মঞ্চস্থ হলো পাক বাহিনীর আত্মসমর্পণের দৃশ্য

 
 
 
 
 
পড়ন্ত বিকালে পশ্চিমাকাশে সূর্য হেলে পড়েছে। ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সবুজ গাছপালা ভেদ করে তখনো তা আলো ছড়াচ্ছিল। এই উদ্যানের শিখা চিরন্তন সংলগ্ন বেদীর আশাপাশে হাজার হাজার নগরবাসীর ভিড়। হঠাত্ মুহুর্মুহু বাঁশির শব্দ। এরই মধ্যে জলপাই রংয়ের একটি খোলা জিপ প্রবেশ করল বেদীতে। যেটিতে বসে আছেন খাকি পোশাক পরিহিত মিত্র বাহিনীর পূর্বাঞ্চালীয় কমান্ডের সর্বাধিনায়ক লে. জেনারেল জগজিত্ সিং অরোরা। আর আছেন পরাজিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চালীয় কমান্ডের অধিনায়ক লে. জে. এ কে নিয়াজী। জিপ থেকে নেমেই দ্রুত গতিতে হেঁটে তারা সরাসরি চলে গেলেন বেদী মঞ্চে। সেখানে আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করলেন নিয়াজী। এ সময় সমবেত জনতা স্লোগান দিলেন ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’। বিশ্বের মানচিত্রে জন্ম নিল নতুন একটি দেশ বাংলাদেশ। মহান মুক্তিযুদ্ধের  বিজয় দিবস উপলক্ষে ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে মঞ্চায়ন করা হলো পাক বাহিনীর সেই প্রতীকী আত্মসমর্পণের দৃশ্য। উপস্থিত জনগণের মধ্যে ফিরে এল ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের সেই মাহেন্দ্রক্ষণটি। মঙ্গলবার এটির আয়োজন করে সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম-মুক্তিযুদ্ধ ’৭১। সংগঠনটির উদ্যোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা এটি মঞ্চস্থ করেন।
সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের যুগ্ম মহাসচিব নাট্যকার ম. হামিদ বলেন, নতুন প্রজন্মকে এই ঐতিহাসিক দৃশ্য স্মরণ করে দিতেই প্রতিবছর ১৬ ডিসেম্বর আমরা এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকি। যাতে করে এই প্রজন্ম জানতে পারে বীর মুক্তিযোদ্ধারা নয় মাস যুদ্ধ করে এই দেশটিকে স্বাধীন করেছেন। যেখানে রয়েছে ৩০ লাখ শহীদের আত্মত্যাগ ও দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি।
এ দিকে, আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষরের পরপরই নাট্যকলা বিভাগের শিক্ষার্থীরা বেদী এলাকা ত্যাগ করেন। এরপর ফোরাম নেতৃবৃন্দ নতুন প্রজন্মের হাতে তুলে দেন জাতীয় পতাকা। পতাকা তুলে দেয়ার আগে জাতীয় পতাকা হাতে একে একে মঞ্চে আসেন সেক্টর কমান্ডারস ফোরামের চেয়ারম্যান ও সাবেক সেনাপ্রধান মে. জে. (অব.) কে এম শফিউল্লাহ, লে. ক. (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী, ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হারুন হাবীব, নাট্যকার ম. হামিদ, সাবেক সেনা প্রধান লে. জে. (অব.) হারুনুর রশীদ বীর প্রতীক, ডা. মনসুর আহমেদ, নুরুল আনোয়ার প্রমুখ।
প্রায় ৩০ জন বীর মুক্তিযোদ্ধা নতুন প্রজন্মের হাতে অর্পণ করেন জাতীয় পতাকা। এ সময় মঞ্চে সমবেত কণ্ঠে শিল্পীরা গাইছিলেন ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই খুশির হাওয়া বইছে বাংলার ঘরে ঘরে...’।
অনুষ্ঠানে কে এম শফিউল্লাহ বলেন, বিজয় উত্সবের জন্য একত্রিত হয়েছি। ২৩ বছর পাকিস্তান আমাদের কিছু দেয়নি। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু দাবি-দাওয়া ঘোষণা করে আমাদের যুদ্ধে পাঠিয়েছিলেন। তার ভাষণে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমরা অস্ত্র হাতে নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলাম। ৯ মাস যুদ্ধ করে পাক হানাদার বাহিনীকে পরাজিত করি। আর এখানেই সেই পাক বাহিনী আত্মসমর্পণ দলিলে স্বাক্ষর করে। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু দালাল আইনের মাধ্যমে স্বাধীনতা-বিরোধীদের বিচারের আওতায় এনেছিলেন। বর্তমান সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে বিচারের কাজ শুরু করে। এরই মধ্যে অনেক যুদ্ধাপরাধীর রায় হয়েছে এবং তা কার্যকর হবে।
শুরুতে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হারুন হাবীব। তিনি নতুন প্রজন্মের উদ্দেশে অনুষ্ঠানটি উত্সর্গ করেন। অনুষ্ঠানে দেশবন্দনা সঙ্গীত ও নৃত্য পরিবেশিত হয়। পরে জাতীয় সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি ঘটে। এ সময় উপস্থিত জনতা দাড়িয়ে কণ্ঠ মেলান জাতীয় সঙ্গীতে।