পথচারীদের ফুটপাতে অবাধে হাঁটিতে দিন

আধুনিক সড়ক ব্যবস্থাপনায় বিশ্বব্যাপী পথচারীরাই অধিক গুরুত্ব পাইয়া থাকেন। কিন্তু আমাদের চিত্র ভিন্ন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথিপত্রে যাহাই লেখা থাকুক, বাস্তবে পথচারীরাই যে সর্বাপেক্ষা উপেক্ষিত হইয়া আসিতেছেন তাহাতে তিলমাত্র সন্দেহ নাই। যত দিন যাইতেছে রাজধানী ঢাকাসহ আমাদের মহানগরগুলি ফুলিয়া-ফাঁপিয়া উঠিতেছে। ব্যাপক হারে বাড়িতেছে জনসংখ্যা। সেই সাথে ক্রমবর্ধমান যানবাহনের তীব্র চাপে ক্রমেই স্থবির হইয়া পড়িতেছে জনজীবন। যানবাহনের এই স্থবিরতা কাটাইতে সরকার যথাসাধ্য চেষ্টাও চালাইতেছে। নির্মিত হইতেছে নূতন নূতন ফ্লাইওভার, সংযোগ সড়ক ও সেতু। মেট্রোরেলের কাজও শুরু হইয়া গিয়াছে। চলিতেছে আরও নানা রকম উদ্যোগ আয়োজন। কিন্তু পথচারীদের দিকে নীতিনির্ধারকদের নজর নাই বলিলেই চলে। কথাটি অপ্রিয় হইলেও ইহার সত্যতা অস্বীকার করিবার উপায় নাই।
২০১০ সালে জাপানের আন্তর্জাতিক সহায়তা সংস্থা জাইকার এক সমীক্ষায় দেখা গিয়াছিল যে, ঢাকায় প্রতিদিন দুই কোটিরও বেশি যাতায়াত হইয়া থাকে। তন্মধ্যে ২০ শতাংশই হয় হাঁটিয়া। কিন্তু খোদ রাজধানীতেই ৪৪ শতাংশ সড়কে ফুটপাতই নাই। অন্যদিকে বিদ্যমান ফুটপাতের ৮২ শতাংশের অবস্থাই খুব করুণ। অধিকাংশ ফুটপাতই চাহিদার তুলনায় আয়তনে ছোট; তদুপরি, তাহাও চলিয়া গিয়াছে হকার, ব্যবসায়ী, ভ্যানগাড়ি ও ভিক্ষুকের দখলে। বিড়ম্বনার এখানেই শেষ নহে। কোথাও-বা বিপজ্জনকভাবে হাঁ করিয়া আছে ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল, উন্মুক্ত নর্দমা কিংবা ইট-কাঠ-লোহালক্কড়ের মতো নানাবিধ নির্মাণসামগ্রী। তাহার মধ্যেও পথচারীদের কলিজা কাঁপাইয়া বিকট শব্দে হর্ন বাজাইয়া ফুটপাত দাপাইয়া বেড়াইতেছে অগণিত মোটরসাইকেল। এইসব লইয়া বিস্তর লেখালেখি হইতেছে। উচ্চ আদালত একের পর এক নির্দেশ প্রদান করিতেছেন। কিন্তু অবস্থার উন্নতির কোনো আলামত দেখা যাইতেছে না। বরং বিশৃঙ্খলা যেন দিন দিন বাড়িয়াই চলিয়াছে। সেইসাথে বাড়িতেছে পথচারীদের নিরাপত্তার ঝুঁকি।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এই বিশৃঙ্খলা রোধে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করিয়াছেন বটে, কিন্তু কোনো উদ্যোগই খুব একটা ফলপ্রসূ হয় নাই। সর্বশেষ রাস্তা পারাপারে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার যে-উদ্যোগটি নেওয়া হইয়াছে—তাহার সফলতা লইয়াও প্রশ্ন উঠিয়াছে। সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হইল, পথচারীদের নিরাপদে ও স্বচ্ছন্দে সুশৃঙ্খলভাবে রাস্তা পারাপারের ব্যবস্থা কি রাজধানীর সর্বত্র আছে? যেখানে ফুটওভারব্রিজ বা আন্ডারপাস নাই সেখানে পথচারীরা কিভাবে রাস্তা পারাপার করিবেন? জেব্রা ক্রসিং কি দৃশ্যমান? সেখানে কি আদৌ যানবাহন থামে? সিগন্যালের পথচারী পারাপারের সেই সবুজ সংকেত বাতিটি কি জ্বলে? যদি জ্বলেও কেহ কি নিয়ম অনুযায়ী তাহা গ্রাহ্য করেন? বলা বাহুল্য যে, এই ধরনের অবকাঠামোগত অত্যাবশ্যক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত না করিয়া যত কঠোর পদক্ষেপই নেওয়া হউক না কেন—তাহা কোনো সুফল বহিয়া আনিতে পারে না।
ক্রমবর্ধমান যানজটের বিশ্বজনীন বাস্তবতাকে বিবেচনায় রাখিয়া সড়ক ব্যবস্থাপনার প্রতিটি ক্ষেত্রে পথচারীদের সুবিধা-অসুবিধাকেই সবার উপরে স্থান দিতে হইবে। বিশেষ করিয়া পথচারীরা যেন ফুটপাতের উপর দিয়া অবাধে হাঁটিতে পারে— তাহা নিশ্চিত করিতে হইবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে। ফুটপাত অবশ্যই প্রশস্ত, পরিচ্ছন্ন ও ঝুঁকিমুক্ত করিতে হইবে। ইহা বোধগম্য যে, বেদখল হইয়া যাওয়া ফুটপাতগুলি রাতারাতি পুরাপুরি দখলমুক্ত করা কঠিন। তবে রাজধানী কিংবা অন্য মহানগরসমূহের সর্বত্র অনির্দিষ্ট কাল অবধি এই বিশৃঙ্খলাও চলিতে দেওয়া যায় না। আমরা আশা করি, দীর্ঘমেয়াদী ও বাস্তবসম্মত একটি পরিকল্পনার অধীনে সড়ক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার অতি জরুরি কাজটি অনতিবিলম্বে শুরু করা হইবে।