প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের ২০১৪ সালের ‘হিয়ার আওয়ার ভয়েজেস’ (আমার কথা শুনুন) শীর্ষক গবেষণায় দেখা যায়, বিয়ে আর সন্তান জন্মদানের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের বেশিরভাগ কিশোরীর কোন মতামত নেয়া হয় না। বাংলাদেশে কৈশোরে বিয়ে হওয়া মেয়েদের মধ্যে ৬১ শতাংশের মত নেয়া হয় না। মা-বাবাই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। তারা মেয়েদের পছন্দ-অপছন্দের ধার ধারেন না। বেশিরভাগ অভিভাবকের ধারণা, মেয়েরা বিয়ের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম নয়, যেসব মেয়ের এভাবে বিয়ে হয় অধিকাংশ ক্ষেত্রে তাদের মায়েরাও অল্প বয়সে নিজের অমতে বিয়ে করতে বাধ্য হয়েছিলেন।
এশিয়া, আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকার ১১টি দেশের ৭ হাজারেরও বেশি কিশোর-কিশোরীর মতামত নেয়া হয়। বাংলাদেশে বরগুনা জেলার বরগুনা সদর ও নীলফামারীর জলঢাকা ও ডোমার উপজেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। মেয়ের বিয়ের ব্যাপারে বাবারাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত দেন। কেননা অনেক বাবাই মনে করেন, মেয়ে এবং তার মা সিদ্ধান্ত নেয়ার উপযুক্ত নন।
গবেষণায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে, একটি এলাকার ৬৫ শতাংশ কিশোরী বলেছে, বিয়ের পর গর্ভধারণের ক্ষেত্রে তারা কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। এ জন্য অল্প বয়সে তাদের সন্তান জন্ম দিতে হয়। বাংলাদেশের ২৬ শতাংশ মেয়ে মনে করেন সমাজে তাদের কোন মূল্য নেই, আর ৫৯ শতাংশ মনে করেন খুব কম মূল্য রয়েছে। মেয়েদের বাল্যবিয়ের কারণ চিহ্নিত করতে গিয়ে বলা হয়েছে, ৪২ শতাংশ মেয়ে বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। কারণ তারা বিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে ছেলে বা পুরুষদের ভীতি প্রদর্শন, মৌখিক ও শারীরিক নিগ্রহের শিকার হন। মোবাইলে জোর করে মেয়েদের ছবি তুলে তা ইন্টারনেটে দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে। যানবাহনের যাত্রী বা বাসের কর্মীদের দ্বারাও নিগৃহীত হন তারা।
নীলফামারীর ল্যাম্প হাসপাতালের প্রোগ্রাম ম্যানেজার মোহাম্মদ বোরহান মৃধা বলেন, নীলফামারীর জলঢাকা ও ডোমার এলাকার মা ও শিশু স্বাস্থ্য ওয়াচ প্রকল্পের আওতায় বিবাহিত কিশোরীদের সচেতন করা হচ্ছে। যাতে কিশোরী মা ও নবজাতকের মৃত্যুহার কমে আসে। কিশোরীদের পরামর্শ দেয়া হয় যাতে তারা বিয়ের দুই বছর পর সন্তান নেয়। যেসব কিশোরী মা গর্ভধারণ করেছেন তাদের পরামর্শ দেয়া হয়, তারা যাতে কমপক্ষে চারটি এএনসি (এনটি নেন্টাল কেয়ার) চেকআপ নেন। নিয়মিত আয়রন ট্যাবলেট সেবন করেন। মাতৃশিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্র কিংবা হাসপাতালে ডেলিভারি করান।
বাল্যবিয়ের কারণে কিশোরীরা গর্ভবতী হচ্ছে। এর ফলে কিশোরী মা ও শিশু উভয়েই নানা জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে বারডেম ইব্রাহীম জেনারেল হাসপাতালের গাইনী ও অবস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ছামছাদ জাহান বলেন, বাল্যবিয়ের কারণে শরীর পরিণত হওয়ার আগেই গর্ভ ধারণ করে। এর ফলে তার শরীরে ক্যালসিয়ামের অভাব দেখা দেয়। গর্ভাবস্থায় অ্যাকলেমসিয়া বা খিঁচুনি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এতে মা ও শিশু দু’জনেরই মৃত্যু ঝুঁকি বাড়ে। সন্তান প্রসবের সময় কিশোরীর দৈহিক পূর্ণতা না হওয়ায় অপারেশনের প্রয়োজন হয়ে পড়ে এবং অন্যান্য জটিলতা দেখা দেয়। মলার প্রেগনেনসি, কোরিওক্সিনমা হওয়ার আশংকা থাকে। রক্ষক্ষরণ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি দেখা দেয়। কম ওজনের শিশু জন্ম নিতে পারে। সন্তান জন্মের পর কোমর ব্যথা, হাত-পা ব্যথা, শরীর দুর্বল ইত্যাদি লক্ষণ দেখা দেয়। সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ালে মা পুষ্টিজনিত ক্ষয় রোগে ভোগেন। পরবর্তীতে একটু আঘাত পেলেই মায়ের হার ভেঙে যাওয়ার আশংকা থাকে।
বাল্যবিয়ে ও কিশোরীর মা হওয়ার প্রতিরোধে সরকার কী ধরনের পদক্ষেপ নিয়েছে এ প্রসঙ্গে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন-২০০০ রয়েছে। এই আইনে কিছু ফাঁকফোকর রয়েছে। এই ত্রুটিগুলো ধরেই নতুন আইন করা হচ্ছে। যাতে বাল্যবিয়ে বন্ধ হয়। সে সঙ্গে জন্মনিবন্ধনও বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। বাল্যবিয়ে বন্ধে মেয়েদের শিক্ষার প্রতি জোর দেয়া হয়েছে। তাদের স্কুলে যেতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। সংসারের অভাব-অনটনের কারণে যারা ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রয়েছে তাদের ঝুঁকিমুক্ত কাজের প্রশিক্ষণ দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। আর যেন তাদের শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত করতে না হয়, সে জন্য মাকে টাকা দেয়া হয়।
তিনি আরো বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় কিশোর-কিশোরী ক্লাব গঠন করে এর মাধ্যমে বাল্যবিয়ে, কিশোরী বয়সে মা হওয়ায় কী ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা দিতে পারে ইত্যাদি বিষয়ে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে জনসচেতনতা বাড়ানো হচ্ছে, যাতে তাদের অভিভাবকরা বাল্যবিয়ে না দেন। তারাও বাল্যবিয়ের শিকার না হয়।
এরপরও দেখা যায়, অনেক কিশোরী বিয়ের আগেই মা হয়ে যায়। পর্দার অন্তরালে ঘটনাগুলো চাপা পড়ে থাকে। কিশোরীর মা হওয়া বন্ধে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। ভবিষ্যতেও নিবে। কিন্তু এ কাজ করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়, যদি পরিবার থেকে অভিভাবকরা সচেতন না হন। অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। গোটা সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। খবর বাসস।