বর্তমানে দেশে আইন আছে, শাসন আছে, কিন্তু সুশাসন নেই। দেশে নির্বাচন হয়, সরকার বদলায়, কিন্তু গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না বরং দুর্বল হয়। কারণ, বর্তমান গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় অনেক ত্রুটি রয়েছে। দিন দিন গণতন্ত্র থেকে দূরে সরে যাচ্ছে বাংলাদেশ। দশম জাতীয় নির্বাচন হয়ে গেলেও দেশে এখন গণতন্ত্রের নামে নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র চলছে।
গতকাল শনিবার রাজধানীর ইনস্টিটিউট অব ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স মিলনায়তনে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) পঞ্চম জাতীয় সম্মেলনে বক্তারা এসব কথা বলেন। তারা বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রয়োজন আছে কিনা তার পক্ষে-বিপক্ষে গণভোট নিতে হবে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা না থাকার কারণেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ফাঁকা মাঠে গোল দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার আন্দোলনকে এগিয়ে নেয়ার দৃপ্তশপথ গ্রহণের মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছে সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন-এর পঞ্চম জাতীয় সম্মেলন। এর আগে সকাল ১০টায় জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের শুভ সূচনা হয়। উদ্বোধনী পর্বে সুজনের সঙ্গে সম্পৃক্ত নেতৃবৃন্দসহ যে সকল বরেণ্য ব্যক্তি মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের স্মরণে শোক প্রস্তাব উত্থাপন ও এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। এরপর সাংগঠনিক প্রতিবেদন ও ‘জাতীয় সনদ’ উপস্থাপন করেন সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার।
সুজন কেন্দ্রীয় সভাপতি এম হাফিজ উদ্দিন খানের সভাপতিত্বে সম্মেলনে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. আকবর আলি খান, সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু হেনা ও ড. এটিএম শামসুল হুদা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এমাজউদ্দিন আহমদ, ড. ইনাম আহমেদ চৌধুরী, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স-এর সভাপতি মাহবুবুর রহমান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আসিফ নজরুল, রোবায়েত ফেরদৌস, ব্যারিস্টার জোতির্ময় বড়ুয়া, সাংবাদিক আশফাক কায়সার প্রমুখ।
সুজন নেতৃবৃন্দের মধ্যে সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও সুজন সহ-সভাপতি এএসএম শাহজাহান, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও সুজন’র নির্বাহী সদস্য আলী ইমাম মজুমদার, সুজন নির্বাহী সদস্য সৈয়দ আবুল মকসুদ, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, প্রকৌশলী মুসবাহ আলীম, অধ্যাপক নাজমা হাসিন, ড. জালাল উদ্দিন প্রমুখ। সারাদেশ থেকে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের প্রায় আটশ’ সুজন নেতৃবৃন্দ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে ড. আকবর আলি খান বলেন, দেশে উদার গণতন্ত্র নেই। বাংলাদেশে নির্বাচন হলেও গণতন্ত্র দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। কারণ, বর্তমান গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় অনেক ত্রুটি রয়েছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১৫৩টি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন। এসব আসনের ভোটাররা ভোট দেয়ার সুযোগ পাননি। গণতন্ত্র ও উন্নয়ন আলাদা কিছু নয়।
তিনি বলেন, বিগত দিনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে। আগামীতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা থাকবে কি থাকবে না, এটা কোনো রাজনৈতিক দলের বিষয় নয়। এটা ভোটারদের বিষয়। গণভোটের মাধ্যমে ভোটাররাই সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। গণভোটের ব্যবস্থা থাকলে হরতালের কোনো প্রয়োজন ছিল না।
তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন হচ্ছে, সরকার বদল হচ্ছে কিন্তু গণতন্ত্র আরো দুর্বল হচ্ছে। এর কারণ হলো, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিকভাবে কাজ করছে না। গণতন্ত্র উন্নয়নে অবশ্যই গণতন্ত্র ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দেশে জনমত গড়ে তুলতে সুজনের প্রতি আহবান জানান তিনি।
