দেশে চার লক্ষাধিক শিশু গৃহকর্মের মতো অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত রয়েছে। এদের মধ্যে ৮৩ শতাংশই মেয়ে । গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের বয়সসীমা ৫ থেকে ১৮ বত্সর। এ সব গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুরা মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে দৈনিক গড়ে ১৫ ঘণ্টা কাজ করে থাকে। অপর দিকে, দেশে পথশিশুর সংখ্যা প্রায় ১২ লাখ।
গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুরা প্রায়শই নানা ধরনের শারীরিক, মানসিক এমনকি যৌন নির্যাতনের শিকার হয়। গৃহকর্মে নিয়োজিত অনেক শিশু চরম নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করে। কখানো কখনো গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুরা প্রায় বন্দিদশায় জীবন যাপন করে। তাদের পরিবারের কারো সাথেই দেখা করার কোনো সুযোগ থাকে না। ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সব নিয়ামক উপস্থিত থাকলেও গৃহশ্রমে নিয়োজিত শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় আনছে না সরকার। সংশ্লিষ্ট বিষয় অভিজ্ঞজনেরা মনে করেন, মধ্যবিত্ত সেন্টিমেন্টকে আঘাত না দেয়ার জন্য তা করা হচ্ছে। কারণ, বর্তমান প্রেক্ষাপটে অনু পরিবারের স্বামী-স্ত্রী দুজনেই কর্মজীবী হলে, তাদের পরিবারে কাজ করে শিশুরা।
গৃহকর্মে শিশুরা নিয়োজিত হওয়ার পেছনে অর্থনৈতিক অসহায়ত্ব, সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য, গ্রাম ও শহরের মধ্যে অর্থনৈতিক কর্মসূচির ব্যাপক ফারাক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈষম্য, পিতা-মাতার শিক্ষা ও সচেতনতার অভাবকে দায়ী করা হয়।
অপর দিকে, দেশে পথশিশুদের সংখ্যা নির্ধারণের জন্য সাম্প্রতিককালে কোনো জরিপ করা না হলেও এ ধরনের শিশুদের সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়ছে। ২০০৫ সালে পরিচালিত এক জরিপ অনুসারে ছয়টি বিভাগীয় শহরে পথশিশুর সংখ্যা ছিল প্রায় ৭ লাখ এবং একই জরিপে বলা হয় ২০১৪ সালে এ সংখ্যা হবে প্রায় ১২ লাখ। পথশিশুদের জীবনযাপন অত্যন্ত দুর্বিষহ। তারা অধিকাংশ সময়ই রাস্তা, পার্ক, ট্রেন ও বাস স্টেশনে, লঞ্চঘাটে, সরকারি ভবনের নিচে ঘুমায় এবং প্রতিনিয়তই নাইট গার্ড কিংবা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের দ্বারা নির্যাতনের শিকার হয়। অধিকাংশ পথশিশু তিন বেলা খাবার পায় না। ফলে তারা বিভিন্ন হোটেল-রেস্টুুরেন্টের পচা-বাসী খাবার, এমনকি ডাস্টবিনে ফেলা দুর্গন্ধযুক্ত খাবারও খেয়ে থাকে। নোংরা স্থানে চলাফেরা ও ঘুমানোর কারণে চর্ম রোগে আক্রান্ত হয় বেশির ভাগ পথশিশু। পথশিশু, বিশেষ করে মেয়ে শিশুরা যৌনবাহিত নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। এ সব শিশু বেঁচে থাকার তাগিদে ভাসমান যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করে থাকে। কখনো কখনো তাদের যৌন পেশায় নিয়োজিত হতে বাধ্য করা হয়।
বৃহস্পতিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বেসরকারি সংস্থা অ্যাসিট্যান্স ফর স্লাম ডুয়েলার্স (এএসডি) আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এ তথ্য জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে এএসডি, আইএলও, ইউনিসেফ, বিলস ও বিএসএএফ কর্তৃক পরিচালিত গবেষণা প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানানো হয়, অধিকাংশ গৃহকর্মী তিন বেলা খাবার পেলেও খাবারের পুষ্টিমান অত্যন্ত নিম্ন। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা পচা-বাসী খাবার পেয়ে থাকে এবং সময়মতো খেতেও পারে না। গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের বেতন-ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা খুবই কম। বর্তমানে গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের গড় মাসিক মজুরি ৫০৯ টাকা।
