ভারতের নোবেল শান্তি বিজয়ী ও শিশু অধিকার কর্মী কৈলাস সত্যার্থী বলেছেন, দরিদ্র শিশুদের জীবনমানের উন্নয়নে সহায়তা করাই তার প্রধান নেশা।
নরওয়ের রাজধানী অসলোতে তিনি পাকিস্তানের নারীশিক্ষা আন্দোলনের কর্মী মালালা ইউসুফজাইয়ের সঙ্গে বুধবার নোবেল শান্তি পুরস্কার নিতে যাচ্ছেন।
স্কুলে যাওয়ার পরিবর্তে এক শিশু জুতা পরিষ্কার করছে- ছোটবেলায় এ দৃশ্য দেখে পরবর্তীতে কৈলাস সত্যার্থী শিশুদের অধিকার নিয়ে কাজ করতে অনুপ্রাণিত হন।
মৃদুভাষী ৬০ বছর বয়সী কৈলাস দশকের পর দশক ধরে ভারতে শিশু শ্রমের বিরুদ্ধে প্রচরণা চালিয়ে আসছেন।
দাতব্য সংগঠন চাইল্ডলাইনের তথ্যানুযায়ী, বিশ্বের মধ্যে ভারতে সবচেয়ে বেশি কর্মজীবী শিশুর বাস।
নোবেল পুরস্কার নেয়ার প্রাক্কালে কৈলাস বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘লাখ লাখ শিশু যারা শৈশববঞ্চিত, তাদের জন্য এই পুরস্কার গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এটি প্রচলিত শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখবে। সচেতনতাই যেকোনো পরিবর্তনের শুভ সূচনা ঘটায়।
তিনি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের পুরোধা মহাত্মা গান্ধীর ভীষণ ভক্ত। তার ভাষায়, ‘আমরা এমন এক মাটিতে জন্মগ্রহণ করেছি, যেখানে মহাত্মা গান্ধী সব সমস্যার সমাধান করতেন শান্তি আর অহিংসা দিয়ে। আমি শতভাগ অহিংস উপায়েই আমার কাজ করে যাচ্ছি।
কৈলাস বলেন, এখানে জীবজন্তুর মত শিশু কেনা-বেচা হয়। সংঘাত ও সন্ত্রাসের মধ্যে শিশুর জন্ম হয় ও বেড়ে উঠে।
শিশু বয়সেই কৈলাসের মনে বর্ণ বৈষম্য গভীর ছাপ ফেলে। স্কুলের শিক্ষকদের বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন করলে তারা বলেছিলেন, ওরা গরিব, তাই পড়তে পারে না।’ শিক্ষকদের এই জবাব শিশু কৈলাসের পছন্দ হয়নি। একদিন জুতা পরিষ্কার করা ছেলেটির বাবার কাছেই চলে গেলেন তিনি। জিজ্ঞাস করলেন, আমরা সবাই যখন স্কুলে যাই, ও কেন যায় না?
ছেলেটির বাবার উত্তর ছিল, কাজ করতেই জন্ম হয়েছে আমাদের।
কৈলাস বলেন, আমি সেদিন বুঝতে পারিনি, কেন কিছু মানুষ শুধু কাজের জন্যই জন্মাবে আর অন্যরা জীবনকে নানাভাবে উপভোগ করবে।
কৈলাস শিশুশ্রমের দিক থেকে শীর্ষে থাকা ভারতে শিশুশ্রম বন্ধে সোচ্চার হন। শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করার জন্য একপর্যায়ে প্রকৌশলী কৈলাস চাকরিই ছেড়ে দেন। তিনি বলেন, প্রকৌশলী হওয়ার জন্য আমার জন্ম হয়নি। শৈশব থেকেই আমার নেশা শিশুদের জন্য কাজ করা।
এ লক্ষ্যে ১৯৮০ সালে তিনি গড়ে তোলেন ‘বাচপান বাঁচাও আন্দোলন’। এখন বিশ্বের ১৪০টি দেশে কাজ করছে তার সংগঠনটি। বিশ্বব্যাপী নানাভাবে দুর্গত, বিপন্ন শিশুদের পুনর্বাসনে কাজ করে সংগঠনটি।
তিনি বলেন, ‘যখন কোনো শিশুকে সহায়তা করি আর তার চোখের দিকে তাকাই, মনে হয় ওরাই আমাকে মুক্তি দিচ্ছে।’ নিজের এই কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন কৈলাস।
তিনি বলেন, ‘ভারতের হাজারো সমস্যা আছে। তবে এসবের সমাধানের লাখো পথও রয়েছে।’
কৈলাস সত্যার্থী ১৯৫৪ সালের ১১ জানুয়ারি ভারতের মধ্যপ্রদেশে জন্মগ্রহণ করেন। তড়িৎ প্রকৌশল বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রিধারী কৈলাস আশির দশক থেকে শিশু অধিকার নিয়ে কাজ শুরু করেন। পাকিস্তানের নারী শিক্ষা আন্দোলনের কর্মী মালালা ইউসুফজাইয়ের সঙ্গে যৌথভাবে তিনি নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন। তিনি পাকিস্তানের কিশোরী মালালাকে সবচেয়ে সাহসী শিশু অভিহিত করে তার ভূয়সী প্রশংসা করেন।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) তথ্যমতে, ২০০০ সালের পর শিশুশ্রমের হার এক-তৃতীয়াংশ হ্রাস পেয়েছে। তবে এখনো বিশ্বে কমপক্ষে ১৬ কোটি ৮০ লাখ শিশুশ্রমিক রয়েছে। আর ইউনিসেফের ধারণা, শুধু ভারতেই শিশুশ্রমিকের সংখ্যা দুই কোটি ৮০ লাখের কাছাকাছি।
কৈলাস বলেন, তার জীবদ্দশাতেই শিশুশ্রম নির্মূল করা সম্ভব। তিনি বলেন, ‘আমি আশা করি, আমার জীবদ্দশায় এর সমাপ্তি ঘটবে। তবে তার জন্য আমাদের সবাইকে শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে।’