সুন্দর দেশ গড়ার প্রত্যয়

এক হাতে লাল-সবুজের দোলা, আরেক হাতে ফুল। অন্তরে গভীর শ্রদ্ধা। বসনে রঙের খেলা। কোলের শিশু থেকে শুরু করে অশীতিপর বৃদ্ধ—সবাই ছুটেছেন একই গন্তব্যে। সবার কণ্ঠে একই উচ্চারণ—‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলে যারা, আমরা তোমাদের ভুলব না, আমরা তোমাদের ভুলব না’। লাখো শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত মহান বিজয়ের ৪৩ তম বার্ষিকী অথবা ৪৪তম বিজয় দিবসে এভাবেই গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করলো জাতি। সবাই অঙ্গীকার করলো সকল অপশক্তি রুখে দিয়ে সুখি, সমৃদ্ধ ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়ার। সব যুুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি দিয়ে জাতিকে কলঙ্কমুক্ত করার দাবি উঠলো সবার কণ্ঠে। শ্রদ্ধা আর ভালবাসার অনন্য প্রতীক ফুলে ফুলে ছেয়ে যায় গোটা স্মৃতিসৌধের বেদী। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক গান ও নাটক মঞ্চস্থ  করে স্মৃতিসৌধ চত্বরে।

মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে রাজধানীর প্রধান সড়কগুলো জাতীয় ও বর্ণিল পতাকায় শোভিত করা হয়। সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে জাতীয় পতাকা উত্তোলন করা হয়। বেতার ও টেলিভিশনে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দেশের প্রতিটি উপজেলায় কুচকাওয়াজ, বিজয় র্যালি ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। দেয়া হয় মুক্তিযোদ্ধাদের সংবর্ধনা।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা
সাভার থেকে আমাদের স্টাফ রিপোর্টার তুহিন খান জানান, ভোরে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে জাতীয় স্মৃতিসৌধে মহান বিজয় দিবসের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। বিউগলে করুণ সুর বেজে ওঠে। এরপর রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন ভোর ছয়টা ৩৪ মিনিটে।
এ সময় সশস্ত্র বাহিনীর একটি চৌকস দল শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানায়। জাতীয় সংসদের স্পিকার শিরিন শারমীন চৌধুরী, প্রধান বিচারপতি, বিচারপতিবৃন্দ, তিন বাহিনীর প্রধান, সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতর্ন কর্মকর্তাবৃন্দ, নির্বাচন কমিশনার, কূটনৈতিক ছাড়াও বীরশ্রেষ্ঠ পরিবারের সদস্যবৃন্দ তখন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। হুইল চেয়ারে বসা ছিলেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর পর যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা শহীদ বেদীতে পুস্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। পরে স্পিকার পুস্পার্ঘ্য অর্পণ করেন।
রাজনৈতিক দলসহ বিভিন্ন সংগঠনের শ্রদ্ধা
পরে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা দলের পক্ষ থেকে পুস্পার্ঘ্য অর্পন করেন। এ সময় সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, মতিয়া চৌধুরী, তোফায়েল আহমেদ, ড. আব্দুর রাজ্জাক, ওবায়দুল কাদের, শাহজাহান খান, ড. হাসান মাহমুদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গর্ভনর ড. আতিউর রহমান, ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য  আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক পৃথকভাবে পুস্পার্ঘ্য অর্পন করেন। রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী ও কুটনৈতিকরা চলে যাওয়ার পর স্মৃতিসৌধ সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হলে স্মৃতিসৌধের পাদদেশে লাখো মানুষের ঢল নামে।
সকাল সোয়া ৯টার দিকে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে স্মৃতিসৌধের বেদীমূলে পুস্পস্তবক অর্পন করে বিএনপি। এ সময় বিএনপি নেতা মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. মঈন খান, মির্জা আব্বাস, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, নজরুল ইসলাম খান, ড. ওসমান ফারুক, ব্যারিস্টার শাজাহান ওমর প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সকাল সাড়ে ৮টায় জাতীয় পার্টির (জেপি) মহাসচিব ও সাবেক মন্ত্রী শেখ শহীদুল ইসলামের নেতৃত্বে পুস্পস্তর্বক অর্পন করা হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পার্টির অতিরিক্ত মহাসচিব সাদেক সিদ্দিকী, প্রেসিডিয়াম সদস্য এজাজ আহমেদ মুক্তা, যুগ্ম মহাসচিব ও যুবসংহতির সভাপতি এম.এ কাইয়ূম, সাংগঠনিক সম্পাদক আবুল খায়ের সিদ্দিকী আবু, দপ্তর সম্পাদক এম. সালাহউদ্দীন আহমেদ, প্রচার সম্পাদক আমিনুল ইসলাম তপন, কৃষি বিষয়ক সম্পাদক আব্দুল হালিম, শিক্ষা ও ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট এনামুল ইসলাম রুবেল, মানবাধিকার সম্পাদক নূরুল ইসলাম মিয়া খান, যুগ্ম দপ্তর সম্পাদক জীবন কৃষ্ণ বৈরাগী প্রমুখ।
এরপর জাতীয় পার্টির (এরশাদ) চেয়ারম্যান এইচ এম এরশাদ ও বিরোধী দলীয় নেতা বেগম রওশন এরশাদের নেতৃত্বে জাতীয় পার্টি, ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে গণ ফোরাম, রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে ওয়ার্কাস পার্টি, হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বে জাসদ,  জাসদ (রব)  আ স ম রবের নেতৃত্বে জেএসডি, কর্নেল (অবঃ) অলি আহমেদের নেতৃত্বে এলডিপি পৃথকভাবে পুস্পস্তর্বক অর্পন করেন।
