পরিবেশ ও বন মন্ত্রী এবং জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, শান্তিপূর্ণ অবস্থায় সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তর পদ্ধতি বহাল থাকলে উন্নয়ন নিশ্চিত হয়। আইন প্রয়োগে দুর্বলতা প্রতিকার পাওয়ার পথ রুদ্ধ করে। প্রশাসনের সমন্বয়হীনতার কারণে প্রধানমন্ত্রীর বরাদ্দকৃত অর্থ অপচয় হয়। তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার বিকালে পিরোজপুর জেলার ভাণ্ডারিয়া উপজেলার গৌরীপুর ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স ভবন প্রাঙ্গণে জাতীয় পার্টির (জেপি) ও অঙ্গসংগঠন আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে একথা বলেন।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু আরও বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয় সশস্ত্র যুদ্ধ ও গণ অভ্যুত্থানের প্রক্রিয়ায়। যে কারণে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতা হস্তান্তরসহ দেশ পরিচালনা করা পুরোনো মনমানসিকতা বা ধ্যান-ধারণায় সহজ নয়। এ কাজ দুরূহ হতে পারে কিন্তু অসাধ্য নয়। সাবেক হুকুম বহাল রাখার এই প্রক্রিয়ায় দেশ চালাতে গেলে এ কারণে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের সম্মুখীন হতে হয়। নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়াই শ্রেয়। আইন প্রয়োগে পৃষ্ঠপোষকতার অভাব, হস্তক্ষেপ তথা দুর্বলতায় ক্ষেত্র বিশেষে যে অবস্থার সৃষ্টি হয় তাতে আইন অমান্য করার মানসিকতা দেখা দেয়। আমাদের সমাজে বা দেশে জমি-জমা, পারিবারিক মতবিরোধ, সামাজিক কোন্দল, স্থানীয় রাজনীতি এবং জাতীয় রাজনীতির দ্বন্দ্ব-সংঘাত অনেক সময় খুনো-খুনিতে রূপ নেয়। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় যখন এই মারাত্মক অপরাধের বিচার পাওয়া যায় না। যা প্রকারান্তরে নতুন নতুন অপরাধকে উত্সাহিত করে। বিচার পাওয়া গেলে হত্যার মত ঘটনা ঘটার আশঙ্কা কম থাকত। পরিবেশ ও বন মন্ত্রী বলেন, যে পর্যন্ত আমরা সুশৃঙ্খল না হবো সে পর্যন্ত কোথায় কি হচ্ছে তার হিসাব পাওয়া সম্ভব নয়। আবার এ কারণে উন্নয়ন ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নিরূপণ করতে ব্যর্থতা দেখা দেয় এবং বরাদ্দকৃত সম্পদেরও অপচয় ঘটে। শৃঙ্খলার অভাবে আমরা যারা সরকারে আছি তারা কাজের প্রতি মনোযোগ দিতে পারি না। সব সময় অস্থিরতা-অনিশ্চিত অবস্থায় কাজে মনোযোগ দেয়া যায় না। সবখানে প্রতিযোগিতা থাকা অবাঞ্ছনীয় নয়, কিন্তু রেষারেষি-প্রতিহিংসা হিংস রূপ ধারণ করলে নিরাপত্তাহীন অবস্থায় উন্নয়ন ব্যাহত হয়। সেই জন্য আমাদের দেশে অনেক সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বৈরী পরিবেশের কারণে তা কাজে লাগাতে পারি না। আমরা ঝগড়া-ফ্যাসাদ করি, যা ধর্মেও কঠোরভাবে নিষেধ রয়েছে। তিনি বলেন, সরকারের প্রশাসনের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব থাকলে তা দূর করতে হবে। খাল খননের মত খুবই জনহিতকর কাজে দেখা যায় সরকারের পানি সম্পদ বিভাগ, কৃষি বিভাগ, এলজিইডি, ত্রাণ বিভাগ যে যেভাবে পারছে নিজ নিজ অবস্থান থেকে এলোপাতাড়ি কর্মসূচি গ্রহণ করছে। যার সমন্বয়হীনতা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা তথা সম্পদের সদ্ব্যবহারের ক্ষেত্রে নানা জটিলতার সৃষ্টি করছে। সমস্যা ছাড়া পৃথিবীর কোন দেশ নাই। যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের মত বড় দেশগুলোতেও বড় বড় সমস্যা রয়েছে। আমাদের সরকারে যারা রয়েছেন তারা সুস্থ ও ঠাণ্ডা মস্তিষ্কে কাজ করতে পারলে অবশ্যই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে।
