সাংবাদিকরা আছেন বলেই অসঙ্গতির কথা জানা যায়

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর ‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার-২০১৪ বিতরণ এবং ‘বাংলাদেশে সাংবাদিকতার সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক আলোচনা সভায় বক্তারা বলেছেন, সাংবাদিকরা আছেন বলেই সমাজের অনেক অসঙ্গতির কথা আমরা জানতে পারি। গণতন্ত্রের পূর্ব শর্ত হচ্ছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা। গণমাধ্যমের সাথে গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের একটি নিবিড় সম্পর্কও রয়েছে। এটা গণতন্ত্র এবং উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি। সাংবাদিকদের অনেক বিষয়ে আমাদের দ্বিমত হতেই পারে। কিন্তু সেই মতকেও আমাদের সম্মান করতে হবে। যদি সমাজে ব্যক্তিগত সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে না পারি তাহলে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

গতকাল মঙ্গলবার সকালে ধানমন্ডির দৃক গ্যালারিতে ‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার ২০১৪ ঘোষণা ও পুরস্কার প্রদান ও ‘বাংলাদেশে সাংবাদিকতার সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক এ আলোচনা সভা হয়। ‘জাগ্রত বিবেক, দুর্জয় তারুণ্য, দুর্নীতি রুখবেই’ প্রতিপাদ্য নিয়ে গতকাল পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস’।টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা প্রফেসর ড. গওহর রিজভী। এতে সভাপতিত্ব করেন টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল। অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. সুমাইয়া খায়ের। ‘বাংলাদেশে সাংবাদিকতার সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপট’ শীর্ষক আলোচনায় অংশ নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের বার্তা প্রধান খালেদ মুহিউদ্দীন। অনুষ্ঠানে তিনজন তরুণ সাংবাদিক ৭১ টেলিভিশনের প্রতিবেদক নাদিয়া শারমিন, যমুনা টেলিভিশনের বিশেষ প্রতিবেদক আলমগীর স্বপন, বাংলা ভিশনের বার্তা সম্পাদক শারমিন রিন্ভী তাদের পেশাগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা করেন।
অনুষ্ঠানে এ বছরের ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর ‘অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা পুরস্কার-২০১৪ এ প্রিন্ট মিডিয়া জাতীয় বিভাগ ক্যাটাগরিতে বিজয়ী হয়েছেন দৈনিক প্রথম আলোর প্রতিবেদক অরূপ রায়। আঞ্চলিক বিভাগে বিজয়ী হয়েছেন খুলনার দৈনিক পূর্বাঞ্চল পত্রিকায় নিজস্ব প্রতিবেদক এইচ এম আলাউদ্দিন। ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া বিভাগে যমুনা টিভির ইনভেস্টিগেশন সেল এর নিজস্ব প্রতিবেদক সাজ্জাদ পারভেজ। এসএ টিভি তে থাকাকালীন তার প্রতিবেদনটি প্রচারিত হয়। এই প্রতিবেদনে ক্যামেরায় ছিলেন কামরুল হাসান সেলিম, আব্দুল আল মামুন ও সালাউদ্দিন তারেক। প্রতিবেদনের চিত্র ধারণে তাদের বিশেষ ভূমিকার জন্য টিআইবি তিন ক্যামেরা পারসনকেও বিশেষ সম্মাননা দেয়। বিজয়ী সাংবাদিকদের সম্মাননাপত্র, ক্রেস্ট ও আশি হাজার টাকার চেক এবং তিনজন ক্যামেরা পারসনের প্রতিজনকে বিশ হাজার টাকার সম্মানী দেয়া হয়।
প্রফেসর ড. গওহর রিজভী বলেন, তথ্য প্রকাশের অধিকারের ওপর বাধা দেয়া কোনভাবেই উচিত হবে না। একে আঘাত দেয়া আমাদের অধিকারের বাইরে। একে সব সময় সকলের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। অনেক বিষয়ে আমাদের দ্বিমত হতেই পারে। কিন্তু সেই মতকেও আমাদের সম্মান করতে হবে। উক্ত মতের বিরুদ্ধে আমরা চ্যালেঞ্জ করতে পারি তবে এক্ষেত্রে কোন ছাড় দেওয়া ঠিক হবে না।
সভাপতির বক্তব্যে অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল বলেন, ‘‘সাংবাদিকরা আছেন বলেই সমাজের অনেক অসঙ্গতির কথা আমরা জানতে পারি। গণমাধ্যমের সাথে গণতন্ত্র ও মতপ্রকাশের একটি নিবিড় সম্পর্কও রয়েছে। এটা গণতন্ত্র এবং উন্নয়নের জন্য অত্যন্ত জরুরি।” যদি সমাজে ব্যক্তিগত সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করতে না পারি তাহলে রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। জনগণ যেহেতু রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের একটি বিরাট উপাদান তাই জনগণের সার্বভৌমত্বের উপাদানগুলোকে নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকেই প্রধান ভূমিকা পালন করতে হবে।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, গণতন্ত্রের পূর্ব শর্ত হচ্ছে মত প্রকাশের স্বাধীনতা। এক্ষেত্রে আরো গুরুত্বপূর্ণ তিনটি বিষয় হল: গণমাধ্যমের বিকাশ, দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে নাগরিক সমাজের কাজের পরিবেশ তৈরি করা এবং তথ্য অধিকার আইন প্রয়োগের পরিধি বিস্তৃত করা। এ বিষয়গুলোকে নিশ্চিত করতে হলে সরকারের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক মনোভাব ও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
দুর্নীতিবিরোধী কার্টুন প্রতিযোগিতায় বিজয়ীদের পুরস্কার বিতরণ
টিআইবি’র আন্তর্জাতিক দুর্নীতিবিরোধী দিবস ২০১৪ উদ্যাপন উপলক্ষে ঢাকাসহ দেশের আরো ৪৫টি এলাকায় সনাক ও ইয়েস সদস্যদের সহযোগিতায় মানববন্ধন, শোভাযাত্রা, কার্টুন ও আলোকচিত্র প্রদর্শনী, আলোচনা অনুষ্ঠান, তথ্য মেলা, তরুণ সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, পথ নাটক, মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনী এবং দুর্নীতিবিরোধী শপথ গ্রহণসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। তারই অংশ হিসেবে গতকাল বিকেলে ধানমন্ডির দৃক গ্যালারীতে ‘দুর্নীতিবিরোধী কার্টুন প্রতিযোগিতা পুরস্কার ২০১৪’ ঘোষণা ও প্রদান এবং কার্টুন প্রদর্শনীর উদ্বোধন করা হয়। এতে সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইডেনের মাননীয় রাষ্ট্রদূত জোহান ফ্রিসেল এবং ডেনমার্কের মাননীয় রাষ্ট্রদূত মিসেস হ্যানে ফুগ্ল এসকেয়ার। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন টিআইবি ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।