তিনি বলেন, আমাদের সংসদ দুর্বল, নির্বাচনী ব্যবস্থা দুর্বল। আমরা সুশাসন থেকে অনেক দূরে চলে যাচ্ছি। অথচ বাংলাদেশের মানুষ গণতন্ত্রের জন্য জীবন দিয়েছে। আমি মনে করি, আজ হোক কাল হোক বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হবেই।’
সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) আবু হেনা বলেন, এক সময় বাংলাদেশকে বলা হত বটমলেস বাস্কেট বা তলাবিহীন ঝুড়ি। কিন্তু আজকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি, রিজার্ভ, সাক্ষরতা ও নারী শিক্ষার হার বেড়েছে এবং গার্মেন্টস খাতের সমৃদ্ধি হয়েছে। এ তথ্যগুলো আমাদের আশান্বিত করে। কিন্তু আজকে সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি বেড়েছে। আমরা তো এরকম সমাজ ভাবিনি। এ থেকে মুক্তি দরকার।
সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার ড. এটিএম শামসুল হুদা বলেন, ২০১৪ সালের নির্বাচনে ফাঁকা মাঠে গোল দেয়া হয়েছে। নির্বাচন বয়কট করে কখনও কোনো রাজনৈতিক দল লাভবান হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি। হুদা বলেন, যারা নির্বাচন বয়কট করেছিল তাদের উচিত ছিল নির্বাচন কমিশনে নিয়োগপ্রাপ্তরা যোগ্য কি-না, তারা কোন ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে এসেছে এসব বিষয়ে আলোচনা করা। নির্বাচন কমিশন জাতির কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন উপহার দিতে পারেনি। এ নির্বাচন কমিশন সংস্কার হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু তারা সেটা করেনি। ফলে দেশে নির্বাচন হয়ে গেছে। দেশে এখন গণতন্ত্রের নামে নির্বাচিত স্বৈরতন্ত্র চলছে।
এটিএম শামসুল হুদা বলেন, ‘বর্তমানে গণতন্ত্র মানে বুঝানো হয়- পাঁচ বছর পর নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন অর্থাত্ নির্বাচনী গণতন্ত্র। এর ফলে সংসদ কার্যকর হয় না। পাকিস্তানকে আমরা ব্যর্থ রাষ্ট্র বলি। অথচ তাদের নির্বাচন কমিশনসহ অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো ভাল চলছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমানে দেশে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে, এটা ভাল সংবাদ। কিন্তু বাংলাদেশে দুর্নীতি ও ঘুষ ছাড়া কোনো কাজ হয় না। এমনকি মানুষের জন্ম ও মৃত্যু সার্টিফিকেট সংগ্রহ করতেও ঘুষ দিতে হচ্ছে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলেও মানুষের দৈনন্দিন সেবার কোনো উন্নতি হচ্ছে না।’
অধ্যাপক এমাজউদ্দিন বলেন, গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকলে স্থিতিশীল উন্নয়ন হয় না। মানুষের সম্মান, অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্যই সুশাসন প্রয়োজন। এজন্য প্রথমেই প্রয়োজন গণতন্ত্র। গণতন্ত্রের মূল কথা সব ক্ষমতার মালিক জনগণ। কিন্তু গত নির্বাচনের পর তারা সে ক্ষমতাটুকুও হারিয়েছে।
ড. ইনাম আহমেদ চৌধুরী বলেন, দেশে আইন আছে, শাসন আছে, অথচ আইনের শাসন নেই। বৈরি রাজনৈতিক আবহাওয়ার মধ্যেও সুজন কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সুজন তার লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে যাবে এমনটা আশা করছি।
সভাপতির বক্তব্যে এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য রাজনৈতিক দল অপরিহার্য। কিন্তু জনকল্যাণমুখী রাজনৈতিক দলের পরিবর্তে বর্তমানে দেশে দলতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। সুজন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় আন্দোলন করছে। এর ফলে আমাদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হয়েছে।
সুজন সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার সংগঠনের কার্যক্রমের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান, তথ্য অধিকার প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক সংস্কার ও স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণে কাজ করছে সুজন। এ সংগঠন দাতা নির্ভর সংগঠন নয়। তাই ইচ্ছা থাকলেও অনেক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না। তিনি রাজনৈতিক সংকটের টেকসই সমাধানের লক্ষ্যে ‘জাতীয় সনদ’ উপস্থাপন করেন। নির্বাচন ব্যবস্থার সংস্কারসহ অন্যান্য ক্ষেত্রে পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে ১৪ দফা সুপারিশ তুলে ধরেন তিনি।