ওরা কি ‘বিনোদন পণ্য’?




নিজের পরিবার থেকে শুরু সকল স্তরের মানুষগুলো যখন 'হিজরা' বা 'যৌন সংখ্যালঘু'দের অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। ঠিক তখনই তারা অধিকার পাওয়ার একমাত্র আশ্রয় মনে করছে গণমাধ্যমকে। তবে গণমাধ্যমগুলো তাদের অধিকার আদায়ে যৎসামান্য কথা বললেও তাদেরকে ‘বিনোদন পন্য’ হিসেবে উপস্থাপন করছে বেশি।
দর্শক-শ্রোতা-পাঠক গণমাধ্যমে হরহামেশাই দেখতে পায়  'হিজরা'দের 'কুৎসিত চেহারা' অর্থাৎ তাদের 'অপরাধ' গুলো। তবে সংবাদ মাধ্যমের দায়িত্ব কি শুধু  তাদের 'অপরাধ' দেখানো? একজন হিজরা কিভাবে অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে তা কয়টি গণমাধ্যমে দেখানো হয়? কতজন প্রতিবেদক তাদের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পিছনের গল্প জানতে অনুসন্ধান করছে? সেটা এখন দেখার বিষয়!
কিছু গনমাধ্যম কর্মী অতি উৎসাহী হয়ে তাদেরকে নিয়ে প্রায় বিনোদনমূলক সংবাদ তৈরী করে। যা মানবিকভাবে বিবেচনা করলে অতি নগন্যের খাতায় নাম লেখাতে হয়! যখন কোন গণমাধ্যম কর্মী নিজের দায়িত্ববোধ থেকে দুই একটি হিউম্যান স্টোরি করে তাদের নিয়ে তখনই তার অফিসের সহকর্মী দ্বারা নিজেই মানসিকভাবে নির্যাতিত হয়।
এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বেসরকারি টেলিভিশনের প্রতিবেদক বলেন, 'আমি যখন হিজারাদের নিয়ে ধারাবহিক ভাবে কয়েকটি প্রতিবেদন তৈরি করেছি তখন থেকেই আমার নামের পাশে হিজরা যুক্ত করে দিলো আমার সহকর্মীরা। তবে আমি থেমে থাকেনি। পরে আরো কয়েকটি ধারাবহিক প্রতিবেদন করেছি।'
একজন গণমাধ্যম কর্মীর চিন্তাধারা যদি এমন হয় তাহলে সমাজে পরিবর্তন আনা কখনো সম্ভব হবে?
এতো গেলো সংবাদ মাধ্যমের কথা। এবার আসা যাক চলচ্চিত্র বা নাটকের কথায়। প্রথমে একটি উদাহরণ হিসেবে আনা যায় ‘ছাইয়্যা ছাইয়্যা’ নাটকের গল্পকে। যেখানে বাংলাদেশের ছোট পর্দার জনপ্রিয় দুই অভিনেতা মোশারফ করিম ও সিদ্দিককে দেখা যায় যৌন সংখ্যালঘুদের চরিত্রে। যেখানে যৌন সংখ্যালঘুদের কেবল বিনোদনের পাত্র হিসেবে দেখানো হয়েছে।
চিত্রিত হয়েছে তাদের দ্বারা সাধারণ মানুষের হয়রানির চিত্র। শুধু তাই নয় দেশের বিভিন্ন চলচ্চিত্রে তাদেরকে শুধুমাত্র বিনোদনের পাত্র হিসেবে রাখা হয়। বাংলাদেশের মানুষ বা সমাজ যেখানে 'যৌন সংখ্যালঘু'দের একঘরে করে রেখেছে। অন্যদিকে যদি বড় পর্দা, ছোট পর্দা বা গণমাধ্যমে তাদেরকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করা হয় তাহলে সমাজে তাদের অবস্থাটা কোথায় যাবে? আশার কথা দেশে বন্ধু সোশ্যাল ওয়েল ফেয়ার সোসাইটি নামক একটি সংগঠন বিভিন্নভাবে গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে কথা বলে তাদের নিয়ে  কাজ করতে সাংবাদিকদের উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছে।
একটি দেশের উন্নতি দেশের সব পর্যায়ের জনগোষ্ঠীর উন্নতি। তাই দেশের সব পর্যায়ের সুষম অর্থাৎ দেশের সার্বিক উন্নতির জন্য আমাদের অবশ্যই 'যৌন সংখ্যালঘু' সম্প্রদায় বা প্রান্তিক ‘হিজড়া’ সম্প্রদায়কে সমাজের মূলস্রোতে আনতে হবে। নিজেদেরকে একটি সভ্য জাতি হিসেবে পরিচিত করতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। জীবনযাপনের পদে পদে হিজরারা হোঁচট খায়।
জীবনে কখনও তাদের বই-খাতা হাতে কোনো স্কুল-কলেজের চৌকাঠ পেরোনো সম্ভব হয় না।  প্রতিনিয়ত সমাজের কাছে তারা তিরস্কৃত। জীবনের শুরুতে বোধ করে সেই শিশুটিও বুঝে যায়, সে অনাহূত, অনাকাঙ্খিত!
তার ভোটাধিকার নেই। সমাজ-সংসারে প্রবেশাধিকার নেই। অর্থনৈতিক ইঁদুর দৌঁড়েও অংশগ্রহণ নেই। নেই কোনো স্নেহের প্রকাশ। নেই প্রেমের ব্যঞ্জনা। তাহলে কী আছে তার? বিভিন্ন সময় পাবলিক টয়লেটে পুরুষ ও নারী উভয় কর্নার থেকে তাদের বের করে দেওয়া হয়। সমাজ বা পরিবারে লাঞ্ছনা আর  মৃত্যুর পর তাদের সৎকারের জন্য গোরস্থানে ঠাঁই না পাওয়া এবং সমাহিত করার জন্য লৈঙ্গিক পরিচয় গোপন রাখা।
এসব কারণে হয়তো তারা বেপরোয়া। কায়দা-কেতা দিয়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষকে বিব্রত করে। নবজাতকের পরিজনের কাছে টাকার জন্য জোরাজুরি করে। এভাবেই তারা হয়তো প্রতিশোধ নেয়! এসবের সব কিছুর ইতি টানা যাবে যদি আমাদের গণমাধ্যম তাদের বিষয়গুলো সবার মাঝে তুলে ধরে। তাহলে পরিবর্তন আসবে।
'যৌন সংখ্যালঘু'দের নিয়ে কাজ করা সংগঠন বন্ধু ওয়েল ফেয়ার সোসাইটির কমিউনিকেশন স্পেশালিস্ট জাহিদ আল আমীন। গণমাধ্যমে যৌন সংখ্যালঘু ইস্যু  উপেক্ষিত হওয়া প্রসঙ্গে বলেন, সমাজ বা মানুষের মধ্যে একদিনে পরিবর্তন আনা সম্ভব না। গণমাধ্যমেও সহজে পরিবর্তন আনা যাবে না। গণমাধ্যমেতো মানুষরাই কাজ করে। আমরা ধীরে ধীরে কাজ চালিয়ে যাচ্ছি। গণমাধ্যমে ইতিবাচক কিছু ব্যাপারে পরিবর্তন আনার  জন্য গণমাধ্যম কর্মীদের উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছি। প্রত্যাশা- সময় বদলাবে!