সুন্দরবনের প্রয়োজনে আমরা নই, আমাদের প্রয়োজনে সুন্দরবন

দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের উন্নয়ন এবং সুন্দরবন রক্ষা শীর্ষক এক আলোচনায় বক্তারা বলেছেন, সুন্দরবন আমাদের মায়ের মতো। একে রক্ষা করা আমাদের সকলের দায়িত্ব।  সুন্দরবনকে বাদ দিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়ন কল্পনা করা যায় না। বক্তারা বলেন, সুন্দরবন আমাদের প্রয়োজন আছে, কিন্তু সুন্দরবনের কাছে আমাদের প্রয়োজন নেই। গতকাল শনিবার ইংরেজী দৈনিক দ্য ডেইলি স্টার এর আয়োজনে ওই আলোচনায় পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল এবং পরিবেশবাদী সংগঠনের প্রতিনিধিরা বক্তব্য রাখেন।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, জাহাজ দুর্ঘটনায় সুন্দরবনে তেল ছড়িয়ে পড়ায় ক্ষয়ক্ষতি যাই হোক না কেন এ বিষয়ে উদ্বিগ্ন না হবার কারণ নেই। ক্ষয়ক্ষতির ব্যাপারে জাতিসংঘ বিশদ কাজ করছে। তাদের রিপোর্ট পাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে। এ নিয়ে জাতিসংঘ প্রতিনিধিদল একটি সাংবাদিক সম্মেলনও করবে। তিনি বলেন, সুন্দরবনের তেল দুর্যোগ মোকাবেলায় বাংলাদেশকে বহু দেশ সহায়তা করতে চেয়েছে। আমরা কোন দেশকে না করিনি। তবে এ কাজটি সমন্বয় করছে সরকারের ইআরডি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও তাদের সাথে যোগাযোগ করেছে। কাজের সুন্দর সমন্বয়ের জন্য এ সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে।
পরিবেশ মন্ত্রী আরো বলেন, নদীতে তেল ট্যাংকার ডোবার পর আমরা বসে থাকিনি। ২৪ ঘন্টার মধ্যে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের লোক ঘটনাস্থলে গিয়েছে। তবে জাহাজটা দ্রুত উদ্ধার করা গেলে ক্ষয়ক্ষতি আরো কম হতো। দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল তথা উপকূলের পরিবেশ রক্ষায় সরকারের পরিকল্পনার অংশ তুলে ধরে আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে এ অঞ্চলকে রক্ষা করার জন্য চার কোটি গাছ লাগানো হবে। এ কাজে বাংলাদেশ নৌবাহিনীকে সম্পৃক্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কাছে সময় চাওয়া হয়েছে। চলতি মাসের শেষে বা ২০১৫ সালের জানুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে তিনি এ কাজ উদ্বোধন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রী আ হ ম মোস্তফা কামাল বলেন, জাহাজ ডুবির ঘটনায় কি পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা জাতিসংঘ প্রতিনিধিদল স্টাডি করছে। তাদের রিপোর্ট পাওয়ার পর যে সুপারিশ পাওয়া যাবে তা আমরা বাস্তবায়ন করার সর্বাত্মক চেষ্টা চালাবো। এছাড়া সুন্দরবন বাঁচাতে সরকারের আন্তরিকতার অভাব নেই। এই বনের উন্নয়নে সরকার সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে। দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের ব্যাপারে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার সুষম উন্নয়নে বিশ্বাস করে। দক্ষিণাঞ্চলের ৬৪টি উপজেলা যাতে সুষম উন্নয়নের আওতায় আসে তার জন্য পদক্ষেপ নেয়া হবে। তিনি বলেন, সরকার যে উন্নয়নই করুক না কেন কক্সবাজার এবং সুন্দরবনের অগ্রাধিকার থাকবে। দক্ষিণাঞ্চলের উন্নয়নের ব্যাপারে পরিকল্পনা মন্ত্রী বলেন, এ অঞ্চলের মানুষের জীবনমান উন্নয়নে সরকার মহাপরিকল্পনা নিয়েছে। পদ্মাসেতু হবার পর এইসব এলাকার জনগণকে কিভাবে উন্নত জীবনমানে পৌঁছানো যায় সে লক্ষ্যে কাজ হচ্ছে। তিনি নিজ জেলার উদাহরণ দিয়ে বলেন, কুমিল্লার অনেক লোক দেশের বাইরে গিয়ে জীবনমান উন্নত করেছে। দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য সে চেষ্টা করতে হবে। তিনি বলেন, রামপাল বিদ্যুত্ কেন্দ্র নিয়ে অনেক সমালোচনা হচ্ছে। কিন্তু কেউ বলছে না বাংলাদেশের বিদ্যুেকন্দ্রগুলোর মাত্র আড়াই শতাংশ কয়লা নির্ভর। চীনে তা প্রায় ৮০ শতাংশ। আর এ বিদ্যুেকন্দ্রটি এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যাতে দূষণ কম হয়। দক্ষিণাঞ্চলে পায়রা বন্দর হবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ বন্দরের মাধ্যমে রামপাল বিদ্যুত্ কেন্দ্রের কয়লা পরিবহন করা হবে।
পরিকল্পনা মন্ত্রী আরো বলেন, যে কোন উন্নয়ন পরিকল্পনায় পরিবেশকে প্রাধান্য দিতে হবে। ৪০ বছর আগেও পরিবেশ দূষণ একটি বড় বিষয় না হলেও এখন তা অনেক বড়। উন্নত বিশ্বের কারণে আমাদের দেশের পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। তবে বাংলাদেশ যেহেতু পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন নয়, সেহেতু আমাদেরকে এ অবস্থার মধ্য দিয়ে চলতে হবে।
অনুষ্ঠানে সঞ্চালকের দায়িত্বে থাকা ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম বলেন, প্রকৃতিকে ভালোবাসতে হলে সুন্দরবনকে ভালোবাসতে হবে। সুন্দরবন শুধু প্রকৃতিই নয়, আমাদের জীবন জীবিকাও রক্ষা করছে। সুন্দরবন না থাকলে সিডরের সময় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হতো। এসব প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচতে হলে সুন্দরবনকে রক্ষা করতে হবে।
পরিবেশবিদ ড. আইনুন নিশাত বলেন, অনেকে সুন্দরবন সাফ করে চিংড়ী চাষের কথা বলেন। কিন্তু চিংড়ীর মূল্য দিয়ে এই বনকে পরিমাপ করা যাবে না। তিনি সুন্দরবন রক্ষায় স্বল্প এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়ার আহ্বান জানান।
বেলার প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জাতিসংঘ মিশনকে সুন্দরবনে প্রবেশ করতে দেয়ায় সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, আশা করছি স্বচ্ছ একটি রিপোর্ট হবে। দক্ষিণাঞ্চলে চিংড়ী চাষের ফলে খাদ্য নিরাপত্তা বলয় ভেঙ্গে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, লোনা পানিতে চিংড়ী চাষ বন্ধে এখনই পদক্ষেপ নিতে হবে।

অন্যান্যের মধ্যে প্রধান বন সংরক্ষক ইউনুছ আলী, বুয়েটের অধ্যাপক এম এ জলিল, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মনিরুল এইচ খান, বিএডিসির ইফতেখার উদ্দিন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।