হাজারীবাগ এলাকায় ট্যানারির বর্জ্য দিয়ে পোল্ট্রি ফিড তৈরি করে দীর্ঘদিন ধরেই বাজারজাত করা হচ্ছে। হাঁস-মুরগি, মাছ ও পশু-পাখির দেহে প্রবেশ করছে বিষাক্ত ক্রোমিয়াম। আর এসব হাঁস-মুরগি ও মাছ খাওয়ার ফলে মানুষও মরণব্যাধি ক্যান্সারসহ নানা রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা থেকে যায় বলে চিকিত্সাবিদরা হুঁশিয়ার করে আসছেন। পাশাপাশি বিষাক্ত বর্জ্য পরিবেশও দূষণ করছে। এ বিষয়ে গণমাধ্যমে সচিত্র সংবাদও পরিবেশন করা হয়েছে।
ট্যানারির এ কঠিন বর্জ্য থেকে পরিবেশবান্ধব মূল্যবান প্রোটিন উত্পাদন করা যায়। যা অনেকেরই অজানা। এর ফলে পরিবেশও রক্ষা পায়। একদল বিজ্ঞানী দীর্ঘদিন গবেষণা চালিয়ে ট্যানারির কঠিন বর্জ্য থেকে পরিবেশবান্ধব মূল্যবান প্রোটিন উত্পাদন করার বিষয়টি বের করেছেন। বিসিএসআইআর-এর (সায়েন্স ল্যাবরেটরি) চামড়া গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আরিফুল হাই কাদেরি, ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. তুষার উদ্দিন ও মুর্শিদ জামান চৌধুরী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব লেদার ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজির সহকারী অধ্যাপক অমল কান্তি দেবের সমন্বয়ে বিজ্ঞানিরা দীর্ঘদিন হাজারীবাগ এলাকায় ট্যানারির কঠিন বর্জ্যের উপর গবেষণা চালান। গবেষণায় দেখা যায় যে, হাজারীবাগ এলাকায় হাঁস-মুরগি এবং মাছের খাবার উত্পাদনের একটি পদ্ধতি রয়েছে। এ পদ্ধতিতে ক্রোম সেভিং ডাস্ট থেকে পোল্ট্রি ফিড উত্পাদন করা হয়, যা পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। এ পদ্ধতিতে ক্রোম সেভিং ডাস্টকে সালফিউরিক এসিডের সাথে সিদ্ধ করে বাতাসে শুকানো হয়। পরে সেগুলোকে অন্যান্য উপাদানের সাথে মিশ্রিত করে হাঁস-মুরগির খাবার উত্পাদনে ব্যবহার করা হয়। সস্তা দামের জন্য ব্রয়লার ও মাছ উত্পাদকরা জনগণের স্বাস্থ্যের দিকটি অবজ্ঞা করে এ পদ্ধতিতে উত্পাদিত খাবার ব্যবহার করে। প্রোটিন হাইড্রোলাইসেট-এর উচ্চমূল্যই ব্যবসায়ীদের এ কাজে বাধ্য করে। বিভিন্ন পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে যে, উচ্চ তাপমাত্রায় ত্রি-যোজী ক্রোমিয়াম ষষ্ঠ-যোজী ক্রোমিয়ামে পরিণত হয় যা মানবদেহে ক্যান্সার সৃষ্টির প্রধান কারণ। সাধারণত পশু খাদ্য উত্পাদনের ১৫-২০ শতাংশ ব্যয়ই হয় প্রোটিন উপাদান সমূহের জন্য । পশু খাদ্য উপাদান সমূহের খরচ দিন দিন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং খাদ্য উপাদানসমূহের অল্প যোগানের জন্য দেশের হাঁস-মুরগির খাদ্য উত্পাদনের কারখানার ক্রমবৃদ্ধি দারুণভাবে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ক্রোম সেভিং ডাস্ট ব্যবহার করে বর্তমানে হাঁস-মুরগির খাবার তৈরির পদ্ধতি শুধু উত্পাদনকারীর স্বাস্থ্যের জন্যই ক্ষতিকারক নয় বরং আশেপাশের সাধারণ মানুষের জন্যও হুমকিস্বরূপ । কারণ সম্ভাব্য ক্যান্সার সৃষ্টিকারী ষষ্ঠ যোজী ক্রোমিয়াম পশু খাদ্যের মাধ্যমে ধীরে ধীরে হাঁস ও মুরগিতে ঢুকে যায় যা পরবর্তীতে খাদ্য শৃংখলের মধ্য দিয়ে মানুষের দেহে প্রবেশ করে । সম্প্রতি ক্রোম সেভিং ডাস্ট থেকে উল্লেখিত পদ্ধতিতে হাঁস-মুরগি ও মাছের খাবার উত্পাদন প্রক্রিয়ার উপর হাইকোর্ট থেকে আদেশ জারি করা হয়েছে।
