পদ্মা শুকিয়ে মরুভূমি শুষ্ক মৌসুমের আগেই

দিগন্তরেখা অতিক্রম করেছে ধু ধু বালুচর, গোদাগাড়ীতে বাংলাদেশে প্রবেশস্থলে পায়ের গোড়ালি সমান পানি, এখানে গতিপথ পরিবর্তন হয়ে ফের চলে গেছে ভারতীয় ভূ-খণ্ডে

শুষ্ক মৌসুম আসতে এখনো বাকি অনেক দিন। কিন্তু এরই মাঝে পানি শুকিয়ে ধু ধু বালুর মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে একসময়ের ক্ষরস্রোতা পদ্মা। পদ্মার প্রবেশদ্বার রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলায় বাংলাদেশি ভূখণ্ডে পদ্মায় পানি নেই বললেই চলে। নদীর গতিপথ পরিবর্তন হয়ে পদ্মা চলে গেছে ফের ভারতীয় ভূখণ্ডের মধ্যে। বাংলাদেশের অংশে কিছু কিছু এলাকায় পায়ের গোড়ালি সমান পানিতে পায়ে হেঁটে নদী পার হচ্ছেন চরাঞ্চলের মানুষেরা। বেশিরভাগ ধু ধু বালুচরে চলছে গরুর গাড়ি। আর পানি না থাকায় নদীতে মাছ ধরতে না পেরে মানবেতর জীবনযাপন করছে পদ্মা পাড়ের জেলে পরিবারগুলো।
বাংলাদেশের সীমান্ত থেকে মাত্র ১৮ কিলোমিটার দূরে ভারতের মনোহরপুরে ১৯৭৫ সালে মরণফাঁদ ফারাক্কা বাঁধ গড়ে তোলা হয়। এর প্রভাবেই পদ্মা এখন ধু ধু বালুচরে পরিণত হয়েছে। ভারতের গঙ্গা রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলা ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার কিছু অংশ দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে পদ্মা নাম ধারণ করেছে। মরণফাঁদ ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে বছরের অধিকাংশ সময় এখন পদ্মার বুকে থাকে না বিস্তৃত সেই জলধারা, পালতোলা নৌকা আর মাঝি-মাল্লাদের গান। পদ্মার প্রবেশদ্বারেই যতদূর চোখ যায়, কেবলই ধু ধু বালুচর। শুষ্ক মৌসুমের আগেই পদ্মায় নৌকা চলাচলের পথ রুদ্ধ হওয়ায় মাইলের পর মাইল পায়ে হেঁটে বালুচর পাড়ি দিয়ে গন্তব্য পৌঁছাতে হচ্ছে গোদাগাড়ীর বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের মানুষকে। আর মালামাল পরিবহনে দরকার পড়ছে গরুর গাড়ি।
উজান থেকে আসছে না পানি
ফারাক্কা চুক্তি অনুযায়ী প্রতি বছর পহেলা জানুয়ারি থেকে ৩১ মে পর্যন্ত ভারত বাংলাদেশকে ৩৫ হাজার কিউসেক পানি দেয়ার কথা। শুষ্ক মৌসুমের এই সময়টিতে ভারত বাংলাদেশকে চুক্তি অনুযায়ী পানি প্রদান করলে পদ্মায় অন্তত পানি প্রবাহ থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন– যা পদ্মার বর্তমান পরিণতি প্রমাণ করে চলেছে। গত নভেম্বরের প্রথম থেকেই পদ্মায় পনির প্রবাহ একেবারেই কমে গেছে। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৮ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পদ্মায় সর্বোচ্চ পানির গভীরতা রেকর্ড করা হয় ২৪ দশমিক ১৪ মিটার। গত কয়েক বছর থেকে পদ্মায় পানির গভীরতা ১৩ থেকে ১৪ মিটারে ওঠানামা করে। তবে এক দশক পর গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর রাজশাহী অঞ্চলে পদ্মার পানি প্রবাহ রেকর্ড করা হয় বিপদসীমার ১২ সেন্টিমিটার ওপরে ১৮ দশমিক ৬২ মিটারে। ভরা মৌসুমে চলতি বছরের গত ২২ আগস্ট পদ্মায় সর্বোচ্চ পানির গভীরতা রেকর্ড করা হয় ১৭ দশমিক ৪৫ মিটার। এর আগে গত ১৫ মে পানির গভীরতা ছিলো ৯ দশমিক ৩৪ মিটার। গত ২২ আগস্টের পর থেকেই পদ্মার পানি প্রবাহ ক্রমাগত কমে আসতে আসতে বর্তমানে ধু ধু বালুচরের মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। পদ্মার গর্ভে কিছু কিছু স্থানে স্রোতবিহীন অগভীর নীরব-নিথর ছোট ছোট ‘কূপ’ রয়েছে।
জেলে পরিবারে হাহাকার
পদ্মা নদীতে পানি নেই, মাছ নেই। রাজশাহী অঞ্চলের হাজার হাজার জেলেরা বেকার। হাহাকার চলছে তাদের পরিবারে। খেয়ে না খেয়ে দিন পার করছেন জেলেরা। অনেকে বাধ্য হয়ে বাপ-দাদার হাজার বছরের পুরনো পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। বয়োজ্যেষ্ঠ জেলে গোদাগাড়ীর সেখেরপাড়া গ্রামের সাজ্জাদ আলী ভাদু বলেন, পদ্মার সেই দিন আর নেই। একটা সময় ছিলো যখন নদীতে জাল ফেললেই মাছের ভারে নৌকা নুয়ে পড়তো। সেসব প্রায় তিন চার দশক আগের কথা। যে মাছ পাওয়া যেত তা দিয়ে জেলেদের সংসার খুব ভালোভাবেই চলতো। এখন নদীতে পানিই নেই, মাছ আসবে কোত্থেকে?
নিচে নামছে ভূ-গর্ভস্থ
পানির স্তর: ফারাক্কার অভিশাপে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৯ ফুট উঁচুতে অবস্থিত রাজশাহীর গোদাগাড়ীসহ সমগ্র বরেন্দ্র অঞ্চলে ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিনিয়ত নিচে নামছে। অগভীর নলকূপ থেকে পানি উঠছে না। সরকারি গবেষণায় দেখা গেছে, বরেন্দ্র অঞ্চলে প্রতিবছর ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর স্থানভেদে ১-২ ফুট পর্যন্ত নিচে নেমে যাচ্ছে। এরমধ্যে ২০১০ সালে বরেন্দ্র অঞ্চল হিসেবে খ্যাত গোদাগাড়ী এলাকায় পানির স্তর ছিলো মাটির ১৯ ফুট গভীরে। ২০১১ সালে স্থানভেদে ১৯-২১ ফুট। ২০১২ সালে ২০-২৩ ফুট এবং ২০১৩ সালে পানির স্তর ছিল স্থানভেদে ২৩-২৫ ফুট এবং চলতি বছরের জুনে পানির স্তর ছিলো মাটির ২৬ দশমিক ৫ ফুট গভীরে। এ অবস্থা চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে গোদাগাড়ীসহ সমগ্র বরেন্দ্র অঞ্চল মরুভূমিতে পরিণত  হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রভাব পড়ছে কৃষিখাতে
ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিনিয়ত নিচে নেমে যাওয়ায় এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে কৃষিখাতে। জানুয়ারি-মে মাসে কৃষিখাতে পানির ব্যবহার সবচেয়ে বেশি। আর এই সময়েই ফারাক্কা চুক্তির কারণে বাংলাদেশ চাহিদা মতো পানি পাচ্ছে না। তাই কৃষি কাজ পুরোপুরি ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপরে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। গোদাগাড়ীতে রয়েছে এক হাজার ৪৩৩টি গভীর নলকূপ। কৃষি কাজের মৌসুমে ভূ-উপরস্থ পানির যোগান না থাকায় এই গভীর নলকূপগুলো অবিরাম ভূ-গর্ভস্থ পানি তুলে যাচ্ছে। সে অনুপাতে বৃষ্টিপাতও হচ্ছে না। এতে ভূ-গর্ভস্থ পানির রি-ফিল বা রিচার্জ হচ্ছে না। প্রতিনিয়তই মাটির আদ্রতা কমে যাওয়ায় এর প্রভাব পড়ছে কৃষিখাতে। বাধ্য হয়ে বরেন্দ্র অঞ্চলে খাল খনন করে ভরা মৌসুমে পদ্মা থেকে ভূ-উপরস্থ পানি তুলে খালে সংরক্ষণ করে সারা বছর ব্যবহারের চেষ্টা করছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)।
পদ্মার ড্রেজিং হয়নি কোনদিন
ওপার থেকে চাহিদামতো পানি আসছে না। ভূ-গর্ভস্থ পানির স্তর প্রতিনিয়ত নিচে নামছে। এরপরও পদ্মা নদী ড্রেজিং হয়নি কোনদিন। একটি বেসরকারি সংস্থার নিজস্ব জরিপে প্রকাশ করা হয়েছে, পদ্মায় পানি না থাকার প্রধান কারণ ফারাক্কা বাঁধ। আর অন্যতম কারণ, ভরা মৌসুমে পদ্মার দু’পাড় ভেঙে যে নাব্যতা হারায় সে অনুপাতে ড্রেজিং করানো হয় না। পদ্মায় পানি প্রবাহ নিশ্চিতে নদী ড্রেজিংয়ের কোন বিকল্প নেই বলেও প্রতিবেদনটিতে উল্লে­খ করা হয়েছে।
সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নেই

