তানজিলা চৌধুরী। বড় দুই বোনের মতো তিনিও একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী। সমাজ বিজ্ঞান নিয়ে পড়ালেখা করছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়ালেখার পাশাপাশি তিনি শিক্ষকতা করছেন চট্টগ্রাম মোহসেনা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তানজিলার বড় দুই বোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা শেষ করে সরকারি, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত।
তানজিলার বাবার নাম মো. নাসির উদ্দিন চৌধুরী। মা শামীমা আক্তার চৌধুরী এ বছর বেগম রোকেয়া দিবসে “সফল জননী” চট্টগ্রাম বিভাগীয় পুরস্কার লাভ করেছেন। প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও তার তিন মেয়ের জীবনকে সফলতার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ায় তিনি এ পুরস্কার লাভ করেছেন।
তানজিলার সঙ্গে কথা বলে জানা যায় তিনি ছোটবেলা মায়ের সঙ্গে বোনদের স্কুলে যেতেন। বড় দুই বোনের পড়াশোনা করার বিষয়টি তার খুব ভালো লাগতো। বোনদের বিদ্যালয়ের শিক্ষক এবং পরিবারের সদস্যদের অনুপ্রেরণায় তিনি পড়াশোনায় আগ্রহী হন। বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে অন্য শিক্ষার্থীদের চেয়ে ভালো ফলাফল করতে শুরু করেন। তানজিলা কেবল পড়াশোনায় ভালো করেননি পড়াশোনার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডেও তার অংশগ্রহণ ছিল সমানভাবে।
কিন্তু দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতার কারণে তানজিলার পড়াশোনা করা মোটেই সহজ ছিল না। তানজিলা জানান, দৃষ্টি প্রতিবন্ধকতার কারণে তাকে পড়াশোনা করতে হতো অনেক কষ্টে। তিনি বলেন, “বছরের শুরুতে ক্লাশের অন্যান্য শিক্ষার্থীরা নতুন বই পেয়ে যেত। তারা পড়াশোনা শুরু করতো। কিন্তু সে বই আমার জন্য ছিল না। আমার জন্য বই পরেও আসতো না। নিজের পড়ার জন্য প্রচলিত পাঠ্যপুস্তক কাউকে দিয়ে পড়িয়ে শুনে শুনে নিজেই ব্রেইল পদ্ধতিতে বদলে নিতাম। কিংবা কাউকে দিয়ে পড়িয়ে তা রেকর্ড করে টেপ রেকর্ডারে বাজিয়ে শুনে শুনে পড়তে হতো। এভাবে পড়ালেখা করেছি আমি। কিন্তু শুনতে পেলাম এ বছর থেকে ডিজিটাল টকিং বুক এনেছে সরকার। খবরটা শোনার পর অনেক আনন্দ বোধ করছি। মনে হচ্ছে এতদিনে আমার মতো শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা করাটা সহজ হলো”।
একটি হিসাব অনুযায়ী বাংলাদেশে তানজিলার মতো দৃষ্টি প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪০ লাখ। যার বেশিরভাগ মানুষ তাদের উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা না থাকার কারণে পড়ালেখা করতে পারেন না।
এ বিপুল সংখ্যক দৃষ্টি প্রতিবন্ধীর কথা মাথায় রেখে চট্টগ্রামের এনজিও ইপসা (ইয়ং পাওয়ার ইন সোসাল একসন) ২০১৩ সালে একটি প্রকল্প প্রস্তাবনা পেশ করে বাংলাদেশ সরকারের এটুআই প্রকল্পের “সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ড”-এর জন্য। প্রস্তাবনায় বাংলাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে অধ্যয়নরত প্রায় ১০ হাজার দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর জন্য মাল্টিমিডিয়া ডিজিটাল টকিং বুকের আইডিয়া পেশ করা হয়। সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ড এ প্রকল্পে ইসপার জন্য বরাদ্দ দেয় বিশ লাখ ছয় হাজার টাকা। প্রকল্পের মেয়াদকাল নির্ধারণ করা হয় ২০১৪ সালের জুলাই পর্যন্ত।
আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলো ডিজিটাল টকিং বুক ‘ডেইজি’র
৩০ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম বারের মতো দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের হাতে ডিজিটাল বই (ডেইজি মাল্টিমিডিয়া টকিং বুক) তুলে দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ইপসার দুই দৃষ্টি প্রতিবন্ধীর হাতে এই বই তুলে দেয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশে ডিজিটাল বইয়ের যাত্রা শুরু হলো। অনুষ্ঠানে ইপসার পক্ষ থেকে ডিজিটাল বুকের একটি সিডি প্রধানমন্ত্রীকে উপহার দেন ইপসার প্রকল্প পরিচালক ভাস্কর ভট্টাচার্য।
তার কাছ থেকে জানা গেল ‘ডিজিটাল টকিং বুক’ বইটি ইপসা তৈরি করেছে। আর তাদের আইডিয়া বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেছে এটুআই প্রকল্পের সার্ভিস ইনোভেশন ফাণ্ড।
ভাস্কর জানান, দৃষ্টি প্রতিবন্ধীসহ অন্য শিক্ষার্থীরা যাতে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি ব্যবহার করে শিক্ষা লাভ করতে পারে সেই লক্ষ্যে এটুআইয়ের সার্ভিস ইনোভেশন ফাণ্ডের কাছে ডিজিটাল টকিং বুক তৈরি করতে আইডিয়া এবং প্রকল্প প্রস্তাবনা জমা দিয়েছিল ইপসা। তাদের লক্ষ্য ছিল ২০১৫ সালে এই বই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের হাতে তুলে দেয়া হবে। ইপসার প্রকল্প পরিচালক জানান, প্রথম ধাপে ১ম থেকে ৫ম শ্রেণী পর্যন্ত বইয়ের কাজ করা হয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ৬ষ্ঠ থেকে ১০ম শ্রেণী পর্যন্ত ডিজিটাল টকিং বুকের কাজ করা হবে।
‘ডেইজি’ডিজিটাল টকিং বুক কী, কোথায়, কীভাবে পাওয়া যাবে:
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে এটুআই প্রকল্পের অধীন সার্ভিস ইনোভেশন ফাণ্ড কর্তৃপক্ষ জানান, শিক্ষায় তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধির লক্ষ্যে এটুআইপ্রোগ্রাম, সমাজকল্যাণমন্ত্রণালয় এবং শিক্ষামন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের দেয়া হচ্ছে ডেইজি মাল্টিমিডিয়া বই, ইলেক্ট্রনিক বই এবং ব্রেইল বই।
উল্লেখ্য, ডেইজি মাল্টিমিডিয়া দৃষ্টিপ্রতিবন্ধীসহ সকলশিক্ষার্থীদের ব্যবহারের উপযোগী একটি "Full Text Full Audio" ডিজিটাল মাল্টিমিডিয়া বই।
সরকার ঘোষিত ডিজিটাল বাংলাদেশ রূপকল্প বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনে একসেস টু ইনফরমেশন (এটুআই) প্রকল্পনানামুখী কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে এটুআই-এর সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ডের (এসআইএফ) সহায়তায় ইয়ং পাওয়ার ইন সোশ্যাল অ্যাকশন (ইপসা) ইতিমধ্যে প্রাথমিক শিক্ষাস্তরের পাশাপাশি মাধ্যমিক পর্যায়ের সকল পাঠ্যবইও দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপযোগী করে তৈরি করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছে। এটুআই প্রকল্পের উদ্যোগে ইতিমধ্যে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের প্রাথমিক এবং মাধ্যমিক স্তরের সকল পাঠ্যপুস্তক ই-বুকে রূপান্তর করা হয়েছে এবং ওয়েব সাইটে আপলোড করা হয়েছে। এর ফলে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, গবেষক যে কেউ বিনামূল্যে যেকোনো সময় পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তু ডাউনলোড করে প্রয়োজন মেটাতে পারবেন।
