ভাসমান জনগোষ্ঠীর রোগ সনাক্ত করাই যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ

শহরের বস্তিবাসী ও ভাসমান জনগোষ্ঠীর রোগ সনাক্তকরণে প্রতিবন্ধকতাই দেশে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে বড় চ্যালেঞ্জ। এ কারণে সরকারি ও দেশি-বিদেশি উন্নয়ন সংস্থাগুলো নিরবচ্ছিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করলেও এ ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জিত হচ্ছে না। যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে রোগীদের চিকিত্সা সেবায় গাফিলতি, স্বাস্থ্য আচরণবিধি মেনে চলতে জনগণকে উত্সাহিত না করা, আধুনিক চিকিত্সা উপকরণের অপ্রতুলতা, শিশু যক্ষ্মা সনাক্তকরণে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকা, যক্ষ্মা সনাক্তকরণের ক্ষেত্রে জটিলতা, চিকিত্সা সেবা সম্পর্কে প্রচার না হওয়া প্রভৃতি প্রতিবন্ধকতা হিসাবে চিহ্নিত করে এ থেকে উত্তরণে সম্মিলিত প্রয়াস প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন দেশের চিকিত্সক, উন্নয়নকর্মী ও সংবাদকর্মীরা।
গতকাল বৃহস্পতিবার মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টার ইন মিলনায়তনে জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি, ইত্তেফাক ও ব্র্যাক এর যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি: নগর ভিত্তিক কার্যক্রম’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় এসব কথা উঠে আসে। বক্তারা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সংস্থা ও গণমাধ্যমের সম্মিলিত প্রচেষ্টা যক্ষ্মা নির্মূলে কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তারা জানান, প্রতি বছর দেশে ৩ লাখের অধিক মানুষ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হন। যাদের মধ্যে ৭০ হাজারেরও বেশি মারা যান। যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে ‘ডিরেক্টলি অবজার্ভড ট্রিটমেন্ট শর্ট কোর্স (ডটস)’ সফলভাবে পরিচালিত হলেও বিশ্বে যক্ষ্মা ঝুঁকিপূর্ণ ২২ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৬ষ্ঠ।
দৈনিক ইত্তেফাকের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তাসমিমা হোসেনের সভাপতিত্বে এই গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক দীন মো. নুরুল হক। বিশেষ অতিথি ছিলেন জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির লাইন ডিরেক্টর ডা. মো. কামরুল ইসলাম, নাটাবের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট রাজনীতিবিদ মোজাফফর হোসেন পল্টু ও ব্র্যাকের পরিচালক ড. মো. আকরামুল ইসলাম। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাতীয় যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. আহমেদ হোসেন খান। স্বাগত বক্তব্য দেন ব্র্যাকের ‘এডভোকেসি ফর সোশ্যাল চেইঞ্জ’ কর্মসূচির সিনিয়র প্রোগ্রাম ম্যানেজার শাগুফতা সুলতানা ও দৈনিক ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত। আলোচনা সঞ্চালনা করেন ইত্তেফাকের প্রতিবেদক আসিফুর রহমান সাগর।
মূল প্রবন্ধে বলা হয়, দেশে দ্রুত নগরায়ন, দিনমজুর হিসেবে প্রতিদিন এক থেকে দেড় লাখ মানুষের ঢাকা আগমন, নগর দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি, বস্তিগুলোতে অস্বাস্থ্যকর ও নোংরা পরিবেশ, চিকিত্সার সুব্যবস্থা না থাকা এবং সর্বোপরি সচেতনতার অভাবে ঢাকাসহ বাংলাদেশের নগরগুলোতে যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণ এ সময়ে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ২০১৩ সালে আইসিডিডিআরবির এক গবেষণায়  দেখা গেছে, দেশে ভাসমান মানুষ ও  বস্তিবাসীর মধ্যে প্রতি লাখে ২৫৩ জন যক্ষ্মা রোগী। এ পরিসংখ্যান বিচার করলে বাংলাদেশের প্রায় ৫৩ লাখ বস্তিবাসীর মধ্যে ১৩ হাজার ৪০৯ জন কফবাহিত যক্ষ্মা রোগের জীবাণু বহন করছে। যা সত্যিকার অর্থে ভয়াবহ চিত্র। এছাড়া শহরের বস্তি অঞ্চলের শিশুরা বেশি যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়। শিশু যক্ষ্মা সনাক্ত ও প্রতিরোধ একটি চ্যালেঞ্জ।
আলোচনায় অংশ নিয়ে অধ্যাপক ডা. দীন মো. নুরুল হক বলেন, যক্ষ্মাসহ সরকারের সকল কর্মসূচি সফল করতে হলে প্রয়োজন সম্মিলিত প্রচেষ্টা, অঙ্গীকার, কমিউনিটি মবিলাইজেশন, বেসরকারি সংস্থা ও মিডিয়ার সহযোগিতা এবং সর্বোপরি গণসম্পৃক্ততা। এ রোগ নিয়ন্ত্রণে কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোর সঙ্গে বঙ্গবন্ধু মেডিক্যালসহ দেশের প্রধান চিকিত্সা সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে বলে তিনি মনে করেন।
