বেঙ্গলের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের পর্দা উঠবে আজ

আজ পর্দা উঠছে বহু কাঙ্ক্ষিত শাস্ত্রীয় সঙ্গীত উত্সবের। তৃতীয়বারের মত শুরু হতে যাওয়া বেঙ্গল উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত উত্সব বাংলাদেশ এবার আরো বর্ণাঢ্য আয়োজনে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এ বছর উত্সবের সময় একদিন বাড়িয়ে পাঁচদিন করা হয়েছে। আর্মি স্টেডিয়ামে আজ নভেম্বরের ২৭ থেকে ১ ডিসেম্বর পর্যন্ত চলবে উত্সব।
প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে ভোর পর্যন্ত চলবে এই আয়োজন। ২৭ নভেম্বর উদ্বোধন হবে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়। শুক্র ও শনিবার সন্ধ্যা ৬টায় আর রবি ও সোমবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় শুরু হবে অনুষ্ঠান। আর প্রতিদিনই অনুষ্ঠান চলবে ভোর পাঁচটা  পর্যন্ত। আজ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দেশের ২৬ জন স্বনামধন্য শিল্পী গান গাইবেন। তাছাড়া পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী, শহীদ পারভেজ খান, রুচিরা কেদার, মালবিকা সারুক্কাই, আজিনক্যা জোশি, রাজরূপা চৌধুরী সঙ্গীত পরিবেশন করবেন।
এবছর পাঁচদিনের এই উত্সবে ১৬০ জন শিল্পী অংশ নেবেন। এর মধ্যে থাকবে ৭৫ জন বাংলাদেশি শিল্পীর পরিবেশনা। উচ্চাঙ্গের কণ্ঠসঙ্গীত ও নৃত্য পরিবেশনাসহ বাঁশি, সেতার, সরোদ, বেহালা, সন্তুর নানা তালবাদ্যের মহিমান্বিত সুর ঝংকার মেলে ধরবেন শিল্পীবৃন্দ। প্রতিদিন ১১ ঘণ্টা করে পাঁচদিনে মোট ৫৫ ঘণ্টা ধ্রুপদী আঙ্গিকের সুরের মায়াজালে অবগাহন করবেন শ্রোতারা।
উত্সবে যোগ দিতে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে আসছেন পদ্মবিভূষণ বিদুষী কিশোরী আমানকর। যোগ দেবেন বিশ্বখ্যাত সরোদবাদক পদ্মবিভূষণ ওস্তাদ আমজাদ আলী খান। এবারে প্রথমবারের অংশ নেবেন ভরতনাট্যমের শিল্পী মালবিকা সাররুকাই, কর্ণাটকি তালবাদ্যের কড়াইকুডি মানি, উমাকান্ত ও রমাকান্ত গুণ্ডেচা, মঞ্জুষা পাতিল (খেয়াল), কুশল দাস (সেতার), আমান ও আয়ান আলী বাঙ্গাশ (সরোদ), গণেশ রাজাগোপালান (কর্ণাটকি বেহালা), অশ্বিনী ভিদ দেশপাণ্ডে (খেয়াল), দেবাশীষ ভট্টাচার্য (স্লাইড গিটার) প্রমুখ। গত দুই উত্সবে অংশ নেয়া ওস্তাদ শাহিদ পারভেজ (সেতার), বিদুষী গিরিজা দেবী (খেয়াল ও ঠুমরি), পণ্ডিত শিবকুমার শর্মা (সন্তুর), পণ্ডিত হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়া (বাঁশি), পণ্ডিত রাজন ও সাজন মিশ্র (খেয়াল), পণ্ডিত তেজেন্দ্র নারায়ণ মজুমদার (সরোদ), পণ্ডিত উলহাস কাশালকর (খেয়াল), বিদুষী অরুণা সাইরাম, বিশাল কৃষ্ণ (কত্থক), কৌশিকী চক্রবর্তী (খেয়াল)।
মূল অনুষ্ঠানে সঙ্গীত পরিবেশন করবেন বাংলাদেশের ২৬ জন শিল্পী। তাঁদের সঙ্গে সঙ্গত করবেন আরো ১৯ জন।
আন্তর্জাতিক এই সঙ্গীতাসরে বাংলা গানের সুদীর্ঘ ঐতিহ্য ও বাংলাদেশের শিল্পীদের দক্ষতার নমুনা তুলে ধরতে এ বছর উত্সবের প্রথম ও শেষদিনের অধিবেশন শুরু ৪০ জন বাংলাদেশি শিল্পীর সম্মিলিত কণ্ঠে বাংলা গানের পরিবেশনার মাধ্যমে।
