সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়া হত্যা মামলার চার্জশিটভুক্ত আসামি সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়র ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য আরিফুল হক চৌধুরীকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। গতকাল হবিগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট রোকেয়া আক্তারের আদালতে তিনি স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করলে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। এর আগে আরিফুল হক চৌধুরীর পক্ষে জামিন আবেদন করা হলে আদালত তা নাকচ করে দেন।
সিলেট সিটি মেয়রের আদালতে আত্মসমর্পণের খবরে শত শত দলীয় নেতাকর্মী আদালত প্রাঙ্গণে ভিড় জমান। এছাড়া সিলেট থেকে মেয়র পত্নী শ্যামা হক চৌধুরী, সিটি করপোরেশনের কয়েকজন কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতারাও আদালতে যান। আদালত এলাকায় জনতার সম্মুখে আরিফুল হক চৌধুরী দুইবার বক্তৃতা করেন। প্রথমবার আইনজীবী সমিতির কার্যালয়ের সামনে এবং পরেরবার এজলাসে প্রবেশের আগমুহূর্তে। এসময় তিনি বলেন, এলাকার খ্যাতিমান ব্যক্তিত্ব কিবরিয়া হত্যা মামলায় দীর্ঘ ৯ বছর পর দাখিলকৃত সম্পূরক চার্জশিটে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে আমার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। আমি জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসাবে স্বপ্নেও ভাবিনি এই মামলায় আসামি হব! মহান আল্লাহ তায়ালা আলীমুল গায়েব, সত্যের জয় হবেই। বৃহত্তর সিলেট অঞ্চল ও দেশবাসীর কাছে আমি বিচার চাই। মেয়র না হলে হয়তো আমি এই মামলায় আসামি হতাম না। আমার বৃদ্ধা মা, স্ত্রী ও সন্তানদেরকে আল্লাহ ও সিলেটবাসীর কাছে হাওলা করলাম। আমি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার। ন্যায় একদিন প্রতিষ্ঠিত হবেই। আমি আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল বলেই আদালতে আত্মসমর্পণ করছি।
সকাল সাড়ে ৯টায় আরিফুল হক চৌধুরী আদালত এলাকায় উপস্থিত হন। এ খবর ছড়িয়ে পড়লে আদালত প্রাঙ্গণে দলীয় আইনজীবী ও নেতাকর্মীরা ভিড় জমান। বেলা ১১টা ৪০ মিনিটে মামলার শুনানি শুরু হলে আসামি পক্ষের আইনজীবীরা জামিনের সপক্ষে তাদের বিভিন্ন যুক্তি তুলে ধরেন। রাষ্ট্রপক্ষ জামিনের বিরোধিতা করেন। প্রায় ৪২ মিনিট শুনানির পর আদালত জামিন প্রার্থনা নাকচ করে আসামিকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন। কিছুক্ষণ পর কড়া পুলিশ প্রহরায় সিটি মেয়রকে প্রিজন ভ্যানে করে হবিগঞ্জ কারাগারে পাঠানো হয়।
আসামি পক্ষে মামলা পরিচালনা করেন জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি চৌধুরী আশরাফুল বারী নোমান, জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক এ্যাডভোকেট মনজুর উদ্দিন আহমেদ শাহীন, খালিকুজ্জামান চৌধুরী, আরিফ চৌধুরী, সালেহ উদ্দিন আহমেদ, সামছু মিয়া, আব্দুন নুর খান, আব্দুল হাই, কামাল উদ্দিন সেলিম, নুরুল ইসলামসহ অর্ধশতাধিক আইনজীবী। রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন পিপি আকবর হোসেন জিতু, লুত্ফুর রহমান, নিলাদ্রী শেখর পুরকায়স্থ টিটু, আকল মিয়া প্রমুখ। পরে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জানান, সিলেট সিটি করপোরেশনের মেয়রের জামিনের জন্য উচ্চতর আদালতে প্রার্থনা জানানো হবে।
যেভাবে আসামি
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডি সিলেট জোনের সহকারী পুলিশ সুপার মেহেরুন্নেছা পারুল গত ৩ ডিসেম্বর নতুন করে ১১ জনকে আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করে দ্বিতীয় দফা সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করেন। এতে আরিফুল হক চৌধুরী ও হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র জি কে গউছকেও আসামি করা হয়। অভিযোগপত্রে সিলেটের মেয়রের নাম আরিফুল ইসলাম চৌধুরী থাকায় আদালত তা সংশোধন করে পুনরায় সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিলের নির্দেশ দেন। সে অনুযায়ী গত ২১ ডিসেম্বর নাম সংশোধন করে দাখিল করা সম্পূরক অভিযোগপত্র আদালতে গৃহীত হয়। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, মুফতি আব্দুল হান্নানের এক স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, ২০০৩ সালের শেষের দিকে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুত্ফুজ্জামান বাবরের বেইলী রোডস্থ সরকারি বাসায় অপরাপর আসামিদের সাথে সিলেটের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী ও হবিগঞ্জের মেয়র জি কে গউছকে পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ করার নির্দেশ দেয়া হয়। উক্ত নির্দেশের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের সহায়তায় ওই হামলার ঘটনা ঘটে।
প্রসঙ্গত, ২০০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায় হবিগঞ্জ সদর উপজেলার বৈদ্যের বাজারে আওয়ামী লীগের জনসভা শেষে এক গ্রেনেড হামলায় সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এএমএস কিবরিয়াসহ ৫ জন নিহত এবং ৪৩ জন আহত হয়। এ ব্যাপারে হবিগঞ্জ সদর থানায় অজ্ঞাত পরিচয় আসামিদের বিরুদ্ধে দুটি মামলা দায়ের করা হয়। সম্পূরক চার্জশিটভুক্ত অপর আসামি হবিগঞ্জ পৌরসভার মেয়র ও জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জি কে গউছ গত ২৮ ডিসেম্বর আদালতে আত্মসমর্পণ করলে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।