ইপসার প্রকল্প পরিচালক ভাস্কর ভট্টাচার্য জানান, ডেইজি বা মাল্টিমিডিয়া ডিজিটাল টকিং বুকের মাধ্যমে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা এবং কম শিক্ষিত জনসাধরণের জন্য তথ্য প্রাপ্তি নিশ্চিত হবে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে প্রাথমিক শ্রেণীর ৩৬টি বই এবং অন্যান্য পর্যায়ের ২৩টি বইকে মাল্টিমিডিয়া ডিজিটাল টকিং বুক আকারে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীরা এবং কম শিক্ষিত জনসাধারণের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে।
বইটি ব্যবহারের জন্য প্রয়োজন আমিস (AMIS) অথবা ডিডি রিডার (DDReader) সফটওয়্যার। এইৎ সফটওয়্যার সিডি কিংবা জাতীয় তথ্য কোষ http://www.infokosh.gov.bd/infokosh-talking-books থেকে ডাউনলোড করা সম্ভব।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পাঠ্যপুস্তকগুলো দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের সহজে ব্যবহার উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। এই বইগুলিদৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের শিক্ষিত এবং কর্মক্ষম হতে সাহায্য করবে। এই বই ব্যাবহার করে ব্রেইল বই খুব সহজে ছাপানো যাবে। কম শিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত এবং অশিক্ষিত সকলের পক্ষে শিক্ষা সহজলভ্য হয়ে উঠবে।
ইপসার প্রকল্প পরিচালক বলেন, “সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ড”-এর সহযোগিতা ছাড়া এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা আমাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না।
সার্ভিস ইনোভেশন ফাণ্ড কী? কবে থেকে এর যাত্রা শুরু:
জনগণের দোড় গোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে একসেস টু ইনফরমেশন প্রকল্পটি প্রধানমন্ত্রী কার্যালয়ের মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করে আসছে। আর এ কার্যক্রমটি পরিচালনার জন্য সহায়তা করে আসছে ইউএনডিপি বাংলাদেশ এবং ইউএসএআইডি।
জনগণের দোরগোড়ায় সেবা পৌছে দিতে ই-সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রতিটি মন্ত্রণালয়/বিভাগ/দপ্তর/জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নানা ধরণের উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে। এই উদ্যোগগুলোকে উৎসাহিত করা ছাড়াও দেশের প্রান্তিক ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী যাতে সহজে, দ্রুত এবং স্বল্প ব্যয়ে সরকারি এবং বেসরকারি সেবা সমূহ গ্রহণ করতে পারে সে লক্ষ্যে উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণ এবং তার প্রসারের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হওয়ায় ‘সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ড’ গঠন করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন প্রোগ্রামের আওতায় ২০১৩ সালের মার্চ মাস হতে এই ফান্ডের যাত্রা শুরু হয়।
