বকশীবাজারে বিএনপি-ছাত্রদলের ওপর ছাত্রলীগের হামলা

 
 
 
 
দুর্নীতির দুই মামলায় বেগম খালেদা জিয়ার আদালতে হাজিরাকে কেন্দ্র করে রাজধানীর বকশিবাজারে বিএনপি নেতা-কর্মীদের সঙ্গে ছাত্রলীগ ও পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ছবি বিশ্বাসের ওপর হামলা ও তার গাড়িতে অগ্নি সংযোগের ঘটনাও ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ছোড়ার পাশাপাশি ব্যাপক লাঠিচার্জ করলে প্রায় অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হয়। পুলিশের উপস্থিতিতে স্থানীয় ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের ওপর ব্যাপক হামলা চালায়। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের লাঠি, রড ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। বিভিন্নস্থানে ছাত্রদলের অন্তত ১০ জন নেতা-কর্মীকে রাস্তার ওপর ফেলে দিয়ে রড ও লাঠি দিয়ে পেটোনো হয়েছে। দুপুর ১২টায় শুরু হয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা অব্যাহত থাকে।
সংঘর্ষে আহত সংসদ সদস্য ছবি বিশ্বাসসহ অন্তত ৩০ জন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া আহত ব্যক্তিদের মধ্যে যুবদল কেন্দ্রিয় কমিটির সাংগাঠনিক সম্পাদক আকম মোজাম্মেল হক (৪০), বর্ষা টোবাকোর বিক্রয় প্রতিনিধি মোহাম্মদ শাহীন (৩৫), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদল কর্মী আব্দুল জলিল (২৮), শামসুল আরেফিন (২৪), কবি নজরুল ইসলাম সরকারী কলেজের ছাত্রদল কর্মী ইমরান মীর (২৪), যুবদল দক্ষিণের সদস্য এমএন ইসলাম (৩৫), পুষ্টি বিজ্ঞান ইন্সটিটিউটের কর্মচারী মো: হাসান (৩০), ছাত্রদল কর্মী তানজিল হাসান (২৮), ঢাবি মহসিন হল ছাত্রদল শাখার সহ-সভাপতি ফরহাদ আহমেদ রাজন (৩০), শাহবাগ থানা মহিলা দলের সাধারণ সম্পাদক বিলকিস বেগম (৩৫), ছাত্রদল কর্মী মিলন রায় (২৬), নর্দাণ ইউনিভার্সিটির ছাত্রদল কর্মী এমএম ইমরান খান (২৫), ঢাবি শিক্ষার্থী সোহেল রানা (২০) ও ঢাকা মহানগর ছাত্রদল (উত্তর) সদস্য কাওসার (২৪) রয়েছেন।  
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, দুপুর ১২টার অনেক আগে থেকেই বকশিবাজার অস্থায়ী আদালত চত্বরের আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় অবস্থান নিতে শুরু করে বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। বিএনপি কর্মীদের অভিযোগ, ছাত্রলীগের কর্মীরা তাদের ওপর হামলা করলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। খালেদা জিয়া আদালতে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ আগে দুপুর ১২টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের ফজলে রাব্বী হলের মোড়ে সংঘর্ষ শুরু হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এলাকা থেকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা বিএনপির নেতাকর্মীদের ধাওয়া দেয়। এ সময় দুইপক্ষেই বৃষ্টির মতো ঢিল ছোড়াছুড়ি চলে। সড়কদ্বীপের গাছ ও বেড়া ভেঙে লাঠি বানিয়ে দুই পক্ষ মারামারিতে লিপ্ত হয়। মিনিট ১৫ সংঘর্ষ চলার পর লাঠি হাতে রাস্তায় নামে পুলিশ। সেই সঙ্গে শুরু হয় ফাঁকা গুলি ও টিয়ার শেল নিক্ষেপ। এক পর্যায়ে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ছাত্রদলের কয়েকজন কর্মীকে যাত্রাবাড়ী মেয়র হানিফ ফ্লাই ওভার ব্রিজের পলাশী প্রান্তের দিকে লাঠি ও রড নিয়ে হামলে পড়ে। এ পুলিশ বেশ কয়েকটি কাঁদানে গ্যাস সেল নিক্ষেপ করে। একপর্যায়ে বিএনপির নেতা-কর্মীদের একাংশ বুয়েট থেকে চানখাঁরপুলের রাস্তায় অবস্থান নেয়। সেখানে একটি মোটরসাইকেল পুড়িয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ নেতা-কর্মীরা। এসময় তারা রাস্তায় টায়ার জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করতে থাকে। তারা ঢাকা মেডিকেলের ফজলে রাব্বি হলের দিকে এগোলে পুলিশ সাঁজোয়া যান নিয়ে তাদের তাড়া করে সরিয়ে দেয়। পরে পুলিশের জল কামান থেকে পানি ছিটিয়ে নেভানো হয় মোটরসাইকেলের আগুন। পুলিশের টিয়ার শেলের গ্যাস এ সময়  ঢাকা মেডিকেলেও ছড়িয়ে পড়ে।
এরই মধ্যে ঐ এলাকা দিয়ে বকশীবাজারে আদালতের দিকে অগ্রসর হয় বেগম খালেদা জিয়ার গাড়ি বহর। এ সময় বিএনপির একদল কর্মীদের লাঠি হাতে গাড়ির সামনে সামনে এগোতে দেখা যায়। তাকে নিরাপত্তা দিতে সামনে পেছনে পুলিশের গাড়িও ছিল। খালেদা জিয়ার গাড়ি আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে আদালতের ফটকে পৌঁছালে বিএনপি ও ছাত্রদল কর্মীরাও ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করে। এ সময় পুলিশ আবার লাঠিপেটা করে শুরু করলে তারা দূরে সরে গিয়ে ঢিল ছুড়তে থাকে।
 