প্রতিনিয়ত মরুকরণের দিকে ধাবিত হচ্ছে উত্তরাঞ্চল। তবু সমস্যা সমাধানের কোন উদ্যোগ নেই। ফারাক্কা চুক্তিতে উল্লেখ আছে, বাংলাদেশ যদি চুক্তি অনুযায়ী পানি না পায় সে ক্ষেত্রে তা যুক্ত কমিটির মাধ্যমে আলোচনা করে সমাধান করা যেতে পারে, তাতেও না হলে পর্যায়ক্রমে তা ইন্দো-বাংলাদেশ যৌথ নদী কমিশন ও দুই দেশের সরকার পর্যায়ে আলোচনা করে সমাধান করার কথা। চুক্তি অনুযায়ী মতৈক্যে না পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের অন্তত চুক্তিবদ্ধ পরিমাণের শতকরা ৯০ ভাগ পানি পাওয়ার কথা। এতে সমাধান না হলে কোন তৃতীয় পক্ষের দারস্থ হওয়া এবং সর্বশেষ জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক পানি বিষয়ক সনদ অনুযায়ী আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করা, যা চুক্তিতে উল্লে­খ আছে। কিন্তু এতকিছু সুযোগ থাকার পরও দেশে পানির সংকট কাটছে না।