ভোটার তালিকায় এবার ভারতীয়রা

রোহিঙ্গাদের পর এবার ভারতীয় নাগরিকরা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হচ্ছে। বিদেশি নাগরিকদের বাংলাদেশের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির ঘটনা অস্বস্তিতে ফেলছে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি)। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণে সংশ্লিষ্টদের ইসি নির্দেশ দিয়েছে।

গত জুলাইয়ে ভারতীয় পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশে এসে দেশটির তিন নাগরিক ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করে। চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের আগেই ওই তিন ভারতীয় নাগরিকের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ঢাকা আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও সংশোধনকারী কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে কমিশন। রোহিঙ্গাদের মতো বহু ভারতীয় নাগরিক ইতিমধ্যে ভোটার তালিকায় নাম লিখিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। একটি অসাধু চক্রের সহযোগিতায় এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে বলে জানা গেছে।
গত বুধবার ঢাকা আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা ও সংশোধনকারী কর্তৃপক্ষকে পাঠানো ইসির সহকারী সচিব রৌশন আরা বেগম স্বাক্ষরিত এক নির্দেশনায় বলা হয়, চলমান ভোটার তালিকা হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় ঢাকা মহানগরীর সুত্রাপুর থানার ৪৮ নম্বর নর্থব্রুক হল রোডের ঠিকানায় তিন ভারতীয় নাগরিক ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্তির প্রক্রিয়া চালাচ্ছেন মর্মে জনৈক বিষ্ণুপদ দাসসহ বেশ কয়েকজন অভিযোগ করেছেন। আগামী ২ জানুয়ারি খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর উল্লিখিত অভিযোগের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো।
অ্যাডভোকেট বিষ্ণুপদ দাস তার অভিযোগে বলেন, ‘কিছু বিদেশি নাগরিক রাজধানীর সুত্রাপুর থানার ৪৮ নর্থব্রুক হল রোডে চলমান হালনাগাদ ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। হালনাগাদ ভোটার তালিকা পর্যবেক্ষণ করতে গিয়ে জানা যায়, তিনজন ভারতীয় নাগরিক (জন্মসূত্রে)  ভারতীয় পাসপোর্ট নিয়ে গত জুলাই মাসে ঢাকাতে প্রবেশ করেন। তারা পরিবার-পরিজন নিয়ে স্থায়ীভাবে ভারতে বসবাস করেন। কিন্তু তারা চলমান হালনাগাদ ভোটার তালিকায় সুকৌশলে নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন যা বে-আইনি, অবৈধ এবং ফৌজদারী আইনে দণ্ডনীয় অপরাধের সামিল।’
ভারতীয় তিন নাগরিক হলেন
অভিজিত চৌধুরী, পিতা-মৃত রথিন্দ্র কৃষ্ণ চৌধুরী, মাতা- মৃত অঞ্জলী চৌধুরী, ফ্ল্যাট নম্বর-২৩, ২৩ কে, কে, মজুমদার রোড, পো: সন্তোষপুর, থানা-পূর্ব যাদবপুর কলকাতা-৭০০০৭৫। তার ভারতীয় পাসপোর্ট নম্বর-জি৯৮৬৩৮৭১। কুন্তল চৌধুরী, পিতা-মৃত সত্যেন চৌধুরী, মাতা-মিনতি চৌধুরী, ১৪৪-১৪ অমর চক্রবর্তী রোড, পো: খাগড়া, খানা-বহরমপুর, জেলা-মুর্শিদাবাদ। পাসপোর্ট নম্বর এইচ১৪৭১৩৩৫। অনিশেষ চৌধুরী, পিতা-মৃত সুব্রমন্য কৃষ্ণ চৌধুরী, মাতা-মৃত প্রভা চৌধুরী, ০৯ নম্বর তেলঘরিয়া লেন, পো: খাগড়া, থানা- বহরমপুর। তার পাসপোর্ট নম্ব্বর ই৭৪৫৪৮৬৮।
ভারতীয় নাগরিক অন্তর্ভুক্তি নতুন নয়
