আইনি দুর্বলতায় স্বেচ্ছাচারী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়

আইনের দুর্বলতার সুযোগে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বেচ্ছাচারিতা চলছে। ইচ্ছেমত ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করে খেয়ালখুশি মত বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা করা হচ্ছে। ‘পাঁচ বছরের মধ্যে নিজস্ব জমিতে ক্যাম্পাস পরিচালনা ও শাখা ক্যাম্পাস বন্ধসহ আইনের প্রতিটি অংশ মানতে হবে এটা ভাবতেও নারাজ বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। আইনের দুর্বলতায় এবং বিধিমালা না থাকায় বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক কর্মকর্তা বা কর্মচারীদের জন্য নেই কোন বেতন কাঠামো। একই পদে কারো বেতন বেশি, কারো কম। আবার একেক বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন ফি ভিন্ন। ইচ্ছেমত শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে টিউশন ফি আদায় করা হয়। দরিদ্র মেধাবীদের জন্য কাগজে-কলমে বিনা টিউশন ফিতে পড়ানোর কথা বলা হলেও বাস্তবে চিত্র ভিন্ন।

কাদের নিয়ে ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা যাবে এ বিষয়ে আইনে কোন সুনির্দিষ্ট কিছু উল্লেখ না থাকায় কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালকে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা হয়েছে। বাবা-মা-সন্তান ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকর্তা হিসাবে কর্মরত।
দেশে ৭৯টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের যে কোন শিক্ষার্থীকে সার্টিফিকেট প্রদানের ক্ষমতা আছে। কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয় এই ক্ষমতা কাজে লাগিয়ে সার্টিফিকেট বিক্রি করছে। আইনের মধ্যে থেকে এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিতে পারছে না সরকার। ব্যবস্থা নিতে গেলে আদালতের শরণাপন্ন তারা।
শিক্ষার্থী ভর্তিতে কোন কোটা অনুসরণ করা হয় না। ইচ্ছুক সবাইকেই ভর্তি করা হয়। ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে মান যাচাই হয় না।  বিশ্ববিদ্যালয় আইনে শিক্ষক-কমচারীদের বেতন কাঠামো এবং টিউশন ফি নির্ধারণ করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনকে অবহিত করার কথা থাকলেও তা মানছে না অনেকেই।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে বলা হয়েছে, ‘বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন ও পরিচালনার জন্য অনধিক ২১ এবং অন্যূন ৯ সদস্যবিশিষ্ট একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করিতে হইবে।’ কিন্তু কাদের নিয়ে এই ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করা যাবে, কাদের রাখা যাবে না এ বিষয়ে কোন নির্দেশনা নেই। এই সুযোগটির অপব্যবহার করে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে তৈরি করছে। আবার ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কর্মকর্তা হিসাবে নিয়োগ পেতে পারেন কিনা বা কোন আর্থিক সুবিধা পাবেন কিনা এ বিষয়ে কোন নির্দেশনা নেই। সংশ্লিষ্টরা বলেন, একটি বিধিমালা করে এ বিষয়ে নির্দেশনা দেয়া উচিত। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম বলেন, ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্যরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ড থেকে আর্থিক সুবিধা গ্রহণ করলে সেটা বেআইনি ও অনৈতিক। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে বলা হয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য পর্যাপ্ত সংখ্যক লাইব্রেরি, ক্লাসরুম, অফিস কক্ষ, সেমিনার কক্ষ, শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক কমনরুম থাকতে হবে। বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় এ নিয়ম মানছে না। ‘পর্যাপ্ত সংখ্যক’-এর অপব্যবহার করছে তারা। এ ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ থাকা উচিত বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অন্যকোন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক বা কর্মকর্তা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়োগ দিতে হলে মূল নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের ছাড়পত্র কমিশনে জমা দেয়ার নিয়ম থাকলেও তা মানছেন না বেশিরভাগ শিক্ষক ও বিশ্ববিদ্যালয়। নিজেদের মত করে সিলেবাস প্রণয়ন করা হয়। কোন মানদণ্ড মানা হচ্ছে না।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৯টি পৃথক কর্তৃপক্ষ (ট্রাস্টি বোর্ড, সিন্ডিকেট) ও এর কার্যাবলী এবং ক্ষমতা আইনে উল্লেখ থাকলেও তা মানছে না অনেক বিশ্ববিদ্যালয়। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইনে উপাচার্যকে প্রধান নির্বাহীর ক্ষমতা দেয়া হলেও প্রতিটি ক্ষেত্রে বোর্ড অব ট্রাস্টিজের মতামত নিয়েই কাজ করতে হচ্ছে। ‘এ কারণে শিক্ষার মান ঠিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না’ বলে কোন কোন উপাচার্য ‘ইত্তেফাক’কে জানিয়েছেন। শিক্ষার গুণগতমান নিশ্চিত করার জন্য প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি সেল থাকার নির্দেশনা থাকলেও তা নেই বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ে।

শিক্ষামন্ত্রী নূরুল ইসলাম নাহিদ বলেছেন, কিছু বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ম-কানুন মানছে না। এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।