‘যৌন হয়রানি বন্ধে নিপীড়কদের পোস্টার ছাপাতে হবে’

 
 
 
 
‘যৌন হয়রানির ঘটনাগুলো দেশের গণমাধ্যমে অল্প কিছু দিনেই ধামাচাপা পড়ে যায়, কিন্তু দুর্নীতি ও ঋণখেলাপির মতো ঘটনাগুলো ফলোআপ হয়, পোস্টারিং হয়। এতে যৌন হয়রানির সাথে জড়িত অপরাধীরা বছর দুয়েক ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকে। পরে আবার নতুন করে শুরু করে। এই অবস্থায় আমাদের যৌন নিপীড়কদের পোস্টার ছাপিয়ে দিতে হবে, যেখানে ঋণখেলাপির টাইটেলের জায়গায় যৌন নিপীড়ক লেখা যেতে পারে।’ মঙ্গলবার দুপুরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) আরসি মজুমদার অডিটোরিয়ামে ‘উত্ত্যক্তকরণ, যৌন নিপীড়ন ও সকল প্রকার সহিংসতা মুক্ত শিক্ষাঙ্গন চাই’ শীর্ষক ছাত্র-শিক্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে ঢাবির প্রো-ভিসি (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সহিদ আকতার হুসাইন এ সব কথা বলেন। ঢাবির উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্ট্যাডিজ বিভাগ এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের যৌথ উদ্যোগে এ মতবিনিময় সভার আয়োজন করা হয়।
সহিদ আকতার হুসাইন বলেন, ‘যে দেশে সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়, সে দেশে আইন ও নীতিমালা দিয়ে কিছুই হবে না। তাই যৌন হয়রানির বিষয়টি নিয়ে ভুক্তভোগীদের মুখ খুলতে হবে। নীরবে সহ্য করার মতো ঘটনা ৫০ বছর আগে শেষ হয়ে গেছে। পাশাপাশি প্রত্যেকের শৃঙ্খলাবোধ জাগ্রত করার সাথে-সাথে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।’
ড. সহিদ বলেন, ‘বর্তমানে দেশে যৌন নিপীড়ন ও হয়রানির ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে গেছে। ঘরে-বাইরে, কর্মস্থলে-শিক্ষাঙ্গনে কোথাও নিরাপদ নয় নারীরা। যে দেশে সমাপনী পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস হয়ে যায়, সে দেশে আইন ও নীতিমালা দিয়ে যৌন নিপীড়ন ও হয়রানি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তাই এ ঘটনায় ভুক্তভোগীদের মুখ খুলতে হবে। পাশাপাশি বিষয়টি নিয়ে জনসচেতনতা তৈরি করে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। তাহলে দেশের আইন শক্তিশালী হবে, যৌন হয়রানিও বন্ধ হবে।’
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানমের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন ঢাবির কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান। আলোচক ছিলেন— ঢাবির উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্ট্যাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হেলাল হোসেন ঢালী এবং বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট দীপ্তি রানী সিকদার। স্বাগত বক্তব্য দেন ঢাবির উইমেন অ্যান্ড জেন্ডার স্ট্যাডিজ বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. তানিয়া হক।
অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান বলেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো এত বড় ক্যাম্পাসেও দু-একটা  যৌন হয়রানির ঘটনা ঘটে। তবে যেগুলো জানাজানি হয়, সেগুলোর বিচার হয়। তাই আগামীতে এ ধরনের ঘটনা ঘটলে ভুক্তভোগীরা প্রকাশ করবে বলে আশা করি।’
স্বাগত বক্তব্যে ড. তানিয়া হক বলেন, ‘নারীর প্রতি সহিংসতার বিষয়টি সারা বিশ্বে একটি আলোচিত বিষয়। ঘরে-বাইরে, কর্মস্থলে-শিক্ষাঙ্গনে বর্তমানে নারীরা কোথাও নিরাপদ নয়। প্রত্যেককে এ বিষয়ে সচেতন হতে হবে, নইলে নারীর প্রতি সহিংসতা প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়।’
হেলাল হোসেন ঢালী বলেন, ‘আমাদের দেশের নারীরা এভারেস্ট বিজয় করছে, ক্রিকেট খেলে পুরস্কার নিয়ে আসছে। কিন্তু একই সাথে নারীর প্রতি সহিংসতার মাত্রাটাও বেড়ে গেছে। দেশের আইন যদি শক্তিশালী হয় এবং নারীর প্রতি সহিংসতার সময় ফিডব্যাক (প্রতিরোধ করা) দিলে এই সহিংসতার মাত্রা কমে আসবে।’
অ্যাডভোকেট দীপ্তি রানী সিকদার বলেন, ‘নৈতিকতার অভাব, ছেলে-মেয়েদের প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি, দারিদ্র্য, প্রচলিত আইনের সীমাবদ্ধতা প্রভৃতি কারণে প্রতিনিয়ত দেশের নারীরা যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। এতে ভুক্তভোগীরা প্রতিনিয়িতই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে, মানসিক চাপে থাকে। এমনকি অনেকে আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়। যৌন হয়রানি রোধে এ দেশে প্রচলিত আইন নেই। যদিও ২০০৯ সালে সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এ নিয়ে একটি যুগান্তকারী রায় প্রদান করেন। কিন্তু পরবর্তীতে সে নির্দেশনা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। ফলে নারীদের এখনো সহিংস মনোভাবের শিকার হতে হচ্ছে। দেশের রাস্তা-ঘাটে প্রতিনিয়তই নারীরা নানাভাবে যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। এদের অধিকাংশই লজ্জার কারণে কোনো প্রতিবাদ করে না। বিষয়টি নিয়ে জনসচেতনতা তৈরি করতে হবে।’
ঢাবির ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের চর্তুথ বর্ষের ছাত্রী আসমা-উল-হুসনা বলেন, ‘ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের অবাধ আনাগোনার ফলে তারা সহজে মেয়েদের টিজ করে, যৌন হয়রানিমূলক নানা অঙ্গভঙ্গি করে।’
একই বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র নুরুন্নবী বলেন, ‘ক্যাম্পাসের বিভিন্ন স্থানে দেয়ালে কটূক্তি ও উত্ত্যক্তকরণ লেখা ও চিকা দেখা যায়, যা যৌন হয়রানিকে আরো উত্সাহী করে।’