এর আগে চুয়াডাঙ্গার হরিপ্রদাস ওরফে মণ্ডল এবং ঢাকা জেলার ডেমরার এমএ বাশার মনিরের করা অভিযোগের ভিত্তিতে ইসি ভোটার তালিকায় কয়েকজন ভারতীয় নাগরিকের খোঁজ পায়। পরে তাদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিতে নির্দেশ দেয় ইসি।
হরিপ্রদাসের অভিযোগে বলা হয়, ‘ঢাকার গুলশানের বাসিন্দা রাজকুমার ও তার স্ত্রী অঞ্জলি, ছেলে রাজকুমার, জিতেন্দ্র কুমার এবং মেয়ে সোনিয়া আগরওয়ালা, বাংলাদেশ এবং ভারতের নাগরিক। তাদের বাংলাদেশের ঠিকানা- বাসা নং-৩০, ফ্ল্যাট নং-৩ এস, রোড নং-১১৮, গুলশান-১। ভারতের ঠিকানা, বাড়ি নং-৬৭, ফ্ল্যাট নং-ডি-৫ পার্ক স্ট্রিট কলকাতা। অভিযোগে বাংলাদেশ ও ভারতের ভোটার আইডি নম্বর তুলে ধরেন তিনি।
ডেমরার এমএ বাশার মনির তার অভিযোগে বলেছেন, ‘ভারতীয় নাগরিক জনৈক রাণী কুমার ঘোষ, পিতা-মৃত হিরালাল ঘোষ, মাতা- বীনাপাণী ঘোষ। ভারতে তার স্থায়ী ঠিকানা- বাড়ি নং-৭, বিরাটি শিবাচয়, কলকাতা। তিনি ভারতীয় নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশের রূপগঞ্জে ভোটার হওয়ার চেষ্টা করছেন। এর আগে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার ভোটার তালিকায় ভারতের এক বাসিন্দার সন্ধান পায় ইসি। পরে কীভাবে ভারতীয় নাগরিক ভোটার তালিকায় এলো সে বিষয়ে তদন্ত নামে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একই অভিযোগ
স্থানীয় জনপ্রতিনিধির সহায়তায় বিদেশি নাগরিকরা সুকৌশলে ভোটার তালিকায় প্রবেশ করছেন বলে গত ২৩ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ইসিতে অভিযোগ করেছেন। তারপরও ইসি কঠোর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে পাঠানো ওই অভিযোগে বিদেশি নাগরিকদের ভোটার করতে সহায়তা করছেন এমন জনপ্রতিনিধিদের নামও রয়েছেন। ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘ভোটার তালিকা হালনাগাদ কার্যক্রমে কক্সবাজার ও বান্দরবান জেলায় ৪৩৮ জন রোহিঙ্গা অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। আর এতে সহযোগিতা করেছেন মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী কক্সবাজারের স্থানীয় একজন সংসদ সদস্যসহ ৫১ জনপ্রতিনিধি।’
ব্যবস্থা না নেয়ায় বার বার বিদেশিরা ভোটার তালিকায়
কমিশনের সংশ্লিষ্টরা জানান, যেসব জনপ্রতিনিধি বিদেশি নাগরিকদের ভোটার করতে বিভিন্নভাবে সহায়তা করছেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় ভোটার তালিকায় বারবার বিদেশি নাগরিক প্রবেশ করছেন। বিদেশি নাগরিক ও রোহিঙ্গাদের ঠেকাতে ১৪টি উপজেলাকে বিশেষ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করার পরও ইসি বিদেশি নাগরিকদের ঠেকাতে ব্যর্থ হচ্ছে। এছাড়াও সম্প্রতি একটি গোয়েন্দা সংস্থা ইসিকে জানিয়েছে, রোহিঙ্গা ও বিদেশিদের জাতীয়তা এবং জন্ম সনদ প্রদানকারী জনপ্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত মন্ত্রিসভায় গৃহিত হলেও এর সঠিক বাস্তবায়ন হয়নি।

ইসির কর্মকর্তারা জানান, জনপ্রতিনিধিদের ব্যাপারে নির্বাচন কমিশনে বার বার অভিযোগ এলেও ইসি দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা নেয়নি বরং সংশ্লিষ্ট জেলাতে দু’-একটা চিঠি দিয়েই দায় সেরেছেন। ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা থেকে রোহিঙ্গাসহ বিদেশি নাগরিকদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে জনপ্রতিনিধিরা সহযোগিতা করছেন মর্মে একাধিকবার অভিযোগ এসেছে। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। আর এ কারণেই ভোটার তালিকায় বিদেশি নাগরিকদের প্রবেশ ঠেকানো যাচ্ছে না।’