অনুষ্ঠানে গৃহকর্মকে আনুষ্ঠানিক সেক্টর হিসেবে স্বীকৃতি, গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুশ্রমকে ঝুঁকিপূর্ণ কাজের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা, খসড়া গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি জরুরি ভিত্তিতে চূড়ান্ত করা, পথশিশুদের স্থায়ী পুনর্বাসনের লক্ষ্য সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষার ব্যবস্থা করা, পথশিশুদের জন্য রাত্রিকালীন আবাসনের ব্যবস্থাসহ নয়টি সুপারিশ তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, অসহায় শিশুদের জন্য ভাতা চালু করা যায় কিনা বিষয়টি চিন্তাভাবনা করছে সরকার বলে জানিয়েছেন অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এম এ মান্নান। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টি যাচাই-বাছাই করার হবে। একই সঙ্গে যারা শিশুদের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন, তাদের পরামর্শ ও সুপারিশ গ্রহণ করা হবে। অর্থ প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, প্রধানমন্ত্রী শিশুবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। অসহায় শিশুদের ভাতা চালু করার বিষয়টি যদিও কঠিন, তবে একেবারে অসম্ভব নয়। এ জন্য সংশ্লিষ্ট বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে কাজে লাগানো যায় কিনা, তা বিবেচনা করা হবে। আগামী বাজেটে বিষয়টি চালু করার চিন্তা-ভাবনা করছে সরকার।
শহরের গৃহকর্মীরা মানবেতর জীবনযাপন করছে জানিয়ে এম এ মান্নান বলেন, রাজধানীর গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের বেশির ভাগই কন্যাশিশু। তারা ঘরের ঝুটা ভাত খেয়ে মেঝেতে শুয়ে থাকে। এটা চরম মানসিক নির্যাতন। এর চেয়ে রাস্তায় পড়ে থাকা ভালো বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সরকার শিশুদের জন্য বিশাল কর্মযজ্ঞ করছে দাবি করে তিনি বলেন, দেশের ২৯ জেলায় সকালে নাশতার জন্য বিস্কুট দেয়া হচ্ছে। ক্রমান্বয়ে অন্যান্য জেলায়ও তা ছড়িয়ে দেয়া হবে। এছাড়া শিশু বাজেট প্রণয়নের বিষয়টি চিন্তা-ভাবনা করছে সরকার। তবে প্রয়োগের জায়গা এখনো দুর্বল। তবে এটা ইচ্ছেকৃত নয়, সচেতনতার অভাব বলা যেতে পারে।
এএসডির নির্বাহী পরিচালক জামিল এইচ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে ধারণাপত্র উপস্থাপন করেন সংস্থার উপনির্বাহী পরিচালক মোজাম্মেল হক। বক্তব্য রাখেন, বিলসর সহকারী নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দীন আহমেদ, শিশু সুরক্ষা বিষয়ক বিশেষজ্ঞ শরফুদ্দিন খান, শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আব্দুস শহীদ মাহমুদ পমুখ।
উল্লেখ্য, ব্রেড ফর দ্য ওয়ার্ল্ড জার্মানির আর্থিক সহযোগিতায় এএসডি গৃহকর্মে নিয়োজিত শিশুদের সুরক্ষা ও পথশিশুদের নিরাপদ আশ্রয় প্রদানের লক্ষ্যে রাজধানীতে ‘ডেভেলপমেন্ট আব চিলড্রেন এ্যাট হাই রিস্ক’ নামে একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।