ইত্তেফাক আমার কাছে শুধু সংবাদপত্র ছিল না। ইত্তেফাক পড়ে আমরা বুঝতাম কোন্ আদর্শে রাজনীতি করতে হবে। আন্দোলন-সংগ্রাম কোনদিকে ধাবিত হচ্ছে এটাও বোঝা যেত ইত্তেফাক পড়ার মাধ্যমে। ফলে সংবাদ পড়ার জন্য তো বটে, তার চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল, আমাদের মতো তত্কালীন তরুণ রাজনীতিকদের কাছে এটি ছিল একটি দিক-নির্দেশনার পত্র।
মনে পড়ে ষাটের দশকের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা। ওই সময় আমি কিশোরগঞ্জের গুরুদয়াল কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। সেখানে অনেক সময় ইত্তেফাক একদিন পরে পৌঁছাতো, কখনো রাতেও পাওয়া যেত। গভীর আগ্রহে থাকতাম, গণমুখী সাংবাদিকতার পথিকৃত্ ব্যক্তিত্ব তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া কি লিখেছেন তাঁর মুসাফির কলামে। ‘মুসাফির’ ছদ্মনামে তাঁর ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ কলামে নির্ভীক সত্য ভাষণ, অনন্য রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনা এবং গণমানুষের প্রতি ভালোবাসার কারণেই বাংলার মানুষের হূদয়ে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া অবিনশ্বর হয়ে রয়েছেন।
‘রাজনৈতিক ধোঁকাবাজি’, ‘রাজনৈতিক মঞ্চ’ আর ‘রঙ্গমঞ্চ’ শিরোনামে কলাম লিখে বাংলাদেশের মানুষকে স্বাধীনতাকামী করে তোলেন মানিক মিয়া। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্যের কথা সহজ ভাষায় তিনি মানুষের সামনে তুলে ধরেন। নীতির প্রশ্নে, বাংলার মানুষের অধিকারের বিষয়ে তিনি কখনো আপস করেননি। দৈনিক ইত্তেফাক ছিল তাঁর সেই সংগ্রামী জীবনের প্রধান হাতিয়ার। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশনা পেতাম সেদিনের ইত্তেফাকে।
স্পষ্ট মনে নেই, কবে থেকে ইত্তেফাক পড়া শুরু করেছি। তবে সেটি সম্ভবত ১৯৫৯ সালে। ওই বছর আমি ছাত্রলীগে যোগ দিয়েছিলাম। সেই থেকে যে ইত্তেফাক প্রতিদিনের জীবনের অংশেই পরিণত হয়েছিল, আজো তা অব্যাহত রয়েছে। এখন অনেক কাগজ। তবে সব কাগজ দেখার পরও কাগজ পড়ে যেন শেষ হয় না ইত্তেফাক না পড়ে। অনেকে হয়তো বলতে পারেন এটা অভ্যাস থেকে। তবে আমার মনে হয় অভ্যাসের বাইরেও এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে অনেক কিছু। কারণ ইত্তেফাকে তাকালে আমি বাংলাদেশ দেখতে পাই।
১৯৬১ সালে ছাত্র অবস্থায় আমি আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলাম। সেই সময় স্বাধীন বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নের কৌশল কিংবা নির্দেশনা পেতাম ইত্তেফাকে। ফলে আমাদের কাছে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির সঙ্গে দৈনিক ইত্তেফাকের নামটি জড়িয়ে আছে নানাভাবে, নানা সূতায়। বাংলাদেশে সাংবাদিকতার জগতে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া একটি অবিস্মরণীয় নাম। মানিক মিয়া প্রচলিত অর্থে শুধু একজন সাংবাদিক ছিলেন না বরং সাংবাদিকতার মাধ্যমে মানুষের মুক্তির পথ রচনার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁর আপসহীন মনোভাবের কারণে প্রতিক্রিয়াশীল পাকিস্তানি শাসকরা বার বার তাঁর কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে চেয়েছে। ‘দৈনিক ইত্তেফাকে’র ওপর বার বার নেমে এসেছে চরম বিপর্যয়।
বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে ‘দৈনিক ইত্তেফাক’ এক অসামান্য ভূমিকা পালন করেছিল। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার থেকে আপসহীনভাবে সত্য প্রকাশ করেছিল ইত্তেফাক। একসময় তদানীন্তন পাকিস্তান সামরিক সরকার দৈনিক ইত্তেফাকের প্রকাশনা বন্ধ করে দেয়। সে সময় সরকারের সঙ্গে আপস করলে তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া ইত্তেফাক প্রকাশনা অব্যাহত রাখতে পারতেন। কিন্তু তিনি এবং তার চেতনায় উদ্বুদ্ধ সাংবাদিক শ্রেণি জনমানুষের সংবাদপত্রের প্রতি যে বিশ্বাস তার সঙ্গে আপস করেননি। তিন বছর পত্রিকা প্রকাশ বন্ধ রেখেছিলেন। সামরিক জান্তা ও স্বৈরাচারী শাসকের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে নির্ভীক সাংবাদিকতার যে উদাহরণ দৈনিক ইত্তেফাক সৃষ্টি করে গেছে তা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল দৃষ্টান্ত।
রাষ্ট্রপতির সঙ্গে কথা বলে লেখাটি প্রস্তুত করেছেন দৈনিক ইত্তেফাকের ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আশিস সৈকত