাজ। আমার মনে হয় না, দেশের সকল নদনদীকে খনন করে নাব্যতা ফিরিয়ে আনার মতো বৈষয়িক ক্ষমতা আমাদের দেশের আছে। ব্যাপারটা ভবিষ্যতেও কতটা সম্ভব হবে সে ব্যাপারেও আমি সন্দিহান। এ কারণেই আমি ‘পারপাস বিল্ট’ অর্থাত্ নির্দিষ্ট কাজ এবং পানির গভীরতা বিবেচনা করে জাহাজ বানানোর দিকে নজর দিতে বলছি। এ কাজটি যমুনা নদীর বাঘাবাড়ি, পদ্মা নদীতীরে অবস্থিত পাকশি অথবা সিলেট নৌপথে চলাচলকারী জাহাজের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।

এছাড়া প্রচলিত পদ্ধতিতে বানানো ১৪-১৬ ফুট ড্রাফটের (পানির উপরিভাগ থেকে জাহাজের তলা পর্যন্ত দূরত্ব) জাহাজগুলো চলাচলের জন্য আপাতত দু’চারটি ড্রেজার দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম নৌপথের সন্দ্বীপ সোল, ইলিশা এবং মংলা-ঢাকা নৌপথের ঘশিয়াখালি, মিয়ার চরের মতো দু-দশটি এলাকা খনন করে রাখার আশু ব্যবস্থা নেওয়া উচিত যাতে বেশি পানিতে চলার উপযোগী জাহাজগুলো চলাচল করতে পারে। নির্মাণাধীন পায়রা বন্দরের জন্যও এ কাজের প্রয়োজন হবে। আমার জানামতে এসব ‘বার’ বা ‘সোল’গুলোর (কম পানির স্থান) প্রতিটি দৈর্ঘ্য ২-৪ কিলোমিটারের বেশি নয়। এসব ‘সোল’ এলাকাগুলো খনন করে চ্যানেল বা নৌপথটির দু’পাশে প্রয়োজনীয় সংখ্যক পথনির্দেশক ‘বয়’ বসিয়ে দিলে জাহাজের মাস্টারগণ নিরাপদে জাহাজ চালাতে পারবেন। সঠিক ভাবে চিহ্নিত করা হলে এসব নৌপথ (চ্যানেল) খুব বেশি চওড়া না হলেও চলে। আমাদের মনে রাখা দরকার, যেসব নদীতীরে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে সেসব নদীগুলোর নাব্যতা ফিরিয়ে এনে, সে নাব্যতা ধরে রাখা অত্যন্ত জরুরি। এসব কাজ কোনো ভাবেই জিইয়ে রাখা ঠিক নয়। তা ছাড়া এধরনের ছোটখাটো খননের অভাবে বহু বছর ধরে অনেক জাহাজ আংশিক মালামাল বহন করে যেমন আর্থিক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ঠিক তেমনইভাবে জাহাজের মাস্টারগণ অনিরাপদ অবস্থায় জাহাজ চালাতে বাধ্য হচ্ছেন।

এ অবস্থা কাটিয়ে উঠার জন্য আভ্যন্তরীণ নৌ পরিবহন কর্তৃপক্ষকে দ্রুত উদ্যোগ নিয়ে উপরে উল্লেখিত  এলাকাগুলো চিহ্নিত করে, যত শীঘ্র সম্ভব খনন করে দেওয়া উচিত। এসব এলাকা চিহ্নিত করার কাজে কর্মরত জাহাজের মাস্টারদের কাছ থেকে ধারণা নেওয়া যেতে পারে। এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে, প্রাথমিক খননের কাজটি বিদেশি ঠিকাদার দিয়ে করালে দ্রুত শেষ হবে। পরবর্তীতে খননকৃত স্থানগুলো পলিমুক্ত রাখার জন্য দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করা যেতে পারে।

খনন কাজের ব্যাপারে আরও একটি বিষয়ের দিকে খেয়াল রাখতে হবে-বড় কোনো অঙ্কের টাকা খরচ করে একবার ‘ক্যাপিটাল ড্রেজিং’ করেই ক্ষান্ত দিলে হবে না। সেক্ষেত্রে খনন অব্যাহতির দু’-এক বছরের মধ্যেই আবার পলি জমে নৌ পথটির গভীরতা কমে যাবে। কাজেই এ কাজের জন্য দু-চারটি সার্বক্ষণিক (ডেডিকেটেড) ড্রেজার নিয়োজিত রেখে, তেমন কোনো পলি জমার আগেই যেখানে যতটা প্রয়োজন সেখানে ততটা খনন করে দিতে হবে। এমন ব্যবস্থা ছাড়া নৌপথগুলোকে কার্যকর রাখা সম্ভব হবে না।

উপরে উল্লেখিত বিষয়গুলোর দিকে যথাযথ কর্তৃপক্ষ আশু নজর দিবেন এমনটাই আশা করি।

n লেখক : মাস্টার মেরিনার ও শিপিং কনসালটেন্ট