যেখান থেকে শুরু:
সরকারি পর্যায়ে অনেক কর্মকর্তা আছেন যারা জনগনকে সেবা প্রদানে নানা সময় বিভিন্ন ধরণের উদ্যোগ নিয়ে থাকেন। কিন্তু এই উদ্যোগগুলো বেশিরভাগ সময় স্বীকৃতি, পূঁজি অথবা কারিগরি সহায়তার অভাবে স্থায়ীরূপ পায় না। তাছাড়াও সেবা সহজলভ্য করা এবং সেবা প্রদানে সমস্যাসমূহ দূর করাসহ যে কোন ধরনের পরিবর্তন করে একটি কার্যকর সমাধানে পৌঁছাতে অনেক পরীক্ষা-নীরিক্ষার প্রয়োজন হয়। এইসব ক্ষেত্রে ব্যর্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে ব্যাপক।
উদ্যোগগুলোকে একটি স্থায়ী রূপ দেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একসেস টু ইনফরমেশন প্রোজেক্টের কারিগরি এবং আর্থিক সহযোগিতায় ২০০৮ সালে সহজসাধ্য উদ্যোগ (কুইক উইন) চালু করা হয়। এর মাধ্যমে মন্ত্রণালয়, বিভাগসহ সকল সংযুক্ত অফিসসমূহ হতে নেয়া সরকারি বিভিন্ন সেবায় তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার এবং সেবা প্রাপ্তিতে মাত্রাতিরিক্ত ধাপসমূহ কমানোর মাধ্যমে আরো বেশি জনবান্ধব এবং সহজলভ্য করার উদ্যোগ নেয়া হয়। এক্ষেত্রে এটুআই অর্থ সাহায্য কখনও সরাসরি প্রদান করতো অথবা মন্ত্রণালয় বা অন্যান্য সরকারি বা বেসরকারি পর্যায় হতে অর্থ সাহায্যের ব্যবস্থা করা হতো।
কুইক উইন যেভাবে পথ দেখিয়েছে:
সেবা প্রদানে উদ্ভাবনের অনেকগুলো প্রতিকূলতার মধ্যে একটা হচ্ছে প্রাথমিক পর্যায়ে পরীক্ষা-নীরিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত ফান্ডের অভাব। কারিগরি এবং আর্থিক সহায়তা না থাকার কারণে সরকারি কর্মকর্তাদের সেবা প্রদান সহজ করার অনেক উদ্যোগ টিকে থাকেনি। অথবা কখনও উদ্যোগটি চালু করার কার্যকর কোন পদক্ষেপই নেয়া হয়নি। তাছাড়া যে কোন উদ্ভাবনকে পৃষ্ঠপোষকতা বা স্থায়ীরূপ দেবার পূর্বে সেটার কার্যকারিতা যাচাইয়ের পরীক্ষা-নীরিক্ষার প্রয়োজন হয়। পরীক্ষা-নীরিক্ষার পর উদ্ভাবনটির উদ্দেশ্য অকার্যকর বা ব্যর্থও হতে পারে যা সরকারি পর্যায়ে কোনভাবে মেনে নেয়া বা গ্রহণ করা হয় না। সেবা প্রদানে উদ্ভাবনের জন্য এগুলিও কিছু প্রতিকূলতা।
উদ্ভাবনের জন্য প্রয়োজনীয় ঝুঁকি নেয়াকে নিরুৎসাহিত করা এবং পরীক্ষা-নীরিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত ফান্ডের ব্যবস্থা না থাকা- সমস্যা দুটি সমাধানের লক্ষ্যে এটুআই ২০০৮ সালে কুইক-উইন বা সহজসাধ্য উদ্যোগ চালু করে যা সরকারি পর্যায়ে সফল এবং ব্যপক জনপ্রিয়তা পায়।
কুইক-উইন বা সহজসাধ্য উদ্যোগ হচ্ছে এটুআই’র আর্থিক এবং কারিগরি সহায়তায় পূর্বে প্রচলিত সেবাকে আরো উন্নত করা। এ লক্ষ্যে একটি প্রোটোটাইপ তৈরি করা যা এক জন সরকারি কর্মকর্তার নেতৃত্বে বাস্তবায়িত হত।
পূর্বে বেশির ভাগ সময়ে আর্থিক সহায়তা বিভিন্ন মন্ত্রণালয় বা সরকারি অফিসে চলমান কোন প্রকল্প হতে অথবা কোন নতুন প্রকল্পের সুযোগ তৈরি করার মাধ্যমে এটুআইয়ের প্রচ্ছন্ন সহায়তায় ব্যবস্থা করা হতো। এটুআই দেশি-বিদেশি সাহায্য সংস্থার মাধ্যমে এই ফান্ডের ব্যবস্থা করতো। কখনও বিশেষ প্রয়োজনে এটুআই সরাসরি ফান্ড দিত। ফান্ড বা আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপ, প্রাইভেট সেক্টরে সিএসআর অথবা অর্থবছরের শেষে সরকারের অব্যবহৃত আর্থিক খাতসহ নানা খাত থেকে এই ফান্ড সহায়তার ব্যবস্থা করা হতো।