আনোয়ার হোসেন আরও বলেন, দীর্ঘ ৩০ বছর ধরে সংসদে ও সরকারে থাকার অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, যারা মুরগী চুরির মত ছিঁচকে অপরাধ করেন, তাদের অপরাধ হরহামেশা আমলে আনা হচ্ছে, বিচার হচ্ছে, সাজা হচ্ছে। বড় বড় দুর্নীতি করে, ব্যাংকের টাকা লোপাট করে, আবার সরকারি সম্পত্তি আত্মসাত্ করে যখন বিচারের সম্মুখীন হন তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ আসে তাকে বলা হয় নৈতিক স্খলনজনিত অপরাধ। এই বৈপরিত্য কাম্য হতে পারে না। সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে যে যত্ সামান্য সরকারি আর্থিক অনুদানের ব্যবস্থা থাকে তা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে বিভিন্ন বিভাগ ও ব্যাংকে গিয়ে অশিক্ষিত জনগণ নানা হয়রানি ও শুভঙ্করের ফাঁকির কবলে পড়েন। এক মাত্র শিক্ষা ও সচেতনতা অর্জন মানুষকে এই বঞ্চনার হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। পাশাপাশি জনগণ ঐক্যবদ্ধ থাকলে তারা ন্যায্য হিস্যা আদায় করতে সক্ষম হয়।
জেপি’র উপজেলা যুগ্ম আহ্বায়ক ও ইউপি চেয়ারম্যান বদিউজ্জামান টিপুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব ও ভান্ডারিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান আতিকুল ইসলাম তালুকদার উজ্জল, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সহ-সম্পাদক মহিউদ্দিন মহারাজ ও গৌরীপুর পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোঃ শাহদাত হোসেন। এ সময় মঞ্চে উপবিষ্ট ছিলেন ভান্ডারিয়ার ইউএনও কাজী মাহবুবুর রশীদ, মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান আসমা বেগম, জাতীয় পার্টির (জেপি) কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব খলিলুর রহমান খলিল, ভান্ডারিয়া উপজেলা জেপি’র যুগ্ম আহ্বায়ক ও ভিটাবাড়িয়া ইউপি চেয়ারম্যান মশিউর রহমান মৃধা, স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তি সাবেক প্রধান শিক্ষক কাজী মোশাররফ হোসেন, এ্যাডভোকেট আব্দুল হালিম শরীফ, যুব সংহতির উপজেলা আহ্বায়ক শহীদুজ্জামান রাজু মল্লিক, ছাত্র সমাজের উপজেলা আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম শিমুল আকন, সদস্য সচিব সালাউদ্দিন রাহাত জোমাদ্দার প্রমুখ।
পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু পৈকখালী বাজার থেকে জমাদ্দারের হাট পর্যন্ত গৌরীপুর ড্রেনেজ উপ-প্রকল্পের আওতায় ঘোষের খালসহ আটটি খাল পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করেন। এলজিইডি’র অংশগ্রহণমূলক ক্ষুদ্রাকার পানিসম্পদ সেক্টর প্রকল্পের অধীনের এ কাজ উদ্বোধনের সময় পরিবেশ ও বন মন্ত্রী দোয়া ও মোনাজাত করেন। দুপুরের পর আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ভান্ডারিয়ার পোনা নদীর ভাঙ্গন রোধকল্পে বাস্তবায়নাধীন শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ কাজের অগ্রগতি পরিদর্শন করেন। এ সময় তাঁর সাথে ছিলেন জেপি’র উপজেলা আহ্বায়ক ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান মনিরুল হক মনি জোমাদ্দার, বরিশালের বন সংরক্ষক অবনীভূষণ ঠাকুর, ভান্ডারিয়ার ইউএনও কাজী মাহবুবুর রশীদ, পিরোজপুরের এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ রফিকুল হাসান, সহকারী বন সংরক্ষক হারুন অর রশীদ, উপজেলা প্রকৌশলী আব্দুল মান্নান, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকতা মতিউর রহমান প্রমুখ। দুপুরে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ভান্ডারিয়ার বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব মরহুম নূরুল হক জোমাদ্দারের জেয়াফত ও দোয়া-মাহফিলে শরিক হন এবং মোনাজাত করেন। এখানে মরহুমের ছোট ভাই মনিরুল হক মনি জোমাদ্দার, ছেলে সদর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান গোলাম সরওয়ার জোমাদ্দার ও ইত্তেফাকের উপ-প্রধান হিসাব রক্ষক গোলাম আকতার, নদমূলা ইউপি চেয়ারম্যান শফিকুল কবির তালুকদার বাবুল, উপজেলা জেপি’র সদস্য সচিব ও ধাওয়া ইউপি চেয়ারম্যান সিদ্দিকুর রহমান টুলু, কেন্দ্রীয় জেপি নেতা ইউসুফ আলী আকন, আবুল কালাম পোদ্দার, টুঙ্গীপাড়া আওয়ামী লীগের নেতা হাফিজুর রশীদ তারিক জোমাদ্দার প্রমুখ মন্ত্রীকে স্বাগত জানান।