‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে
বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা
আমরা তোমাদের ভুলবো না ...’
কণ্ঠে গান হূদয়ে শোক-শ্রদ্ধা এবং মৌলবাদমুক্ত মুক্তিযুদ্ধের চেতনালালিত বাংলাদেশ নির্মাণের প্রত্যয়ে দেশবাসী স্মরণ করেছে তার শ্রেষ্ঠ সন্তান শহীদ বুদ্ধিজীবীদের। ভোর থেকেই বিভিন্ন সামাজিক, সংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতা-কর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ সমবেত হতে থাকেন রাজধানীর রায়ের বাজারের বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে।
এর আগে, রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে রাতের প্রথম প্রহরে মোমবাতি জ্বালিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করে কয়েকটি সংগঠন। এরপর সকাল সাড়ে ৭টার পর থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন সারিবদ্ধভাবে শ্রদ্ধা নিবেদন শুরু করেন। এক পর্যায়ে রায়েরবাজার স্মৃতিসৌধ মুখরিত হয়ে ওঠে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পদচারণায়। অনেকে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে নিয়ে শহীদ বেদীতে শ্রদ্ধা জানাতে আসেন।
মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের প্রাক্কালে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর এদেশীয় দালাল রাজাকার, আল-বদর ও আল-শামস সদস্যরা যেখানে জাতির মেধাবী সন্তানদের হত্যা করে ফেলে রেখেছিল। বেলা বাড়ার সঙ্গে বাড়তে থাকে জনতার স্রোত। সব স্রোত যেন এক মোহনায় মিশে একাকার হয়ে যায়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় দ্রুত কার্যকরের দাবিতে মুহুর্মুহু স্লোগানে বদ্ধভূমি এলাকা প্রকম্পিত হয়ে উঠে।
ভোর থেকেই রায়েরবাজার বদ্ধভূমি স্মৃতিসৌধে মানুষের ঢল নেমেছিল। রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠন, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ সবাই এসেছিল জাতির বীর শহীদদের শ্রদ্ধা জানাতে। এ দিকে, এ ছাড়া কেন্দ্রীয় খেলাঘরের শিশু সদস্যরা একাত্তরের বদ্ধভূমি নিয়ে একটি কোরিওগ্রাফি পরিবেশনায় অংশ নেয়।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পক্ষে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ ও অ্যাডভোকেট জাহাঙ্গীর কবির নানক এমপি, সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক এডভোকেট আফজাল হোসেন এবং প্রচার সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. আব্দুস সোবহান গোলাপ বধ্যভূমি স্মৃতিসৌধে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পক্ষে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, নৌ পরিবহনমন্ত্রী শাহজাহান খানের নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন মঞ্চ ও প্রজন্ম মঞ্চ, উপাচার্য আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকের নেতৃত্বে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের নেতৃত্বে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, খালেকুজ্জামানের নেতৃত্বে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুর নেতৃত্বে প্রসিকিউটবৃন্দ, উপাচার্য প্রফেসর ড. এম এ মান্নানের নেতৃত্বে উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সারের মেয়ে শমী কায়সার, ডা. আলীম চৌধুরীর মেয়ে ডা. নুজহাত চৌধুরী ও সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের ছেলে তৌহিদ রেজা নূরের নেতৃত্বে প্রজন্ম-৭১, সভাপতি ওমর ফারুক চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশিদের নেতৃত্বে আওয়ামী যুবলীগ, ছাত্রলীগ সভাপতি বদিউজ্জামান সোহাগ ও সাধারণ সম্পাদক সিদ্দিকী নাজমুল আলম, গোলাম কুদ্দুসের নেতৃত্বে সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট, সভাপতি মো. সাজ্জাদ হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক রাশেদুজ্জামান শাহীনের নেতৃত্বে আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সংগঠন, আব্দুস সামাদ পিন্টুর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধা সংহতি পরিষদ শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানায়।
এ ছাড়া লালমাটিয়া মহিলা কলেজ, ফয়জুর রহমান আইডিয়াল স্কুল এন্ড কলেজ, পাইওনিয়ার কলেজ, মিলেনিয়াম হার্ট এন্ড জেনারেল হাসপাতাল, সরকারি শারীরিক শিক্ষা কলেজ, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমী, চাইল্ড হ্যাভেন ইন্টান্যাশনাল স্কুল, মধুবাগ বাড়ি মালিক সমবায় সমিতি, দুস্থ স্বাস্থ্য কেন্দ্র, রায়ের বাজার উচ্চবিদ্যালয়, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, সেইফ স্কুল, মোহাম্মদপুর ল্যাবরেটরি হাই স্কুল, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ মোহাম্মদপুর থানা কমান্ড, মুক্তিযোদ্ধা ঐক্য পরিষদ, স্বচ্ছ ফাউন্ডেশন, মোহাম্মদপুর মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, ঢাকা আর্ট কলেজ, এস এম জিনিয়াস স্কুল এন্ড কলেজ, ঢাকা আইডিয়াল ক্যাডেট কলেজ, বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ, মোহাম্মদপুর উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, সাকসেস মডেল হাই স্কুল, আদাবর থানা যুব মহিলা লীগ, ব্লুমিং চাইল্ড হাই স্কুলসহ বিভিন্ন স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও রায়ের বাজার বধ্যভূমিতে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়।
প্রতীকী বধ্যভূমি:
একাত্তরে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে এই বধ্যভূমিতে যেভাবে ফেলে রেখে যাওয়া হয়েছিল— অভিনয়ের মাধ্যমে মূলবেদীর পাশে সেই দৃশ্যের রচনা করে কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসরের সদস্যরা। খোলা একটি জায়গায় সারিবদ্ধভাবে রাখা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ শহীদ বুদ্ধিজীবীদের ছবি। সেখানেও অনেককে শ্রদ্ধা জানাতে দেখা যায়।
শহীদ বুদ্ধিজীবী শহীদুল্লাহ কায়সারের মেয়ে অভিনেত্রী শমী কায়সার বলেছেন, ‘আমার বাবা শুধু আমার একার নন, সবার।’ রবিবার রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে খেলাঘর আয়োজিত এক চিত্রাঙ্কন প্রদর্শন অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেয়ার সময় তিনি এ মন্তব্য করেন।
শমী কায়সার বলেন, এই দিনটা ছিল জাতীয় জীবনের জন্য এক অন্ধকার অধ্যায়। আমরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবি জানাচ্ছি। এ দাবি কোনো প্রতিহিংসামূলক কাজ নয়, এ দাবি ‘ন্যায্যতার, সততার ও সত্যের।’
এ অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক বলেন, খেলাঘর এই প্রতীকী বধ্যভূমির মাধ্যমে বুদ্ধিজীবী হত্যার দৃশ্য অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। তিনি বলেন, অনেক বুদ্ধিজীবীদের লাশের দাফন করা সম্ভব হয়নি। সে জন্য জামায়াতে ইসলামের ওই নেতাদের জানাজা ও দাফন বাংলাদেশে হতে দেওয়া হবে না, যারা বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করেছিল।