কুইক-উইনের মাধ্যমে নেয়া উদ্যোগের একটি হচ্ছে ইউনিয়ন তথ্য ও সেবা কেন্দ্র। বর্তমানে যা ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার নামে চালু রয়েছে। এই উদ্যোগের মাধ্যমে ৩০টি ইউনিয়নে প্রাথমিকভাবে সেন্টার বা কেন্দ্র স্থাপন করে সরকারি কিছু সেবা এসব কেন্দ্র থেকে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। উদ্যোগটি সফল ও জনপ্রিয় হয়। ফলে, পরবর্তীতে স্থানীয় সরকার বিভাগের সহায়তায় সাড়ে চার হাজার ইউনিয়নে এই উদ্যোগটি ছড়িয়ে দেয়া হয়। বর্তমানে প্রতিমাসে প্রায় ৩.২ মিলিয়ন নাগরিক এই সকল কেন্দ্র হতে সেবা নিয়ে থাকে।
ই-পুর্জিও কুইক উইনের মাধ্যমে আসা আরেকটি সফল উদ্যোগ। এই উদ্যোগের মাধ্যমে আখ-চাষীদের জন্য আখ ক্রয়ের আদেশ যা পূর্জি নামে পরিচিত তা মোবাইলের মাধ্যমে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়। পূর্বে এই পূর্জি কৃষকের হাতে সময়মত এসে পৌঁছাত না। যে কারণে বিপুল পরিমাণ আখ নষ্ট হতো এবং কৃষক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো। এতে করে আখ চাষীরা আখ উৎপাদনে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েছিল।
কুইক-উইনের মাধ্যমে প্রাথমিকভাবে দুটি আখ কারখানায় এটা চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়। পরবর্তীতে সব কয়টি (১৫টি আখ কারখানায়) আখ কারখানায় চালু করা হয়। বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্য শিল্প সংস্থার মাধ্যমে নেয়া এই উদ্যোগে প্রায় দুই লাখ আখচাষী উপকৃত হয়।
সচিব এবং ই-গভ ফোকাল পয়েন্টদের (বর্তমানে যারা ইনোভেশন অফিসার নামে পরিচিত) বিভিন্ন কর্মশালার মাধ্যমে প্রায় ৭’র বেশি কুইক উইন আইডিয়া বের হয়ে আসে। এই আইডিয়াগুলোর ভিতর থেকে প্রায় ১২০টি আইডিয়া বাস্তবায়ন করার জন্য বেছে নেয়া হয়। ইউআইএসসি এবং ই-পুর্জি-এর মতো অনেক কুইক উইন উদ্যোগ আছে যেগুলো সফল হয় এবং অন্যান্য অফিসে বাস্তবায়িত হয়। অনেকগুলো আইডিয়া বাস্তবায়ন করা না গেলেও তা থেকে এটুআই, সরকার এবং ইউএনডিপি বাংলাদেশ বেশকিছু অভিজ্ঞতা অর্জন করে। কুইক-উইন থেকে কর্তৃপক্ষ একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিজ্ঞতা লাভ করে। তা হলো; কোন উদ্যোগ বাস্তবায়নে যাথাসাধ্য চেষ্টা থাকা সত্ত্বেও তা ব্যর্থ হতে পারে, তবে তা সাদরে গ্রহণ করতে হবে।
কুইক-উইন থেকে পাওয়া এ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এবং উদ্যোগটিকে আরো আনুষ্ঠানিক রূপ দিয়ে, আর্থিক সীমা আরো বাড়িয়ে পরবর্তীতে সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ড গঠন করা হয়। কুইক-উইন উদ্যোগের মাধ্যমে এটুআই প্রায় দুই মিলিয়ন ডলার খরচ করে। অন্যদিকে, ২০১৩ সালে ৫০ মিলিয়ন ডলারের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে ১০ মিলিয়ন ডলার পুঁজি করে তিন বছরের জন্য সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ড যাত্রা শুরু করে।
সার্ভিস ইনোভেশন ফাণ্ডের জন্য কারা আবেদন করতে পারবেন:
