প্রধানমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলন
আইনের ব্যত্যয় ঘটলে খালেদার সঙ্গে বৈঠককারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা। সরকার হটানোর হুমকির জবাবে, ‘শকুনের দোয়ায় গরু মরে না’
প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচন যাতে না হয় তার সব প্রচেষ্টাই চালিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধেরও বিরোধিতা করেছিল দেশটি। শুনেছি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তত্কালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রীর মৌখিক নির্দেশে কোনো ধরনের বোর্ড মিটিং ছাড়াই বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন বন্ধ করে দিয়েছিল। কিন্তু এ তিনটির কোনটিতে সফল হতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র। পাঁচ জানুয়ারি নির্বাচন হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন হওয়ার পাশাপাশি নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতুর কাজও এগিয়ে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির বিরোধিতার পরও মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ যদি স্বাধীন হতে পারে, তাহলে এখন কোনো একটি দেশকে পাশে না পেলেও বাংলাদেশের সমস্যা হবে না। সরকারের পায়ের নিচের মাটি যথেষ্ট শক্ত। একটি দেশ পাশে না থাকলে বাংলাদেশ শেষ হয়ে যাবে, এখন এটা ভাবা উচিত হবে না। কাউকে ছাড়া বাংলাদেশ চলতে পারবে না, এমন চিন্তা না থাকাই ভাল। কারণ বাংলাদেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র।
গতকাল শুক্রবার বিকালে গণভবনে এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। কাঠমান্ডুতে সম্প্রতি অনুষ্ঠিত দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) এর ১৮তম শীর্ষ সম্মেলনে যোগদান এবং পরে মালয়েশিয়া সফরের অর্জন ও সফলতা তুলে ধরতে এই সাংবাদিক সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। লিখিত বক্তব্যের পর প্রধানমন্ত্রী বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কোনো বিষয়ে মতবিরোধ হলেই একটি দেশের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক খারাপ হয়ে যায় না। বঙ্গবন্ধুর কূটনৈতিক নীতি ছিল, ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়।’ বর্তমান সরকার এই নীতি অব্যাহত রেখে জনগণের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে। জনগণের উন্নয়নের স্বার্থে যদি কারো সাথে সম্পর্ক গভীরতার প্রয়োজন হয় তা বর্তমান সরকার করবে।
গভীর রাতে চুপি চুপি দেখা কেন?
রাতের অভিসার বন্ধ করে দিনের আলোতে রাজনীতি করার জন্য বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের মানুষ শান্তিতে থাকলে উনি (খালেদা জিয়া) অশান্তিতে ভোগেন। বিএনপি নেত্রীকে জিজ্ঞাসা করি, গভীর রাতে চুপি চুপি করে দেখা কেন? উনি কথায় কথায় গণতান্ত্রিক সরকারকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার হুমকি-ধামকি দিচ্ছেন। উনি হুমকি-ধামকি দিয়ে যাক, আমরা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছি, এগিয়ে নিয়ে যাবই। কিছু সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে খালেদা জিয়ার বৈঠক প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেসব সরকারি কর্মকর্তা রাতের গভীরে ‘চুপি চুপি’ বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেছেন, তারা আইনের বরখেলাপ করলে অবশ্যই ব্যবস্থা নেয়া হবে, আইন তার আপন গতিতেই চলবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে, এতো রাতে বৈঠক কেন। ২০০৬ সালে উত্তরায় মাহমুদুর রহমানের অফিসে আমলাদের বৈঠকের কথাও এ সময় তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে, এতো রাতে বৈঠক কেন? বিএনপি নেত্রীর এই যে গভীর রাতে চুপি চুপি দেখা করা, এটা কেন?
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচনের গুরুত্ব তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ নির্বাচন না হলে বাংলাদেশের অবস্থা থাইল্যান্ডের মতো হত।
বিএনপির আমলে টিআইবি
একটি কথাও বলেনি
টিআইবি’র দুর্নীতির প্রতিবেদনের সমালোচনা করে শেখ হাসিনা বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের সময় যারা দুর্নীতি করে হাজার হাজার টাকা কামিয়েছে, বিদেশে অর্থপাচার করেছে তাদের বিরুদ্ধে টিআইবিকে একটি কথাও বলতে শুনিনি। এই যে অর্ফানেজ (জিয়া অর্ফানেজ ট্রাস্ট)’র টাকা মেরে খেল, টিআইবি একটু খুঁজে বের করুক না! আর তারা (টিআইবি) হঠাত্ হঠাত্ কেন এমন বলে। সাধারণত এদের রিপোর্ট সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে দেয়া হয়। ২০০১ সালে তারা উদ্দেশ্যমূলকভাবে রিপোর্ট দিয়েছিল জুনে, এবার দিল ডিসেম্বরে। কিন্তু তাদের রিপোর্ট তো সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে প্রকাশ করার কথা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমার সরকারই এতোগুলো বেসরকারি টেলিভিশনের লাইসেন্স দিয়েছে। অথচ টিভির মালিকরা এমন একজনকে তাদের সভাপতি করলো- যিনি (মোসাদ্দেক আলী ফালু) বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে হাজার হাজার কোটি টাকার মালিক হয়েছে।