সংসদ সদস্য ছবি বিশ্বাসের ওপর হামলা, গাড়িতে আগুন:
দুপুর পৌনে ১টার দিকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ছবি বিশ্বাসের ওপর হামলা চালায় বিএনপি সর্মর্থকরা। বিএনপি নেতাকর্মীর লাঠির আঘাতে তার মাথা ফেটে যায়। পরে তাকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিয়ে চিকিত্সা দেয়া হয়। এ সময় তাকে বহনকারী মাইক্রোবাসে আগুন দেয়া হয়। হামলার পর রক্তাক্ত অবস্থায় এই সংসদ সদস্য হাসপাতালের পুলিশ ফাঁড়িতে আশ্রয় নেন।
ছবি বিশ্বাসের ভাষ্য, চিকিত্সার জন্য এক রোগীকে নিয়ে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আসেন তিনি। রোগী দেখানো শেষে চলে যাওয়ার সময় হাসপাতালের প্রধান ফটকের সামনে তার মাইক্রোবাসে বিএনপির নেতা-কর্মীরা এই হামলা চালান। গাড়ি থেকে বের হলে লাটিসোঁটা দিয়ে তাকে আঘাত করা হয়। এতে তার মাথা ফেটে রক্ত বের হয়। হামলাকারীরা গাড়িটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে সংসদ সদস্য ছবি বিশ্বাসের ওপর হামলা ও প্রাইভেটকারে আগুনের ঘটনায় আফজাল (২২) নামের এক যুবককে আটক করে দুই বছরের জেল দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সারোয়ার আলম এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, গাড়িতে আগুন দেয়ায় প্রচলিত আইনের ১৪৭ ধারায় তাকে দুই বছরের জেল দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। বর্তমানে আসামিকে শাহবাগ থানায় সোপর্দ করা হয়েছে। আফজালের বাবা ব্যবসায়ী আবুল হোসেন জানান, তার ছেলে যাত্রাবাড়ির দনিয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র। তার দাবি, আফজাল রাজনীতিতে জড়িত নয়। বন্ধুর সঙ্গে সে ঢাকা মেডিকেল এলাকায় গিয়েছিল।
পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ছাত্রলীগের কর্মীদের হামলার প্রেক্ষিতে বিএনপি ও ছাত্রদলের বেশকিছু নেতাকর্মী আহত হয়ে ও ধাওয়া খেয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আশ্রয় নেন। এসময় দুপুর ১২ টা ৫০ মিনিটের দিকে হাসপাতালের জরুরি বিভাগের গেটের সামনে সংসদ সদস্য ছবি বিশ্বাসের গাড়িতে লাঠিসোটা নিয়ে অতর্কিত হামলা চালায় একদল যুবক। গাড়ির ভেতরে ছিলেন ছবি বিশ্বাস, তার ব্যক্তিগত সহকারীসহ কয়েকজন। আত্মরক্ষার্থে তারা গাড়ি থেকে বের হয়ে নিরাপদে যাবার সময় হামলাকারীরা ছবি বিশ্বাসকে ঘিরে ধরে লাঠি দিয়ে আঘাত করে। তিনি রক্তাক্ত অবস্থায় লোকজনের সহায়তায় দৌড়ে গিয়ে হাসপাতালের পুলিশ ক্যাম্পে আশ্রয় নেন। হামলাকারীরা গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।এদিকে সংসদ সদস্যের উপর হামলা ও গাড়িতে অগ্নিসংযোগের পর পরই ছাত্রলীগ ও যুব লীগের একদল লাঠি হাতে হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রবেশ করে। এতে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে হাসপাতালে। এ সময় হাসপাতাল ক্যাম্পাসে তাদের পিটুনিতে কয়েকজন আহত হন। হামলাকারী সন্দেহে কয়েকজনকে ধরে পুলিশেও সোপর্দ করেন তারা। পুলিশ জানায়, এঘটনায় তারা ছয়জনকে আটক করেছে।