দেশীয় প্রযুক্তির ‘ক্যাচার’ দিয়েই সফলতা এল

 ওরা প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন পেশায় জড়িত হলেও একটি বিষয়ে সকলেই এক। আর তা হলো মানবতার সেবা। যেখানেই দুর্ঘটনা, যেখানে প্রয়োজন হয় মানবিক সাহায্যের, সেখানেই তারা ছুটে যান। কাজ করে যান একেবারে নিঃস্বার্থভাবে মানবতা বিলিয়ে দেন। নিজের গাটের পয়সা খরচ করে বাড়িয়ে দেন সাহায্যের হাত। মানবতার সেবায় নিবেদিত প্রাণ এরা কেউ এককভাবে নিজেদের কৃতিত্ব নিতে নারাজ। তারা সবাই সম্মিলিতভাবে এই কাজটি করেছেন বলে দাবি তাদের। আর এই কাজটি হলো দুইদিন ধরে সারাদেশে আলোচিত জিহাদ উদ্ধার ঘটনাটি।
ফায়ার সার্ভিস, ওয়াসা ও বুয়েটের বিশেষজ্ঞ দল তাদের প্রযুক্তি দিয়ে যখন ব্যর্থ, ঠিক তখন এই ব্যক্তিরা তাদের তৈরি করা ‘ক্যাচার’ দিয়ে শিশু জিহাদের লাশ উদ্ধার করে। এরা হলেন- আবু বকর সিদ্দিক, ফারুক হোসেন, আনোয়ার হোসেন, লিটু, আব্দুল মজিদ, আব্দুল কাদের চৌধুরী, মুরাদ, সুজন দাস রাহুল, শাহ মো. আব্দুল্লাহ মুন, রাকিব এবং শরিফুল ইসলাম।
জিহাদের লাশ উদ্ধারের পর ‘ক্যাচার’ তৈরি দলের সদস্য আবু বকর সিদ্দিক বাবলু জানান, শুক্রবার রাতে টিভিতে খবর দেখে তিনি মিরপুরের বাসা থেকে ছুটে যান ঘটনাস্থলে। তিনি একটি চেইন শপ দোকানে ঠিকাদারির মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ করেন। ঘটনাস্থলে গিয়ে তিনি ‘আইকন ইঞ্জিনিয়ারিং’ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে কথা বলেন। এরপর সেখানে লোহার রড দিয়ে একটি খাঁচা তৈরির পরিকল্পনা করেন।
আব্দুল মজিদ, লিটু ও শরিফুল ইসলাম জানান, প্রথমে তারা পরিকল্পনা করেন নিজেদের মধ্যে কেউ একজন কূপের ভিতর নামবেন। এজন্য তারা ফায়ার সার্ভিসের কাছে অক্সিজেন মাস্ক, সেফটি বেল্টসহ আরো জিনিসপত্র চান; কিন্তু ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ তাদের এই প্রস্তাব নাকচ করে দেন; কিন্তু এরপরও হাল ছাড়েননি তারা।
তারা ভাবতে থাকেন বিকল্প কিছু। ব্যবসায়ী ফারুক ও আবু বকর সিদ্দিক প্রথমে পরিকল্পনা শুরু করেন কি করা যায় তা নিয়ে। তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন এমন একটা যন্ত্র তৈরি করতে হবে যা দিয়ে সহজেই তুলে আনা সম্ভব শিশুটিকে; কিন্তু কাজটি করতে হবে অত্যন্ত দ্রুততার সাথে। ফারুক ও আবু বকর সিদ্দিক যোগাযোগ করেন আব্দুল মজিদের সাথে। তিনি রানা প্লাজা দুর্ঘটনায় স্বেচ্ছাসেবক হিসাবে কাজ করেছিলেন। পেশায় ইলেকট্রিক মিস্ত্রি। তাদের সাথে আরো যোগ দেন রানা প্লাজার স্বেচ্ছাসেবক সুজন দাস রাহুল এবং শাহ মো. আব্দুল্লাহ মুন, গাড়ি ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলাম, মতিঝিল কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর ছাত্র লিটু, তার বড় ভাই আনোয়ার হোসেন ও আব্দুল কাদের চৌধুরী। সকলের সমন্বিত পরিকল্পনায় চারফুট দৈর্ঘ্যের পাঁচটি রড ঝালাই করে একটি লম্বা খাঁচা তৈরি করে। এরকম দুইটি খাঁচা তৈরি করে। খাঁচার নীচের দিকে ৫টি স্বয়ংক্রিয় ক্লিপ স্থাপন করে। নীচ থেকে কোন বস্তু খাঁচায় ঢুকলে ক্লিপগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। খাঁচায় ঐ বস্তু প্রবেশের পর ক্লিপগুলো খুলে যাবে। খাঁচার ওপরে একটি সিসি ক্যামেরা ও একটি টর্চলাইট স্থাপন করা হয়। এর সাথে একটি জালও স্থাপন করা হয়। সিসি ক্যামেরা থেকে পাওয়া দৃশ্য মনিটরিং করতে পাশের বাড়ি থেকে আনা হয় একটি টেলিভিশন।

যন্ত্রটি বানানোর পর থেকে তারা অপেক্ষা করতে থাকেন; কিন্তু ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ সেখানে কাজ করতে থাকায় নিজেরা কাজ করার সুযোগ পাননি। বেলা ১২টার পর ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ যখন অনেকটা হাল ছেড়ে দেন এরপর থেকে তারা চেষ্টা শুরু করেন। প্রথমে তারা যন্ত্রটি কূপের ভিতর নামান; কিন্তু কূপের ভিতর যন্ত্রটি পাঠানোর পর বারবার ছিঁড়ে যেতে থাকে সিসি ক্যামেরার সংযোগটি। দুপুর ২-৫০ মিনিটে একবার নামানো হয় যন্ত্রটি। এবার তারা সফল হন। ক্যাচারটি ২৩৪ ফুট নীচে আটকে যাওয়ার পর মনিটরে কালো বস্তু দেখা যায়। তারা বুঝতে পারেন এটি মানুষের মাথা। মিনিট পাঁচেক পর তারা জিহাদের লাশ ওপরে ওঠান।