নতুন নির্বাচনের লক্ষ্যে খালেদা জিয়ার ৭ দফা

অবিলম্বে একটি সুষ্ঠু, প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে সাত দফা প্রস্তাব দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ইংরেজি ২০১৪ সালের শেষদিনে, গতকাল বুধবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ সম্মেলনে এই প্রস্তাব দিয়ে তিনি বলেছেন- যে যাই বলুক, যত কথাই বলুক-দেশে নির্বাচন হবেই, সরকারকে দ্রুত নির্বাচন দিতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। জনগণের বিজয় আসন্ন, ২০১৫ সাল হবে জনগণের বিজয়ের বছর। নির্বাচনের বিষয়ে সমঝোতা সৃষ্টিতে আলোচনায় বসতে তিনি আবারও সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

সাত দফায় যা আছে
খালেদা জিয়ার প্রস্তাবিত সাত দফার মধ্যে রয়েছে- নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন, নির্বাচন ঘোষণার আগে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে সংসদ ও মন্ত্রিসভা বিলুপ্ত করে প্রতিদ্বন্দ্বী পক্ষগুলোর সম্মতিক্রমে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর, নির্বাচনের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির জন্য বেসামরিক প্রশাসনের সহায়তায় ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দিয়ে সারাদেশে সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের মোতায়েন, নির্বাচনের প্রচারাভিযান শুরুর আগেই সন্ত্রাসী গ্রেফতার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে বিশেষ অভিযান পরিচালনাসহ    প্রশাসন ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী থেকে পক্ষপাতদুষ্ট লোকদের প্রত্যাহার, সকল রাজনৈতিক বন্দীর মুক্তি এবং এ সরকারের আমলে বন্ধ করা গণমাধ্যম খুলে দেয়া। এসব প্রস্তাব মেনে নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে জাতীয় সংকট নিরসনে তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। এসব প্রস্তাবের পক্ষে জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ঘোষণা করেন তিনি। এছাড়া ঐক্যবদ্ধভাবে একটি জাতীয় আন্দোলন গড়ে তুলতে সকল গণতান্ত্রিক দল, শক্তি ও ব্যক্তির প্রতি আহ্বান জানান।
বিএনপির সঙ্গেই আলোচনা করতে হবে
‘আপনি তো এ সরকারকে অবৈধ বলছেন, তাহলে আবার তাদের সঙ্গে আলোচনার কথা বলছেন কেন’- নিজের লিখিত বক্তব্য শেষে এই রকম এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘যেভাবেই হোক তারা তো ক্ষমতা দখল করে আছে, তাই আলোচনার মাধ্যমেই সংকটের সমাধান করতে হবে। সরকারকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা সাত দফা মানবে কিনা।’ সরকারের কেউ কেউ বলছে-বিএনপি তো বিরোধী দল নয়, সে কারণে বিএনপির সঙ্গে কোনো আলোচনাও নয়, আপনার বক্তব্য কি?- এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন ‘আমরা দেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করি, সে কারণে আমাদের সঙ্গেই তাদের আলোচনায় বসতে হবে।’
৫ জানুয়ারি ঢাকায় সমাবেশের অনুমতির আশা
দশম সংসদ নির্বাচনের প্রথম বর্ষপূর্তির দিন পাঁচ জানুয়ারি ঢাকায় বিএনপিকে শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অনুমতি দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে খালেদা জিয়া বলেন, এই দিনটিকে আমরা ইতোমধ্যে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ হিসাবে পালনের আহ্বান জানিয়েছি। গণতন্ত্র হত্যার বিরুদ্ধে জনমত গঠনের লক্ষ্যে ওইদিন সারাদেশে সভা-সমাবেশ ও কালো পতাকা বিক্ষোভ মিছিল হবে। তিনি বলেন, গাজীপুরে সন্ত্রাসী কায়দায় আমাদেরকে সমাবেশ করতে দেয়া হয়নি। আশা করি ৫ জানুয়ারি ঢাকায় শান্তিপূর্ণ সমাবেশ করতে দেয়া হবে।
পর্যায়ক্রমে ধরাবাহিক কর্মসূচি
পাঁচ জানুয়ারি সমাবেশ করতে দেয়া না হলে কি করবেন? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘কর্মসূচি পালন করা তো আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার।’ আন্দোলনের বিষয়ে লিখিত বক্তব্যে বিএনপি প্রধান বলেন, ‘জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন-সংগ্রামের কর্মসূচিকে অগ্রসর করে নিতে চাই। পর্যায়ক্রমে ধারাবাহিক কর্মসূচি আসবে। বাধা দিয়ে, আক্রমণ করে জনগণের আন্দোলনকে কেউ কখনও দমাতে পারেনি, এবারও পারবে না।
