সার্ক শীর্ষ নেতারা এ অঞ্চলে যোগাযোগ বৃদ্ধিতে আন্তদেশীয় রেল ও মটরযান চলাচল চুক্তি তিন মাসের মধ্যে চূড়ান্ত করতে নির্দেশ দিয়েছেন বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। তিনি বলেন, সদ্য সমাপ্ত সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে রেল ও মোটরযান চলাচল চুক্তি দুটি হওয়ার এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। সার্কের দেশগুলোর মধ্যে সমন্বয় খুব একটা সোজা বিষয় নয়। ইউরোপীয় দেশের বহু দিন লেগেছে এ সমন্বয় ঘটাতে। শনিবার ১৮তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন বিষয়ে এক সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে সংবাদ সম্মেলনে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হকসহ মন্ত্রণালয়ের অন্য কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সার্ক সম্মেলন সফল হয়েছে উল্লেখ করে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের জীবনমান উন্নয়নসহ এ অঞ্চলে শান্তি, সমৃদ্ধি ও স্থিতিশীলতা গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৮৫ সালে ঢাকা থেকে সার্কের যাত্রা শুরু হয়। আগামী বছর সার্ক প্রতিষ্ঠার তিন দশক পূর্ণ হতে যাচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে এবারের সার্ক শীর্ষ সম্মেলন ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন কারণে চড়াই-উত্রাই পার হয়ে সার্ক বর্তমান অবস্থায় পৌঁছেছে। সামনে এগিয়ে যাওয়ার যাত্রা চলছে। আমরা মনে করি যে, চুক্তিগুলো হলে সার্ক অনেক এগিয়ে যাবে।
তিনি আরো বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার সমুদ্রতীরবর্তী দেশগুলোর উন্নয়ন এবং পরিবেশের ক্ষেত্রে সামুদ্রিক সম্পদের ভূমিকা অপরিহার্য। খাদ্য নিরাপত্তা, বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধে সমুদ্র সম্পদের রয়েছে ব্যাপক ভূমিকা। সার্ক নেতৃবৃন্দ দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রস্তাবিত ব্লু ইকোনমির সম্ভাব্য গুরুত্ব অনুধাবন করে এ ক্ষেত্রে যৌথ উদ্যোগ এবং অংশিদারত্বের প্রয়োজনীয়তাকে সম্মেলনের ঘোষণায় অন্তর্ভুক্ত করেন।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সাফটার অধীনে বাণিজ্য সম্প্র্রসারণে বিভিন্ন অশুল্ক বাধা দূরীকরণে বাংলাদেশের প্রস্তাব সম্মেলনে গৃহীত হয়। এ প্রস্তাবে রয়েছে পণ্যের মান সুষমকরণ, কাস্টমস-সংক্রান্ত নিয়ম-কানুন সহজীকরণ, পণ্য পরিবহন প্রক্রিয়া সহজভাবে সম্পন্নকরণ। এ ছাড়া, সার্ক ট্রেড ইন সাভির্সেস দ্রুত কার্যকরে সদস্য দেশগুলোর সুনির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতির আহ্বান জানানো হয়। বাংলাদেশ এরই মধ্যে কিছু সুনির্দিষ্ট ক্ষেত্রে সহযোগিতার লক্ষ্যে তার প্রস্তাব পেশ করেছে।
মাহমুদ আলী বলেন, এবারের বৈঠকে শীর্ষ নেতৃবৃন্দ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো প্রতি দুবছর অন্তর সার্ক শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠান, সার্ক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের সভা প্রতিবছর এবং সার্ক পররাষ্ট্র সচিবদের সভা বছরে অন্তত একবার করে অনুষ্ঠান, সার্ক মহাপরিচালক বা যুগ্ম সচিবদের নিয়ে গঠিত প্রোগ্রাম কমিটিকে চার্টার বডিতে উন্নীত করা, সার্কের যেকোনো সভা আয়োজনের জন্য কোরাম সংখ্যা ৫ থেকে ৬-এ উন্নীতকরণসহ বেশ কিছু।
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের মাটিতে ভারতের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রম আমরা করতে দেব না। এটি বাংলাদেশ প্রমাণ করেছে। তেমনি আমরাও চাই ভারতেও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে যেন কোনো সন্ত্রাসী কার্যক্রম সংগঠিত না হয়। দুই দেশের পারস্পরিক নিরাপত্তা বিষয়ক যে সহযোগিতা তার মূল লক্ষ্য— সন্ত্রাস বিরোধী। বাংলাদেশের ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতার ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করেন। সন্ত্রাসবাদ নির্মূলে একযোগে কাজ করার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। তিস্তার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর এবং স্থল সীমানা চুক্তি অনুসমর্থন বিষয়ের অগ্রগতির বিষয়ে জানতে চাইলে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী বিষয় দুটি তাদের সক্রিয় বিবেচনাধীন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন। এ সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী বিষয় দুটি নিষ্পন্ন করার আশাবাদ ব্যক্ত করেন ।
তিনি বলেন, এ ছাড়া নেপালের প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠককালে দুই প্রধানমন্ত্রী দুই দেশের মধ্যে আন্তযোগাযোগ বৃদ্ধি, ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার এবং সার্ক দেশগুলোর স্ব-স্ব প্রাকৃতিক সম্পদের যৌথ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ অঞ্চলের সমষ্টিগত সমৃদ্ধির ব্যাপারে প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নেপালের জলবিদ্যুত্ আমদানির বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
সার্ক বিদ্যুত্ সহযোগিতা বিষয়ক চুক্তির নাটকীয়তা নিয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, স্বাগতিক দেশের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। যদি সম্মেলনে কিছুই না হতো, তবে তা নেপালের জন্য দুঃখজনক বিষয় হতো। ফলে নেপাল প্রথম থেকেই বিষয়টি নিয়ে খুবই সচেষ্ট ছিল। আর বাকি সদস্য রাষ্ট্র, যারা এর পক্ষে ছিল, তারা নেপালকে সমর্থন করেছি। আর চুক্তিগুলোর মধ্যে এটিই ছিল সবচেয়ে সহজ চুক্তি। ফলে চুক্তিটি স্বাক্ষর নিয়ে বাংলাদেশ আশাবাদী ছিল।
নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর নিয়ে প্রশ্ন করা হলে এ এইচ মাহমুদ আলী বলেন, কোনো দিনক্ষণ এখনো ঠিক হয়নি। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশ সফরের বিষয়ে তার আগ্রহের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি আশা করছেন— স্থল সীমান্ত ও তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তি অচিরেই হয়ে যাবে। চুক্তিটি হলেই তিনি বাংলাদেশে আসতে পারবেন। তবে ভারতের রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে ডিসেম্বরের ১৮ থেকে ২১ তারিখ পর্যন্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ভারত সফর করবেন।
মমতা ব্যানার্জির সম্ভাব্য বাংলাদেশ সফর নিয়ে প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি বাংলাদেশে আসতে পারেন, তিনি আগ্রহী। কয়েক দিন আগে বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধিদল মমতা ব্যানার্জির সঙ্গে ভারতে সাক্ষাত্ করলে তিনি বাংলাদেশ সফরের আগ্রহের কথা জানান।
রওশন এরশাদের কাছে নির্বাচন নিয়ে নিশা দেশাইয়ের প্রশ্ন কূটনৈতিক শিষ্টাচারের বাইরে কি না— এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমার মনে হয় আলোচনা যখন হয়, তখন তো প্রশ্ন করতেই পারেন। এটাতে আমি কোনো অসুবিধা দেখি না।