অনুষ্ঠান শুরু হবে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায়। চলবে একটানা ভোর পাঁচটা পর্যন্ত।
রুচিরা কেদার শাস্ত্রীয় সঙ্গীত পরিবেশন করবেন। রুচিরা কেদার গোয়ালিয়র-জয়পুর ঘরানার একজন শীর্ষস্থানীয় তরুণ কণ্ঠশিল্পী। পিতা দীলিপ কালের কাছে বুনিয়াদি শিক্ষার পর ড. অলকা দেও মারুলকারের কাছে কণ্ঠসংগীতের সুক্ষ্ম দিকগুলোর তালিম নেন রুচিরা। এরপর কলকাতার আইটিসি সঙ্গীত রিসার্চ অ্যাকাডেমির আবাসিক বৃত্তি পেয়ে তিনি পণ্ডিত উলহাস কাশালকারের কাছে অমূল্য প্রশিক্ষণ লাভের সুযোগ পান। রুচিরা কেদার বিদুষী গিরিজা দেবীর কাছে ঠুমরি, দাদরা, হোরি, কাজরির তালিম নেন। রুচিরা পুনে বিশ্ববিদ্যালয়ের ললিত কলা কেন্দ্রে ছাত্রদের পরামর্শ দেন।
পরেই সেতার শোনাবেন শহীদ পারভেজ খান। ভারতের মুম্বাইয়ে ১৯৫৫ সালে প্রখ্যাত ইতাওয়াহ ঘরানার সপ্তম প্রজন্ম হিসেবে জন্ম গ্রহণ করেন ওস্তাদ শাহিদ পারভেজ খান। পিতা এবং গুরু ওস্তাদ আজিজ খান ছিলেন প্রখ্যাত সঙ্গীতকার ও সুরস্রষ্টা, তার কাছেই সংগীতের তালিম শুরু শাহিদ পারভেজ খানের। চাচা ওস্তাদ হাফিজ খানের কাছে কণ্ঠসঙ্গীত এবং দিল্লি ঘরানার ওস্তাদ মুন্নু খানের কাছ থেকে তবলায় তালিম নেন ওস্তাদ শাহিদ পারভেজ খান। ভারত ও ভারতের বাইরে সব উল্লেখযোগ্য সংগীত উত্সবেই বাজিয়েছেন তিনি। ওস্তাদ শাহিদ পারভেজ খান সংগীত নাটক অ্যাকাডেমি পুরস্কার, পদ্মশ্রী এবং এমএল কোসেরসহ অসংখ্য পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।
সবশেষে কণ্ঠ এবং স্লাইড গিটার যুগলবন্দী নিয়ে হাজির হবেন পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তী এবং দেবাশিষ ভট্টাচার্য। পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর জন্ম ১৯৫৩ সালের ৭ জানুয়ারি কলকাতায়। শৈশব থেকেই তিনি সঙ্গীতে তাঁর বিরল প্রতিভার প্রকাশ ঘটান। তিনি সঙ্গীতে প্রাথমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন তাঁর পিতা অজিত চক্রবর্তীর কাছ থেকে, যিনি তাকে উত্তর ভারতীয় সঙ্গীতের দীক্ষা দেন। এরপর অজয় চক্রবর্তী তালিম নেন কানাই দাস বৈরাগীর কাছে। পণ্ডিত জ্ঞান প্রকাশ ঘোষের কাছে তালিম নিয়ে সঙ্গীতে তাঁর দক্ষতা আরো পরিণত হয়ে ওঠে। আইটিসি-এসআরএ’র শুরু থেকেই তিনি এর সঙ্গে ছিলেন এবং ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠানটির প্রথম স্কলার হিসেবে তিনি সনদ লাভ করেন। এরপর প্রতিষ্ঠানটির সর্বকনিষ্ঠ গুরু হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। সেই পদে এখনো বহাল রয়েছেন এবং এরই সঙ্গে এখন বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্যও তিনি। পণ্ডিত অজয় চক্রবর্তীর পুরস্কার ও অর্জনের তালিকা দীর্ঘ। আইটিসি-এসআরএ থেকে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত প্রথম ছাত্র তিনি। ২০০০ সালে পেয়েছেন সঙ্গীত নাটক একাডেমি পুরস্কার, ২০১১ সালে ভূষিত হয়েছেন পদ্মশ্রী পুরস্কারে এবং তিনিই প্রথম, যিনি ৪৫ বছর বয়স পূর্ণ হওয়ার আগেই পেয়েছেন কুমার গন্দর্ভ অ্যাওয়ার্ড ফর দ্য বেস্ট মিউজিশিয়ান অব ইন্ডিয়া।