ব্যক্তি, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, এনজিও, সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান যে কেউ এই ফান্ডের জন্য আবেদন করতে পারবে। ফান্ডের লক্ষ্য, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের নেয়া উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলোক পৃষ্ঠপোষকতা করা, নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে এর সফলতা নিশ্চিত করা এবং এর আওতা বৃদ্ধিতে সহায়তা প্রদানের মাধ্যমে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে একটি উদ্ভাবনী সংস্কৃতি তৈরি এবং তা টেকসই হতে সহায়তা করা।
যেসব ক্ষেত্র সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ডের জন্য বিবেচিত হবে:
সরকারি সব ধরনের সেবার সঙ্গে সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ড ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চারটি মানদণ্ডের মাধ্যমে সেবার মানোন্নয়ন বা উদ্ভাবন (ইনোভেশন) হয়েছে বলে বিবেচিত হবে এবং সেগুলোকে সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ড প্রদানের জন্য বিবেচিত হবে। অর্থাৎ ইনোভেশন ফান্ডের জন্য সেই সেবাগুলোই বিবেচিত হবে, যেগুলো-
ক) পেতে সময় তুলনামূলকভাবে কম লাগবে ( ভ্রমন, অপেক্ষাকালীন সময় এবং সম্পূর্ণ লেনদেন করার সময়সহ)
খ) জনগণের খরচ কমে যাবে (ফি, ভ্রমণ খরচ ইত্যাদি ছাড়াও অতিরিক্ত অন্যান্য খরচ)
গ) ভ্রমণের সংখ্যা বা পরিমাণও কমে যাবে। এবং সর্বোপরি
ঘ) সেবার মান বৃদ্ধি হবে।
শুধুমাত্র ওয়েবসাইট তৈরি, অফিস অটোমেশন, ডাটাবেইজ তৈরি, মোবাইল ফোন অ্যাপ, ইন্টারনেট অ্যাপ অথবা অন্য যে কোন সফটওয়ার ডেভেলপমেন্ট ইত্যাদির সঙ্গে উল্লেখিত চারটি বিষয় যুক্ত করে যদি সেবার মান উন্নয়ন করা না যায় তবে তা ফান্ডের জন্য উপযোগী হবে না। সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ডের জন্য নারী ক্ষমতায়ন প্রতিবন্ধীদের সার্বিক উন্নয়ন, গ্রামীণ অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সবুজ উদ্যোগ, কমমূল্যের ডিভাইজ, শিক্ষা কার্যক্রম, বাংলা ভাষা উন্নয়ন টুল বা যন্ত্র ইত্যাদি ক্ষেত্রগুলোকে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ডের মাধ্যমে যে উদ্যোগুলোকে পৃষ্ঠপোষকতা করা হচ্ছে তা সার্বিকভাবে সরকারি সেবাপ্রদানের ক্ষেত্রে উদ্ভাবনের পরিমাণ বাড়িয়ে দিবে। কুইকউইনের আওতা শুধুমাত্র মন্ত্রণালয় এবং তার অধঃস্থন অফিসগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ডের ক্ষেত্রে এই ধরনের কোন সীমারেখা রাখা হয়নি। তাছাড়া সার্ভিস ইনোভেশন ফান্ডের মাধ্যমে সরকারের মাঠ পর্যায়ের কর্মকার্তাদেরও যুক্ত করা সম্ভব হয়েছে যারা সরাসরি জনগণকে সেবা দিয়ে থাকে। সর্বোপরি সরকারি পর্যায়ে সেবা প্রদানে একটি উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করে এমন একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলা সম্ভব হয়েছে। এর ফলে সরকারের সঙ্গে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক এনজিও, যে কোন ব্যক্তি এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ নানা বিভাগ জড়িত হচ্ছে। সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে যা অসামান্য উদ্ভাবন। যার ফলে একটি কার্যকরী পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশীপ তৈরি হওয়ার ক্ষেত্র তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।