তিস্তা ও সীমান্ত চুক্তি কার্যকরে জোর প্রচেষ্টার আশ্বাস মোদীর

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশের সঙ্গে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর ও স্থল সীমান্ত চুক্তি কার্যকরে জোর প্রচেষ্টা চালানোর আশ্বাস দিয়েছেন। গতকাল বুধবার নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে ১৮ সার্ক শীর্ষ সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনের পর বিকালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দ্বি-পক্ষীয় বৈঠককালে নরেন্দ্র মোদী এমন আশ্বাস দিয়ে বলেন, যত দ্রুত সম্ভব বিষয়টি সমাধানের জন্য তিনি জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। শিগগিরই এর সুরাহা হবে বলেও আশাবাদী তিনি।   বৈঠক শেষে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক সাংবাদিকদের আরো জানান, বৈঠকে তিস্তা চুক্তি স্বাক্ষর ও স্থল   সীমান্ত চুক্তি কার্যকরে কী অগ্রগতি হয়েছে- তা ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে জানতে চেয়েছিলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জবাবে নরেন্দ্র মোদী বলেন, খুব দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। স্থল সীমান্তের ব্যাপারে রিপোর্ট এলে গৃহীত হবে। এ বিষয়ে ঐকমত্য হচ্ছে। তিস্তা চুক্তির বিষয়েও আলোচনা হচ্ছে।