দ্রুত নির্বাচনের অঙ্গীকার করেছিল আওয়ামী লীগ
লিখিত বক্তব্যে খালেদা জিয়া বলেন, ‘তারা বলেছিল সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার প্রয়োজনে নাকি ৫ জানুয়ারির ভোটারবিহীন তথাকথিত নির্বাচন করতে হয়েছিল। খুব শিগগির আলোচনার মাধ্যমে নতুন নির্বাচনের অঙ্গীকার করেছিল তারা। এখন সেই অঙ্গীকার থেকে সরে তারা ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করতে চায়।’ তার এই বক্তব্যের সূত্র ধরে প্রশ্ন করা হয়েছিল-আওয়ামী লীগ কি লিখিত কোনো অঙ্গীকার করেছিল? জবাবে তিনি বলেন, ‘লিখিত ছিল না, তারানকোর (জাতিসংঘ মহাসচিবের তখনকার বিশেষ দূত) সঙ্গে আলোচনার সময় কোনো লিখিত অঙ্গীকার হয়নি। কিন্তু সরকার গঠনের পর তো তারা নিজেরাই নির্বাচনের কথা বলেছিল, এটিই তো অঙ্গীকার।’
সংবিধান সংশোধনের দাবি
দ্রুত নির্বাচন দেয়া হলে আপনারা কি বিদ্যমান সংবিধানেই নির্বাচনে যাবেন? এতে তো তত্ত্বাবধায়কের বিধান নেই-এর জবাবে তিনি বলেন, ‘সংবিধান অবশ্যই সংশোধন করতে হবে।’
তারেক সরাসরি এ কথা বলেননি
তারেক রহমান বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি করায় তীব্র আপত্তি চলছে, আপনি কি তার বক্তব্যের সঙ্গে একমত? এই প্রশ্নের জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, ‘তারেক রহমান সরাসরি একথা বলেনি। তথ্য ও বিভিন্ন বইয়ের ঊদ্ধৃতি দিয়ে সে কথা বলেছে।’ এসময় তিনি আরও বলেন, ‘তারেক এখনও বিদেশে চিকিত্সাধীন।’
সরকার যা করছে সেটা অপকৌশল
আপনারা এ সরকারকে আর কত সময় দিতে চান? জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারপারসন বলেন, ‘জনগণ আর অপেক্ষা করতে চায় না। একবছর তো সময় দেয়া হয়েছে। আর সময় নেই। যতদ্রুত সম্ভব দেশের এই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থার সমাধান হওয়া জরুরি। কারণ দেশে এখন কোনো বৈধ সরকার নেই, গণতন্ত্রও নেই।’
কেউ কেউ বলছে আপনারা সরকারের রাজনীতির কৌশলের কাছে হেরে গেছেন-জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, ‘রাজনীতি কৌশলের খেলা, অপকৌশলো নয়। সরকার যা করছে সেটি অপকৌশল।’ আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বিএনপি সন্ত্রাসের রাজনীতিতে বিশ্বাসী নয়। আমরা জ্বালাও-পোড়াও করি না। এসব সরকারই করে।’
সকল রাজবন্দীর মুক্তি দাবি
জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে আন্দোলন করার সমালোচনার জবাবে খালেদা জিয়া বলেন, ‘জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে আওয়ামী লীগ আন্দোলন করেনি? করেছে। তখন তো এনিয়ে কেউ কথা বলেনি।’ আপনি সকল রাজবন্দীর মুক্তি চেয়েছেন, তাহলে কি জামায়াত নেতাদেরও মুক্তি চাচ্ছেন? এর জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি রাজবন্দী বলেছি, সাজাপ্রাপ্তদের কথা বলিনি। আমরা সবসময়ই বলছি-অপরাধীদের বিচার হবে সুষ্ঠু ও আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে।’
সময়মতো আমি রাজপথে থাকবো
‘আপনারা তো শুধু আন্দোলনের হুমকি-ধামকি দেন। কিন্তু আপনিও রাস্তায় নামেন না, আপনার দলের নেতা-কর্মীরাও রাস্তায় নামেন না, এটা কেন?’-এই ধরনের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি সবসময়ই জনগণের সঙ্গে ছিলাম। এখনও আছি। অতীতেও স্বৈরাচার সরকার হটিয়েছি। যখন প্রয়োজন হবে তখন সময়মতো আমাকে রাজপথে দেখবেন। বিএনপির নেতারাও রাস্তায় থাকেন। না থাকলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা হয় কেন। তাহলে তো এসব মামলা মিথ্যাই প্রমাণ হয়।’

বিএনপি নেতা ড. আর এ গণি, এম কে আনোয়ার, মির্জা আব্বাস, নজরুল ইসলাম খান, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. ওসমান ফারুক এবং জোট নেতাদের মধ্যে এলডিপি সভাপতি অলি আহমদ, জাগপা সভাপতি শফিউল আলম প্রধান, ইসলামী ঐক্যজোটের আব্দুল লতিফ নেজামী, কল্যাণ পার্টি চেয়ারম্যান সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, জাতীয় পার্টির (জাফর) আহসান হাবীব লিংকন ও এনপিপি চেয়ারম্যান ড. ফরিদুজ্জামান ফরহাদ প্রমুখ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন।