কী হতে যাচ্ছে গাজীপুরে: উত্কণ্ঠায় মানুষ, ১৪৪ ধারা জারি

 
 
 
 
 
এক দিকে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জনসভার ঘোষণা, অন্যদিকে ছাত্রলীগেরও বিক্ষোভ সমাবেশের ঘোষণা। একই স্থানে একই সময় দুই পক্ষের কর্মসূচি পালনের ঘোষণার প্রেক্ষিতে জনসভাস্থলে শনিবার বেলা ২টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ১৪৪ ধারা জারি করেছে প্রশাসন। তবু কর্মসূচি পালনে অনড় দুই পক্ষ। দুই পক্ষই পরস্পরকে প্রতিহত করার হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে গাজীপুরের সঙ্গে পুরো দেশবাসীই এখন উদ্বিগ্ন— কী হতে যাচ্ছে গাজীপুরে?
সংশ্লিষ্টরা বলনে, গাজীপুর জেলা শহরের ভাওয়াল বদরে আলম সরকা‍রি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ মাঠে জনসভা আয়োজনের জন্য মাঠ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে বিএনপি সমাবেশের কাজ শুরু করলেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও জেলা প্রশাসন অনুমতি দেয়নি। আর ছাত্রলীগও অনুমতির আবেদন করে সমাবেশের কাজ করছে। দুই পক্ষেরই একই স্থানে একই সময় সমাবেশের প্রস্তুতির প্রেক্ষিতে সৃষ্টি হয়েছে এক শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি।
বৃহস্পতিবার এক অনুষ্ঠানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, ‘কলেজ মাঠে সমাবেশ করতে না দিলে রাজপথে ব্যারিকেড দিয়ে সমাবেশ করা হবে।’ এ বক্তব্যের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই শুক্রবার সকাল ৬টার দিকে ৭৭/৭ নম্বর সিদ্ধেশ্বরী সার্কুলার রোডের এ আর ভবনের একটি বাসা থেকে গয়েশ্বর চন্দ্রকে আটক করে নিয়ে যায় গোয়েন্দা পুলিশ। একই দিন তাকে আদালতে হাজির করে তিন দিনের রিমান্ডেও নিয়েছে পুলিশ। এ দিকে, সমাবেশস্থলে ১৪৪ ধারা জারিকে পরিকল্পিত বলে দাবি করেছে বিএনপি। সব মিলিয়ে শুধু গাজীপুরবাসী নয়, উদ্বেগে রয়েছেন দেশবাসীও। 
গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ বলেন, শনিবার ভাওয়াল কলেজ মাঠে কাউকে সমাবেশ করার অনুমতি দেয়া হয়নি। তাই কোনো সমাবেশ হবে না সেখানে। কেউ আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর চেষ্টা করলে তাত্ক্ষণিকভাবে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেয়া হবে। এরই মধ্যে জনসভাস্থলে ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী প্রস্তুত আছে বলেও জানান পুলিশ সুপার।
গাজীপুরের জেলা প্রশাসক মো. নুরুল ইসলাম জানান, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে গাজীপুর জেলা প্রশাসন প্রস্তুত রয়েছে।
এ দিকে, গয়েশ্বর চন্দ্রর পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছে— বৃহস্পতিবার রাত আটটার দিকেও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা গয়েশ্বরের ধানমন্ডির বাসায় তল্লাশি চালায়। এ সময় তাকে সেখানে পাওয়া যায়নি। সিদ্ধেশ্বরী সার্কুলার রোডের যে বাসা থেকে তাকে আটক কর‍া হয়েছে, সেটি তার বন্ধু ও বিএনপি কর্মী কালামের বাসা বলে জানান গয়েশ্বরের মেয়ে অপর্ণা রায়।
শুক্রবার গয়েশ্বরকে আদালতে তোলা হলে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। বিকালে শুনানি শেষে এ রিমান্ড মঞ্জুর করেন ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তসরুজ্জামান। এর আগে বিকাল তিনটায় গয়েশ্বরকে আদালতে হাজির করে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন জানান শাহবাগ থানার পুলিশ কর্মকর্তা হাফিজ উদ্দিন।
বুধবার রাজধানীর বকশীবাজার এলাকায় হামলা, গাড়ি ভাঙচুর, পুলিশের কাজে বাধাদান ও এমপি ছবি বিশ্বাসকে হত্যার উদ্দেশ্যে হামলার অভিযোগে শাহবাগ থানায় দায়ের মামলায় (নম্বর-৩৩)  গয়েশ্বর রায়কে গ্রেফতার করে ডিবি পুলিশ। পরে তাকে ডিবি কার্যালয়ে রাখা হয়। সেখান থেকে বিকাল ৩টায় আদালতে হাজির করা হয়।
এ দিকে, গয়েশ্বরকে গ্রেফতার এবং বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে ‘মিথ্যা’ মামলা দায়ের, বাসায় তল্লাশির ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া। শুক্রবার সকালে দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ স্বাক্ষরিত প্রতিবাদ বিবৃতিটি সংবাদমাধ্যমে পাঠানো হয়। এতে বিএনপি চেয়ারপার্সন বলেন, ‘বর্তমান ভোটারবিহীন সরকার এখন শেষ মরণকামড় দেয়ার জন্য বিএনপি নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-পীড়নের তীব্রতা বৃদ্ধি করেছে। সেই প্রতিহিংসার সর্বশেষ বহিঃপ্রকাশ ঘটল বিএনপি জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়কে গ্রেফতারের মধ্য দিয়ে।’
অপর দিকে, খালেদা জিয়ার জনসভার দিন গাজীপুরে ১৪৪ ধারা জারির সিদ্ধান্ত ‘পূর্বপরিকল্পিত’ বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি। গাজীপুর জেলা প্রশাসন শুক্রবার দুপুর থেকে জেলায় সব ধরনের সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ করার পর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাত্ক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এ কথা বলেন। তিনি বলেন, ‘শনিবার বেলা ২টায় গাজীপুরে ২০ দলীয় জোটের জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বেগম খালেদা জিয়ার ভাষণ দেয়া কথা। এই জনসভা বানচাল করতেই সরকার পূর্বপরিকল্পনার অংশ হিসেবে ১৪৪ ধারা জারি করেছে।’
গাজীপুরে সভা সমাবেশে নিষেজ্ঞা জারি হওয়ার পর করণীয় ঠিক করতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সিনিয়র নেতাদের জরুরি বৈঠকে ডাকা হয়েছে। দলের যুগ্ম মহাসচিব ও দপ্তর সম্পাদক রুহুল কবীর রিজভী সাংবাদিকদের জানান— শুক্রবার রাত সোয়া ৮টায় গুলশানে বিএনপি চেয়ারপাসনের কার্যালয়ে এই বৈঠক শুরু হয়েছে।  
আমাদের গাজীপুর প্রতিনিধি জানান— গাজীপুরে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার জনসভাস্থল ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ মাঠ ও আশপাশের এলাকায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়েছে। গাজীপুরের জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শুক্রবার বেলা দেড়টার দিকে এ নিষেধাজ্ঞা জারি করেন জেলা প্রশাসক মো. নূরুল ইসলাম।
স্থানীয় জেলা প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করলেও মহানগরবাসীর মধ্যে উদ্বেগ, উত্কণ্ঠা এখনো কাটেনি। তারা আজ শনিবার সম্ভাব্য সহিংসতার আশঙ্কা করছেন। দুপুর পর্যন্ত আওয়ামী লীগ, বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীসহ অসংখ্য সাধারণ মানুষের কলেজ মাঠ এলাকায় ভিড় করে। গণ মাধ্যম কর্মীদেরও ব্যাপক তত্পরতা লক্ষ্য করা গেছে।
শুক্রবার বেলা পৌনে ২টার দিকে গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ ভাওয়াল বদরে আলম সরকারি কলেজ মাঠে এসে সাংবাদিকদের জানান, ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ঘোষণা দিয়েছেন তারেক রহমান বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যে কটূক্তি করেছে তার জন্য তিনি ক্ষমা না চাইলে এবং বক্তব্য প্রত্যাহার না করলে গাজীপুরের যেখানে খালেদা জিয়া সভা সমাবেশ করবেন, সেখানেই তারা বাধা দেবে। সে ক্ষেত্রে আমরা আইন-শৃঙ্খলার অবনতি হতে পারে বলে কোথাও সমাবেশ করতে দিতে পারি না। এ জন্য উভয় পক্ষই কোথাও কোনো সমাবেশ করতে পারবে না।’
এ দিকে, শুক্রবার সকাল থেকেই ছাত্রলীগ, যুবলীগ, শ্রমিকলীগ, কৃষকলীগ, যুব আওয়ামী মহিলা লীগের নেতা-কর্মীরা কয়েক দফা মিছিল বের করে। তারা মিছিল সহকারে জনসভাস্থল ভাওয়াল বদরে আলম কলেজ মাঠে প্রবেশের চেষ্টা করেন। পুলিশ তাদের কাউকে মাঠের ভেতরে প্রবেশ করতে দেয়নি। এ সময় নেতা-কর্মীরা কলেজ গেটের সামনে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে অবস্থান করে মিছিল নিয়ে চলে যায়।
এ দিকে, শুক্রবার সকাল থেকে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী চান্দনা চৌরাস্তার আশপাশের এলাকায় অবস্থান নেয়। পুলিশের ব্যাপক তত্পরতা, গ্রেফতার আতংক ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের সতর্ক প্রহরার কারণে তারা জনসভার মাঠ অভিমুখে যেতে পারেনি।
সদর থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সুরুজ আহমেদ বলেন, ‘ছাত্রলীগ পুলিশের সহযোগিতা নিয়ে জনসভার মাঠ দখল করে রেখেছে। বিএনপির নেতা-কর্মীরা ইচ্ছে করলে যে কোনো মুহূর্তে মাঠে প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের নির্দেশনা না থাকায় আমরা জনসভা ময়দান অভিমুখী এগিয়ে যাইনি।’
বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক ডা. মাজহারুল আলম বলেন, ‘গত বৃহস্পতিবার রাতে তার বাসাসহ পৌর বিএনপির সভাপতি মীর হালিমজ্জামান ননী, জেলা জাসাস সভাপতি সৈয়দ হাসান সোহেলসহ বিএনপি এবং এর অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের বাসায় পুলিশ অভিযান চালিয়েছে। রাতে পুলিশ জেলা যুবদলের সিনিয়র সহসভাপতি প্রভাষক বশির উদ্দিন, পূবাইল ইউনিয়ন যুবদল সভাপতি হারুন অর রশিদ, ভাওয়াল বদরে আলম কলেজ শাখার সদস্য আলমগীর হোসেন, শিশির চৌধুরীকে আটক করে নিয়ে গেছে।’
জয়দেবপুর থানার ওসি খন্দকার রেজাউল হাসান রেজা জানান— নাশকতা ও বিশৃঙ্খলা পরিকল্পনার অভিযোগে জয়দেবপুর থানার বিভিন্ন এলাকা থেকে বুধবার ও বৃহস্পতিবার বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের ছয় কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধেও আগেই নাশকতাসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা রয়েছে। একই অভিযোগে বৃহস্পতিবার রাতে টঙ্গী বিএনপির কর্মী ইজ্জত আলী ও রনি মিয়াকে আটক করেছে পুলিশ।’
গাজীপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকট আজমত উল্লাহ খান বলেন, ‘বিএনপির কিছু নেতা বলেছেন, ‘আমাদের ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের তারা রাজপথে পিটাবে। আমরা আমাদের ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের রক্ষা করতে তাদের পাশে এসে দাঁড়িয়েছি। বিএনপির জনসভার তারিখ ছিল ২৩ ডিসেম্বর। ছাত্রলীগ আগেই ২৭ ডিসেম্বরে সমাবেশের ঘোষণা দিয়ে রেখেছিল।’
আমাদের টঙ্গী (গাজীপুর) সংবাদদাতা জানান— টঙ্গীতে ২০ দলীয় জোটের নেতা-কর্মীদের বাসা বাড়িতে গত বৃহস্পতিবার রাতভর ব্যাপক তল্লাশি চালিয়েছে আইন-শৃংখলা বাহিনীর সদস্যরা। পুলিশ রাত পৌন ২টায় গাজীপুর জেলা যুবদলের সিনিয়র সহসভাপতি বাসির উদ্দিন আহমেদের টঙ্গীর আউচপাড়ার বাড়ি ঘেরাও করে। এ সময় বাসা থেকে বসির উদ্দিন ও কলেজ গেট এলাকা থেকে মিন্টু ও মুন্নাকে গ্রেফতার করে।
টঙ্গী থানা বিএনপির সভাপতি এস এম শাহান শাহ আলম ও সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম শুক্কুর জানান— পুলিশ ২০ দলীয় জোটের নেতা-কর্মীদের তালিকা হাতে নিয়ে বাড়িতে বাড়িতে হানা দিচ্ছে।