সভাপতির বক্তব্যে তাসমিমা হোসেন বলেন, যক্ষ্মা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল জনসচেতনতা। এ ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা আরো জোরদার করার উপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, যারা এই বিষয়টি নিয়ে কাজ করেন তাদেরও প্রচারণার দিকে বেশি করে নজর দিতে হবে। তিনি নারী ইউপি সদস্যদের এ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে তৃণমূল পর্যায়ে সচেতনতা সৃষ্টির কাজে সম্পৃক্ত করার পরামর্শ দেন। পাশাপাশি মোবাইল কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে বিশেষ কোন ডিজিট ডায়াল করে যক্ষ্মা নির্ণয় কোথায় হয়, চিকিত্সা সেবা কোথায় পাওয়া যায় প্রভৃতি বিষয়ে পরামর্শ দেয়ার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান।
ড. মো. আকরামুল ইসলাম বলেন, নগরায়ন পরিকল্পিতভাবে হলে কেবল যক্ষ্মাই নয়, অন্যান্য রোগও কমে আসবে। তিনি ইংল্যান্ডের উদাহরণ দিয়ে বলেন, শুধু সরকার নয়, নিজের অফিস ও বাসার মানুষগুলোর মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে কাজ করতে হবে। পাশাপাশি সব প্রতিষ্ঠানের কর্মপরিবেশের দিকে নজর দিতে হবে।
মোজাফফর হোসেন পল্টু বলেন, চিকিত্সা ও প্রচারণার পাশাপাশি যক্ষ্মা রোগীদের কাউন্সিলিং করা দরকার। তিনি রাজনৈতিক কমিটমেন্ট ও সরকারের আরো বেশি নজরদারির প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।
ডা. মো. কামরুল ইসলাম বলেন, বিভিন্ন দেশে যক্ষ্মার ৯ মাসের চিকিত্সায় বাংলাদেশকে মডেল হিসেবে দেখা হচ্ছে। দেশে যক্ষ্মার চিকিত্সা সরকারিভাবে বিনামূল্যে দেয়া হয় বলে তিনি জানান।
অধ্যাপক ডা. শাকিল আহমেদ বলেন, নগর যক্ষ্মা নিয়ে আমাদের বেশি করে ভাবতে হবে। প্রতিদিন যেভাবে ঢাকা শহরে মানুষের ঢল নামে তাতে এটা আমাদের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জ।
টিবি কন্ট্রোল প্রোগ্রামের কনসালটেন্ট ডা. দীপক কুমার বিশ্বাস বলেন, যক্ষ্মার জীবাণু ছড়াতে দেয়া যাবে না। তাই যত দ্রুত সম্ভব রোগীকে চিকিত্সার আওতায় আনতে হবে।
বিসিসির এসএমসি প্রধান ডা. এজেডএম জাহিদুর রহমান বলেন, ‘নোঙ্গর ফেলি ঘাটে ঘাটে’ নামের একটি প্রোগ্রামের মাধ্যমে আমরা সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করছি। ‘হাঁচির সঙ্গে রুমাল ব্যবহার করতে হয়, মুখ ঢেকে কাশতে হয়’ এই বিষয়গুলো মানুষের মধ্যে পৌঁছে দিতে হবে।
ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত সাংবাদিকদের যক্ষ্মা বিষয়ে তথ্য দিয়ে সমৃদ্ধ করার সুপারিশ করে বলেন, তথ্য দিলে সাংবাদিকরা এ বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখতে পারবে। সেইসঙ্গে তিনি যক্ষ্মা কর্মসূচির সঙ্গে যারা জড়িত তাদের ইত্তেফাকের স্বাস্থ্য পাতায় লেখার আহ্বান জানান।
বিজিএমইএ-এর টিবি কর্মসূচি সংক্রান্ত কর্মসূচির সভাপতি মাসুদ কাদের মনা বলেন, এ বছর গার্মেন্ট শ্রমিকদের মধ্যে ৭৫৮ জন যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত হয়েছে। সে কারণে আমরা ১১টি ক্লিনিক স্থাপন করেছি। সেখানে তাদের বিনামূল্যে চিকিত্সা সেবা দেয়া হচ্ছে। এছাড়া ঢাকার মিরপুরে শ্রমিকদের জন্য একটি হাসপাতাল করা হচ্ছে। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
বিকেএমইএ-এর যুগ্ম-সচিব এম এ আসাদুল্লাহ বলেন, এ বছর ২০৮ জন যক্ষ্মা রোগী শনাক্ত করা হয়েছে এবং ২১ জনকে চিকিত্সা দেয়া হচ্ছে। আমরা মাত্র ৭ জন চিকিত্সক নিয়ে শ্রমিকদের চিকিত্সা দিয়ে আসছি। যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।
যেসব চিকিত্সক প্রাইভেট প্র্যাকটিস করেন, তাদের কাছে আসা যক্ষ্মা রোগীদের ‘ডটস’ সেন্টারে পাঠানোর আহ্বান জানান ব্র্যাকের হেলথ এন্ড পপুলেশন বিভাগের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. শায়লা ইসলাম।
ইত্তেফাকের নগর সম্পাদক আবুল খায়ের বলেন, কেন যক্ষ্মা হয় সেই বিষয়টি চিহ্নিত করে তা নিরাময়ে আমাদের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
মুক্ত আলোচনায় আরো অংশ নেন এনএসএইচডিপির টিবি কো-অর্ডিনেটর ডা. মোহাম্মদ হোসেন, সহযোগী অধ্যাপক ডা. আসিফ মুজতবা মাহমুদ, ডা. মির্জা নিজামউদ্দিন, ডা. ভিকারুন নেসা বেগম, ডা. মো. আব্দুর শাকুর খান, কনসালট্যান্ট ডা. লুত্ফর রহমান, ডা. সানাউল্লাহ বাশার, সাংবাদিক সাইদ শাহীন প্রমুখ।