অবাঞ্ছিত গর্ভধারণ রোধ করতে অনেক সময় ওষুধের মাধ্যমে মাসিক নিয়মিত করার প্রয়োজন দেখা দেয়। আবার বয়ঃসন্ধিকালেও কেউ অবাঞ্ছিতভাবে গর্ভধারণ করে, বাল্যবিবাহের ফলে অবাঞ্ছিত মায়ের সংখ্যাও বাড়ে। সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসছে ওষুধের মাধ্যমে গর্ভপাতের ব্যাপক চাহিদা সৃষ্টি হচ্ছে। বাড়ছে ওষুধের মাধ্যমে মাসিক নিয়মিতকরণের জনপ্রিয়তা। সম্প্রতি এক গবেষণায় দেখা যায়, এ সম্পর্কিত মানসম্পন্ন সেবার অভাবে নানা জটিলতায় ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে নারীর যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্যসেবা। নানারকম জটিলাতায় ভুগছে সেবা গ্রহীতারা— এমন তথ্য প্রকাশ পায় নারীপক্ষ কর্তৃক পরিচালিত ‘ঔষধের মাধ্যমে মাসিক নিয়মিতকরণে মানসম্মত সেবা ব্যবস্থা’ বিষয়ক গবেষণায়। নারীপক্ষ ‘নিরাপদ গর্ভপাত অধিকারের দাবিতে’ একটি গবেষণা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পের আওতায় গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। সিরডাপ মিলনায়তনে গবেষণা তথ্য প্রকাশ করা হয়।
নারীপক্ষ ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন, বরিশাল সিটি করপোরেশন এবং বরগুনা জেলার চারটি উপজেলার চারটি ইউনিয়নে ওষুধের মাধ্যমে মাসিক নিয়মিতকরণ সেবার ওপর একটি গবেষণা করেছে। গবেষণায় দলগত আলোচনা, সরকারি স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, এনজিও কর্মকর্তা ও ওষুধের দোকানিদের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
গবেষণা যা বলে
গবেষণায় দেখা যায়, সরকারের এমআর অ্যান্ড এমআরএম এলাইয়েন্স সক্রিয় নয়। ২০১৮ সালে একটিও বৈঠক হয়নি। ফলে এক্ষেত্রে জটিলতা, প্রতিবন্ধকতা নিয়ে আলোচনা হয়নি। সরকারি সেবা ব্যবস্থায় এ সম্পর্কিত ওষুধ সহজলভ্য নয়। সাধারণ মানুষের এ সম্পর্কিত জ্ঞান কম। সচেতনতার অভাব আছে। ফার্মিসিতে এ ওষুধ সহজলভ্য হওয়ায় তা সহজেই মানুষের হাতে চলে আসে। কিন্তু ফার্মিসির বিক্রেতাসহ সেবাদানকারীদের সেই প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ। তাই তারা জানে না কী পরিমাণে ওষুধ নিতে হবে। অনুষ্ঠানে জানানো হয়, সরকার ২০১৩ সালে ওষুধের মাধ্যমে মাসিক নিয়মিতকরণ পদ্ধতি চালু করে। এর আগে মাসিক নিয়মিতকরণে যন্ত্র ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে যন্ত্র ও ওষুধ দু-ই ব্যবহূত হচ্ছে। গবেষণায় দেখা গেছে, শহর ও গ্রামের নারীদের কাছে এবং যৌনকর্মীদের কাছে মাসিক নিয়মিতকরণের ওষুধ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। নারীরা সহজে এ ওষুধ পেতে চান, তবে তারা গোপনীয়তার বিষয়েও নিশ্চয়তা চান। অনেক নারী এটাই মনে করেন যে, বয়স ও বৈবাহিক অবস্থা নির্বিশেষে সব নারীর কাছে এ ওষুধ সহজপ্রাপ্য হওয়া উচিত। যদিও কিছু নারীর এ ব্যাপারে দ্বিমত আছে। এ ওষুধের ব্যাপারে মানুষকে জানাতে বা সচেতন করতে কোনো কর্মসূচি নেই। সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানে এ ওষুধ এখনো পাওয়া যায় না।
বিশেষজ্ঞরা যা বলেন
প্রজনন স্বাস্থ্যবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা আইপাস বাংলাদেশের দেশীয় পরিচালক ডা. সাইদ রুবায়েত বলেন, কতজন করছে এবং কত রেকর্ড হচ্ছে সে বিষয় গ্যাপ আছে। দেশে প্রতিবছর ২৮ লাখ নারী ইচ্ছার বিরুদ্ধে বা অজান্তে গর্ভধারণ করেন। তাদের মধ্যে প্রায় সোয়া চার লাখ নারী মাসিক নিয়মিতকরণের পন্থা বেছে নেন, বাকি ১২ লাখ নারী গর্ভপাত ঘটান। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার শর্তগুলো কঠিনভাবে মেনে চলতে হবে। প্রশিক্ষণেও ঘাটতি আছে।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা) মোহাম্মদ শরীফ বলেন, এ বিষয় প্রশিক্ষণ দেওয়া লোকবল আছে। কিন্তু তারপরও কেউ কেউ কাজটি করতে চায় না। মানুষকে সচেতন ও সেবা সহজলভ্য করার জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। তিনি জানান, স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, বছরে সাত-আট লাখ নারী মাসিক নিয়মিতকরণ করেন, কিন্তু এক থেকে দেড় লাখ ঘটনা রেকর্ড থাকে।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সেপটিক অ্যাবরশনের (বাপসা) গবেষণা উপদেষ্টা ড. জামিল হোসাইন চৌধুরী বলেন, নারীরা দোকান থেকে বেশি ওষুধ কেনেন, তাই ওষুধের পাশাপাশি নারীরা যেন এখানে সঠিক পরামর্শ পান, সে জন্য বিক্রেতাদের উত্সাহিত করা এবং প্রশিক্ষণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরকে কাজ করতে হবে। নারীকে সঠিক তথ্য দিতে গণমাধ্যমকেও এগিয়ে আসতে হবে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সচেতনতা বৃদ্ধি করা। কে কোথায় গেলে সেবা পাবে তা জানতে হবে।
সুপারিশ
নারীদের স্বাস্থ্যঝুঁকি দূর করে এ ওষুধ সহজলভ্য করতে হবে। সরকারের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানে ওষুধ সহজলভ্য করতে হবে, সেবাদানকারীর মানসম্পন্ন ও অধিকার অনুযায়ী সেবাদানের প্রশিক্ষণ দিতে হবে, সরকারের জাতীয় গাইডলাইন বাস্তবায়ন করতে হবে, বেসাদানকারীকে পর্যবেক্ষণ করে তাকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনতে হবে, সরকারের পক্ষ থেকে প্রচার-প্রচারণা করা জরুরি, সঠিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে বক্তারা
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের পরিচালক (মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্যসেবা) মোহাম্মদ শরীফ। আলোচক ছিলেন আইপাস বাংলাদেশ-এর দেশীয় পরিচালক ডা. সৈয়দ রুবাইয়াত, বাপসার গবেষণা উপদেষ্টা ড. জামিল হোসেন চৌধুরী। গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন প্রধান গবেষক ড. তাসনিম আজীম। স্বাগত বক্তব্য দেন নারীপক্ষের প্রাক্তন সভানেত্রী অ্যাডভোকেট হাববুন নেসা। পরিচালনা করেন সামিয়া আফরীন।
ছবি: ইন্টারনেট