এর আগে মূলত পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আপত্তির কারণেই গত তিন বছর ধরে তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি আটকে আছে। ভারতের কংগ্রেস সরকার ক্ষমতায় থাকতে সেদেশের পার্লামেন্টে স্থল সীমান্ত চুক্তি কার্যকরে প্রস্তাব তোলা হলেও সে সময়ের বিরোধী দল বিজেপি এর বিরোধিতা করেছিল। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে শহীদুল হক বলেন, ‘এই বিষয়ে ঐকমত্য গড়ে উঠছে এবং হবে বলে উনি (নরেন্দ্র মোদী) আশাবাদী’। এছাড়া দ্বি-পক্ষীয় বৈঠককালে দক্ষিণ এশিয়ায় সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ দমনে বাংলাদেশ ও ভারতের উভয় নেতা একযোগে কাজ করার বিষয়ে একমত হন।
প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকন সাংবাদিকদের জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জানিয়েছেন, তারা সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করছেন। আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যমান সমস্যার সমাধান করা হবে। তিনি বলেন, দুই প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকে বর্ধমানের জঙ্গি সমস্যা সমাধানেও দুই দেশের গোয়েন্দাদের তথ্য বিনিয়ম করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বাংলাদেশ সময় বিকাল ৩টা ২০ মিনিটে বাংলাদেশ ও ভারতের দুই প্রধানমন্ত্রীর এ বৈঠক শুরু হয়। ৩টা ৪০ মিনিটে বৈঠকটি শেষ হয়। বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজও উপস্থিত ছিলেন। এটি ছিল দুই প্রতিবেশী দেশের সরকার প্রধানের দ্বিতীয় বৈঠক। এর আগে গত সেপ্টেম্বর মাসে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে শেখ হাসিনার সঙ্গে বৈঠকে বসেন নরেন্দ্র মোদি। সেখানেও তিস্তা চুক্তি ও স্থল সীমান্ত চুক্তি কার্যকরে তার আন্তরিকতার কথা জানিয়েছিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
সার্কভুক্ত দেশগুলোর জন্য ৩-৫ বছরের
ব্যবসায়িক ভিসা দেয়া হবে
সম্মেলনে দেয়া ভাষণে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সার্কভুক্ত দেশগুলোর জন্য তার দেশের পক্ষে ৩-৫ বছরের ব্যবসায়িক ভিসা দেয়ার ঘোষণা দেন। একই সঙ্গে ভারতে চিকিত্সা ভিসা সহজ করার ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেছেন, এখন থেকেই এই ভিসা দেয়া হবে। পাশাপাশি ভারতে চিকিত্সার জন্য আসা রোগী ও তার একজন সঙ্গী তাত্ক্ষণিক চিকিত্সা ভিসা পাবেন। তিনি বলেন, তার বিশ্বাস, এর মাধ্যমে সার্ক দেশগুলো একে অপরের গ্রাম ও শহরকে উন্নত করতে সক্ষম হবে। এ অঞ্চলের জন্য উজ্জ্বল আগামী নির্মাণ করতে পারবে। সার্ক দেশগুলোর সঙ্গে ভারতের বিশাল বাণিজ্য থাকলেও তা টেকসই নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন প্রসঙ্গে নরেন্দ্র মোদী বলেন, আমরা আমাদের ক্রেতা ও পরিবেশের জন্য কী করছি, সে বিষয়ে চিন্তা করতে হবে। সরাসরি বাণিজ্যরুট তৈরির মাধ্যমে ক্রেতা ও উত্পাদকের মধ্যে দূরত্ব কমিয়ে আনতে চাই। ভারত এই কাজটি করবে। এক্ষেত্রে অবকাঠামোগত সমস্যার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ভারতের অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। সার্কের এগিয়ে যাওয়ার গতি বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, সার্ক যে গতিতে এগিয়ে যাওয়ার কথা ছিল, সেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে না। এর ফলে আমরা অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছি। সার্কের অন্যান্য দেশগুলোর নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বলেন, আসুন, আমরা এক হয়ে কাজ শুরু করি। আমাদের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করি। নিজেদের এগিয়ে নিয়ে যাই। নৈরাজ্যকে আশাবাদে পরিণত করতে একযোগে কাজ করি।
লোকসভার শীতকালীন অধিবেশনেই
পাস হচ্ছে স্থল সীমান্ত চুক্তি বিল
তারিক হাসান, কলকাতা থেকে জানান, দীর্ঘ দিন ধরে ঝুলে থাকা স্থল সীমান্ত চুক্তি সংশোধনী বিলটি বিজয় দিবসের আগেই পাস করাতে আগ্রহী ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তার ইচ্ছে- এটা দ্রুত পাস হলে বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বের পথ আরো প্রশস্ত হবে। সেই মতো বিলটি ভারতের লোকসভার শীতকালীন অধিবেশনেই পাস করাতে উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার নয়া দিল্লিতে স্থল সীমান্ত চুক্তি সংশোধনী বিষয়টি নিয়ে ভারতের সংসদের পররাষ্ট্র বিষয়ক স্থায়ী কমিটির বৈঠকে সব দলের সম্মতি মিলেছে। সেখানে মমতা ব্যানার্জির দলের এমপি সুগত বসু সবুজ সংকেত দিলেও আরেক নেতা মুকুল রায় বলেছেন, পুনর্বাসন প্যাকেজের বিষয়টি দেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। তবে সুগত বসুর সম্মতির কারণে বিলটি সর্বসম্মতিক্রমে পাস হয়। বিষয়টি নিয়ে সম্মতি দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের বিরোধী দল সিপিএমও।
শশী থারুরের নেতৃত্বাধীন পররাষ্ট্র বিষয়ক স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিষয়টি পাস হয়ে যাওয়ায় ভারতের সংসদে সীমান্ত-বদল সংক্রান্ত সংবিধান সংশোধনী বিল অনুমোদনের বিষয়টি পরিষ্কার হলো। ভারতের লোকসভায় এনডিএর দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। সেখানে বিলটি পাস নিয়ে চিন্তা নেই। চিন্তা ছিল রাজ্যসভা নিয়ে। পররাষ্ট্র বিষয়ক স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বিষয়টি পাস হওয়ায় রাজ্যসভা নিয়েও দুশ্চিন্তা কমল।

উল্লেখ্য, অতীতে বিরোধিতা করলেও গত লোকসভা নির্বাচনের আগে থেকেই মমতা ব্যানার্জি বলে আসছেন, তিনি স্থল সীমান্ত চুক্তির পক্ষে। কয়েকদিন আগে দিল্লিতেও তিনি সেই কথা আবারও বলেছেন। কয়েকদিন আগে বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধি দলের সঙ্গে বৈঠকেও মমতা বলেছেন, আমি চাই ছিটমহলের মানুষের সমস্যা মিটুক।