বর্তমান সমীক্ষায় দেখা যায় যে, হাজারীবাগের আশপাশের এলাকার মাটির ক্রোমিয়াম দূষণের মাত্রা ৩৩ হাজার ৫০০ পিপিএম। চামড়া ট্যানিং-এর সময় চামড়ার তুলনায় অধিক পরিমাণে বাই প্রোডাক্ট ও বর্জ্য উত্পন্ন হয় । ১ টন ওয়েট সলটেড কাঁচা চামড়া থেকে ২০০ কেজি ফিনিশড চামড়া উত্পন্ন হয় । কিন্তু এখানে ৬০০ কেজির বেশি কঠিন বর্জ্য ও বাই প্রোডাক্ট উত্পন্ন হয়। এতে দেখা যায় যে, হাজারীবাগ থেকে বছরে ২০ হাজার টন কঠিন বর্জ্য ও বাই প্রোডাক্টস উত্পন্ন হয়। ক্রোম সেভিং ডাস্টকে কেমিক্যাল এবং বায়োকেমিক্যাল পদ্ধতিতে প্রক্রিয়াজাতকরণ করে কোলাজেন হাইড্রোলাইসেট তৈরি করা হয় ।
ল্যাবরেটরি পরীক্ষায় দেখা যায় যে, ১ কেজি ক্রোম সেভিং ডাস্ট থেকে প্রায় ১.৬০-১.৭০ কেজি কোলাজেন হাইড্রোলাইসেট পাওয়া যায়, যার ড্রাই কনটেন্ট ৫-৬%। প্রতি কেজি হাইড্রোলাইসেট বিশ্ববাজারে প্রায় ৪০০-৪৫০ টাকায় বিক্রি হয়। অধিকতর বিশুদ্ধ হাইড্রোলাইসেট প্রতি কেজি প্রায় ৪৫০০-৫০০০ টাকায় বিক্রি হয়। কাজেই ট্যানারির বিষাক্ত কঠিন বর্জ্য থেকে বায়োকেমিক্যাল পদ্ধতিতে প্রোটিন হাইড্রোলাইসেট বা কোলাজেন হাইড্রোলাইসেট তৈরির ফলে একদিকে যেমন মূল্যবান প্রোটিন প্রোডাক্ট উত্পাদনের সুযোগ সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে পরিবেশের ব্যাপক দূষণও সম্পূর্ণরূপে হ্রাস পাবে। ক্রোম সেভিং ডাস্ট সাধারণত ট্যানারির আশপাশে ফেলে রাখা হয়, ফলে এর বিষাক্ততার কারণে ধীরে ধীরে বায়ু, পানি ও মাটি দূষিত হয়ে পড়ে। বায়োকেমিক্যাল পদ্ধতি পরিবেশ বান্ধব হওয়ায় ঐ প্রক্রিয়ায় পরিবেশের কোন ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কোলাজেন হাইড্রোলাইসেট একটি পরিবেশ বান্ধব দ্রব্য যার ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। এটি প্রধানত প্রোটিনের উত্স যা প্রাণীর খাবার হিসেবে ব্যবহূত হয় । চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণেও এটি ব্যবহার করা যাবে । স্যু ইন্ডাষ্ট্রিতে স্যু পালিশ, এডহেসিভেও এটি ব্যবহার করা যেতে পারে। প্রোটিন হাইড্রোলাইসেট জৈব সার হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। কাইটোজেন এর সাথে কোলাজেন প্রোটিন মিশ্রিত করে মেডিক্যালে আহত রোগীর ড্রেসিং-এও ব্যবহার করা যায়। এ ছাড়া কোলাজেন হাইড্রোলাইসেট ফার্মাসিউটিক্যালস, ফুড এডিটিভস হিসেবেও ব্যবহার করা যেতে পারে। মোট কথা, এটি প্রোটিনের উত্স হিসেবে একটি সহজলভ্য ও মূল্যবান দ্রব্য যা একেবারেই ট্যানারির কঠিন বর্জ্য থেকে তৈরি হয় ।
চামড়া গবেষণা ইনস্টিটিউট, বিসিএসআইআর সর্বপ্রথম ট্যানারির সলিড ওয়েস্টকে ট্রিটমেন্ট করে বায়োকেমিক্যাল পদ্ধতিতে কোলাজেন হাইড্রোলাইসেট তৈরি করে। এটি আগামীতে সাভারে প্রস্তাবিত ট্যানারি ভিলেজে কঠিন বর্জ্য শোধনের একটি উল্লেখযোগ্য সমাধান হবে। গবেষণা থেকে প্রকাশিত ফলাফলটি ট্যানারির পরিত্যক্ত কঠিন বর্জ্য হতে প্রোটিন হাইড্রোলাইসেট তৈরির একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরিতে সহায়ক হবে।