দুর্নীতির বীজ বপন করেছে জিয়া
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সামরিক স্বৈরাচাররাই দেশে দুর্নীতির বীজ রোপণ করে গেছে। পঁচাত্তরের পর সামরিক স্বৈরাচাররা ক্ষমতা দখলের পর থেকেই দেশে দুর্নীতি বাসা বাঁধতে শুরু করে। আর দুর্নীতির বীজ রোপণ করে গেছেন জেনারেল জিয়াউর রহমান। তিনি বলেন, সরকার দুর্নীতি করলে বিশ্বমন্দা সত্ত্বেও প্রবৃদ্ধি ৬ ভাগের ওপরে রাখতে পারতাম না, দেশের এতো উন্নতি হতো না।
আমাদের পররাষ্ট্রনীতি অত্যন্ত স্পষ্ট
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মার্কিন সহকারী পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী নিশা দেশাই বিসওয়াল সম্পর্কে করা মন্তব্যের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনীতিক সম্পর্ক খারাপ হবে কি না একজন সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে যে সহকারী পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাংলাদেশে এসেছেন, তিনি বিরোধী দলীয় নেত্রী ও বিএনপি নেত্রীর সঙ্গে দেখা করেছেন। তাঁকে নিয়ে যদি কেউ কোনো মতামত দিয়ে থাকলে তাহলে সে দায়িত্ব তার। তাকে গিয়ে জিজ্ঞাসা করুন। তিনি বলেন, আমাদের পররাষ্ট্রনীতি অত্যন্ত স্বচ্ছ। এটা পূর্ব না পশ্চিম, উত্তর না দক্ষিণ, তা আমি বিবেচনায় নিতে চাই না।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুক্তরাষ্ট্রেও বাংলাদেশের বন্ধু রয়েছে। তাদের সহযোগিতা বাংলাদেশ সব সময় পেয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় যদি আমরা লড়াই করে টিকে থাকতে পারি তাহলে স্বাধীন দেশ হিসেবে এখনো পারব। দেশের প্রত্যেক নাগরিককে বলব, এটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশ। সে মর্যাদা নিয়ে চলতে হবে। কেউ পাশে থাকলে বাঁচব, না থাকলে মরে যাব, এটা ঠিক না।
প্রশ্নপত্র ফাঁস প্রসঙ্গে একজন সাংবাদিকের করা প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাঝে মাঝে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ আসে। আমরা তাত্ক্ষণিক ব্যবস্থা নেই, তদন্ত করে জড়িতদের কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করি। বেশ কিছু উদাহরণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি আমলে তো প্রশ্নপত্র ফাঁস করতে হতো না, দলীয় ক্যাডারদের হাতে পুরো প্রশ্নপত্রই সরবরাহ করা হতো।
কারো কথা বলার ওপর ট্যাক্স বসাইনি
এইচ টি ইমামের বিতর্কিত মন্তব্য প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকে অনেক কথা বলেন। তাতে দল ও সরকারের সমস্যা হয়। আমরা তো কারোর কথা বলার ওপর ট্যাক্স বসাইনি। যেকোনো ব্যক্তির কথা বলার স্বাধীনতা রয়েছে। উনি ঠিক কী বলেছেন, তা এইচ টি ইমামকেই প্রশ্ন করুন, উনিই ভাল উত্তর দিতে পারবেন।
বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার বক্তব্যের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নেত্রী আগে বলেছিলেন আমি নাকি কোনদিন প্রধানমন্ত্রী তো দূরের কথা, বিরোধী দলের নেতাও হতে পারবো না। কিন্তু তার কথা তার বেলায় সত্য হয়ে গেছে। এখন উনি বিরোধী দলের নেতাও নন।
সার্ক সম্মেলন ও মালয়েশিয়া সফর সফল
লিখিত বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ১৮তম সার্ক শীর্ষ সম্মেলন ও মালয়েশিয়া সফর অত্যন্ত সফল ও ফলপ্রসূ হয়েছে। সার্ক সম্মেলনে বিদ্যুত্ ও জ্বালানি সহায়তা বিষয়ক চুক্তি স্বাক্ষরের পাশাপাশি সাইবার ক্রাইম দমন করতে যৌথ উদ্যোগের অংশ হিসেবে ‘সার্ক সাইবার ক্রাইমস মনিটরিং ডেস্ক (এসসিসিএমডি)’ গঠনে বাংলাদেশের প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে। তিনি বলেন, মালয়েশিয়ার সারাওয়াক রাজ্যে ৬০ হাজার শ্রমিকের চাহিদা রয়েছে। ইতিমধ্যে ১২ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিককে ওই রাজ্যে নিয়োগের ক্ষেত্রে একটি প্রটোকল স্বাক্ষরের বিষয়ে মালয়েশিয়া সরকার সম্মতি জানিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ২৬ ও ২৭ নভেম্বর নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে ১৮তম সার্ক সম্মেলনে তিনি বাংলাদেশ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন। সেখান থেকে ফিরে তিনি মালয়েশিয়া প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে ২-৪ ডিসেম্বর মালয়েশিয়া সফর করেন। শেখ হাসিনা বলেন, সার্ক শীর্ষ সম্মেলনে তিনি দক্ষিণ এশিয়ার সাধারণ মানুষের জীবনমান উন্নয়নের লক্ষ্যে সকল শীর্ষ নেতাদের পারস্পরিক মতপার্থক্য ও ভেদাভেদ ভুলে রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
সাংবাদিক সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা লে. কর্নেল (অব.) ফারুক খান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।