অনুষ্ঠানে দুর্নীতিবিরোধী কার্টুন প্রতিযোগিতা ২০১৪ এর বিজয়ী ও বিশেষ মনোনয়নপ্রাপ্ত কার্টুনিস্টদের মাঝে পুরস্কার ও সনদ বিতরণ করা হয়। এবারের প্রতিযোগিতায় ‘ক’ বিভাগে (১৩-১৮ বছর) ১ম ও ২য় স্থান অধিকার করেছে যথাক্রমে এস এম আসিফ বিন গাফ্ফার এবং মাহামুদুল হাসান ইমন। ‘খ’ বিভাগে (১৯-৩৫ বছর) ১ম, ২য় ও ৩য় স্থান অধিকার করেছে যথাক্রমে মোঃ ফরিদুর রহমান রাজীব, আরাফাত করিম এবং মেহেদি হক। এছাড়া ২টি বিভাগ থেকে মোট ৩৫টি কার্টুনকে বিশেষ মনোনয়ন দেয়া হয়। উল্লেখ্য এ প্রতিযোগিতায় দুইটি বিভাগের বিজয়ী ও বিশেষভাবে মনোনীত সর্বমোট ৫৯টি কার্টুন নিয়ে এ প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়েছে। ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতিদিন দুপুর ৩.৩০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত সর্বসাধারণের জন্য এ প্রদর্শনী উন্মুক্ত থাকবে। টিআইবি’র ওয়েবসাইট (www.ti-bangladesh.org) ও ফেইসবুক www.face book .com/TIBangladesh এ কার্টুনগুলো দেখা যাবে।