আরো যেসব প্রতিষ্ঠান, সংগঠন শ্রদ্ধা জানায় সেগুলো হচ্ছে বিকল্পধারা বাংলাদেশ, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় শ্রমিক লীগ, সিআরপি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় অফিসার সমিতি, কর্মচারী সমিতি, নিট্রাড, আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগ, এসো পড়ি, কেন্দ্রীয় গো প্রজনন ও দুদ্ধ খামার, বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, ঢাকা সিটি কলেজ, টিআইবি, সচেতন নাগরিক কমিটি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, গণস্বাস্থ্য এন্টিবায়টিক লিমিটেড, বঙ্গবন্ধু স্বাংস্কৃতিক জোট, ইনভেস্টমেন্ট কর্পোরেশন বাংলাদেশ, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দল, স্বেচ্ছা সেবক দল কেন্দ্রীয় কমিটি ও ঢাকা জেলা শাখা, পল্লী দারিদ্র বিমোচন ফাউন্ডেশন, গণ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হল সমূহ, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, জাকের পার্টি, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিল, শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ, আমরা মুক্তিযোদ্ধার সন্তান, ঢাকা আইনজীবী সমিতি, বাংলাদেশ বার কাউন্সিল, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটি, বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টাস এসোসিয়েশন, ঢাকা সাব-এডিটরস কাউন্সিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, নজরুল ইনস্টিটিউট, জনতা ব্যাংক লিমিটেড, কর্মজীবী নারী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষক সমিতি, বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষনা পরিষদ, বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সেসাইটি, বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, বাংলাদেশ স্যামবাদী দল, পরমাণু শক্তি গবেষনা প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, জাহাঙ্গিরনগর থিয়েটার, সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফন্ট, জাতীয় পেশাজীবী পরিষদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ শিক্ষক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ,  বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, খেলাঘর, উদিচী শিল্পীগোষ্ঠী, বাংলাদেশ পল্লি উন্নয়ন বোর্ড, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক কমান্ড, সেক্টর কমান্ডারস ফোরাম, সাভার পৌরসভা, বাংলাদেশ গ্রাম পুলিশ কর্মচারী ইউনিয়ন, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধ সংসদ, সাভার উপজেলা কমান্ড, সজাগ, প্রজন্ম-৭১ প্রমুখ।
বঙ্গবন্ধুর প্রতি প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা নিবেদন
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিজয় দিবসে উপলক্ষে রাজধানীর ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু স্মৃতি জাদুঘরের সামনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভাপতি শেখ হাসিনা দলীয় প্রধান হিসেবে দলের নেতাদের সঙ্গে নিয়ে জাতির পিতার প্রতিকৃতিতে আরো একবার পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।
এ সময় অন্যান্যের মধ্যে স্পিকার ড. শিরিন শারমীন চৌধুরী, শিল্পমন্ত্রী আমির হোসেন আমু, বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত, কৃষিমন্ত্রী বেগম মতিয়া চোধুরী, প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, নৌ-পরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান, সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ ও জাহাঙ্গীর কবির নানক, দপ্তর সম্পাদক ড. আবদুস সোবহান গোলাপ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
পরে প্রধানমন্ত্রী বিজয় দিবস উপলক্ষে তাঁর সরকারি বাসভবনে ১০ টাকা মূল্যমানের একটি স্মারক ডাক টিকেট ও একই মূল্যমানের একটি উদ্বোধনী খাম উন্মোচন করেন। এছাড়া তিনি পাঁচ টাকা মূল্যমানের একটি ডাটা কার্ডও উন্মোচন করেন।
অন্যদিকে মহান বিজয় দিবসে বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগ কেন্দ্রীয় কমিটি ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে। বঙ্গবন্ধু সৈনিক লীগের সভাপতি শিরিন আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক শাহ আকরাম হোসেন, সহ-সভাপতি শামসুজ্জোহা, সাংগাঠনিক সম্পাদক সর্দার মজিবুর রহমান, সাংস্কৃতিক সম্পাদক শেখ শফিউল ইসলাম মানিক, ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক তমাল আহমেদ খান বাবলু ও দফতর সম্পাদক বিএম কাইয়ুমসহ শতাধিক নেতা-কর্মী ৩২ নম্বর সড়কে বিজয় র্যালি বের করেন।
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রধানমন্ত্রীর উপহার
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মহান বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা হিসেবে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবার ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে ফুল-ফল ও মিষ্টি পাঠিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী ব্যক্তিগত সচিব সাইফুজ্জামান শিখর ও উপ-প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকন গতকাল সকালে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের মুক্তিযোদ্ধা পুনর্বাসন কেন্দ্রে বসবাসরত পরিবারগুলোর কাছে এসব উপহার সামগ্রী নিয়ে যান।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিবারবর্গ প্রতিটি জাতীয় ও ধর্মীয় উত্সবে তাদের খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তারা মোহাম্মদপুরে মুক্তিযোদ্ধাদের আবাসনের জন্য ৮৪ ফ্ল্যাট বিশিষ্ট একটি বহুতল বাণিজ্যিক-কাম-আবাসিক ভবন নির্মাণের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।