বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না ৩৪তম বিসিএসের

 বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না ৩৪তম বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস) পরীক্ষার। বিধিমালা অনুসরণ না করেই গত ১৮ ডিসেম্বর প্রথমদফা ৩৪ তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করেছিল বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশন (পিএসসি)। ফলে এক হাজার ৯৭ জন কারিগরি/পেশাগত ক্যাডারে উত্তীর্ণ হওয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছিল। তবে নিজেদের ত্রুটি শুধরে নতুন করে ১৪৪ জনকে উত্তীর্ণ দেখিয়ে গত মঙ্গলবার সংশোধিত ফলাফল প্রকাশ করেছে কমিশন। এছাড়াও প্রথম ফলাফলে সাধারণ ক্যাডারে উত্তীর্ণ ৯৫৩ জন এবার কারিগরি/ পেশাগত ক্যাডারেও উত্তীর্ণ বলে বিবেচিত হয়েছেন। এর আগে এই বিসিএসের প্রিলিমিনারি পরীক্ষা গ্রহণের শুরু থেকেই বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে কমিশন। প্রথমবারের মতো প্রিলিমিনারিতে কোটাপদ্ধতি চালু করায় অনেক মেধাবী বঞ্চিত হন। এ নিয়ে সারাদেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে গত বছরের ১০ জুলাই ফল পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেয় পিএসসি।
ফলাফলে ত্রুটির বিষয়ে পিএসসির সংশ্লিষ্টরা ইত্তেফাককে জানান, কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ৩৪তম বিসিএসের ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছিল। কমিশন সিদ্ধান্ত নেয় কারিগরি/পেশাগত ক্যাডারে উত্তীর্ণ হতে হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে পৃথকভাবে ৫০ নম্বর পেতে হবে। কিন্তু কমিশনের এই সিদ্ধান্ত বিধিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। বিধিতে আছে লিখিত পরীক্ষায় গড়ে ৫০ শতাংশ নম্বর পেলে যে কোন ক্যাডারে উত্তীর্ণ হবেন। এজন্য দ্বিতীয় দফায় বিদ্যমান বিধি অনুসরণ করে ফলাফল প্রকাশ করা হয়েছে।
বিধি অনুসরণ না করে ফলাফল প্রকাশের বিষয়ে জানতে পিএসসির চেয়ারম্যান ইকরাম আহমদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ইত্তেফাককে জানান, দাপ্তরিক কাজে ব্যস্ত আছি। বিষয়টি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ক্যাডার) ভালো বলতে পারবেন। আপনি এ বিষয়ে উনার সঙ্গে কথা বলেন।
এ বিষয়ে পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ক্যাডার) আ ই ম নেছার উদ্দিনের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এসএমএস দিয়ে কথা বলার অনুরোধ জানানো হলেও তাতে সাড়া দেননি।
গত সেপ্টেম্বর মাসে ‘দ্য বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (এইজ, কোয়ালিফিকেশন অ্যান্ড এক্সামিনেশন ফর ডিরেক্ট রিক্রুটমেন্ট) রুলস ১৯৮২’ সংশোধন করে বাংলায় নতুন বিধিমালা জারি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। এই বিধি-২০-এর উপবিধি-১(ক) তে উল্লেখ আছে, ‘লিখিত পরীক্ষায় গড়ে ন্যূনতম পাস নম্বর হবে শতকরা ৫০ ভাগ।’ কিন্তু পিএসসি গত ১৮ ডিসেম্বর ৩৪তম বিসিএসের যে লিখিত পরীক্ষার ফল প্রকাশ করেছিল তা ওই বিধিসম্মত ছিল না। অর্থাত্ কমিশন নিজেদের গৃহীত সিদ্ধান্তের প্রেক্ষিতে ফল প্রকাশ করে। কমিশনের সিদ্ধান্ত ছিল, ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রে কারিগরি/পেশাগত ক্যাডারের উত্তীর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে পৃথকভাবে ৫০ নম্বর পেতে হবে। এটি মেনেই ১৮ ডিসেম্বর প্রথম ফল প্রকাশ করা হয়েছিল। প্রথমবারে ওই ফলাফলে উত্তীর্ণ হয় ৯,৮২২ জন। এর মধ্যে সাধারণ ক্যাডারে ৫,৯২২ জন, সাধারণ এবং কারিগরি/পেশাগত ক্যাডারে ২,০৯৬ ও শুধু কারিগরি/পেশাগত ক্যাডারে ১,৭৮০ জন উত্তীর্ণ হয়। আর ফলাফল স্থগিত ছিল ২৪ জনের।
কমিশনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ফলাফল প্রকাশ করা হলেও বিধি সংশোধন করে ওই সিদ্ধান্ত অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ফলে প্রথম দফার ফলাফল আইনসম্মত ছিল না। বিষয়টি কমিশনের নজরে আনলে পুনরায় বিধি মেনে গত মঙ্গলবার ফল প্রকাশ করা হয়।
দ্বিতীয় দফায় প্রকাশিত ফলাফলের বিষয়ে পিএসসি পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক (ক্যাডার) আ ই ম নেছার উদ্দিন স্বাক্ষরিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কমিশন বিসিএস (বয়স, যোগ্যতা ও সরাসরি নিয়োগের জন্য পরীক্ষা) বিধিমালা-২০১৪এর বিধি-২০এর উপবিধি-১(ক) বিধানমতে ফলাফলে সংশোধন আনা হয়েছে। ৯৫৩ জনকে সাধারণ ক্যাডার এবং কারিগরি/পেশাগত উভয় ক্যাডারের জন্য উত্তীর্ণ দেখানো হয়। যদিও ৯৫৩ জন প্রথম দফার ফলাফলে শুধু সাধারণ ক্যাডারে উত্তীর্ণ হয়েছিল। দ্বিতীয়বারের ফলাফলে কারিগরি/ পেশাগত ক্যাডারে নতুন করে আরো ১৪৪ জন উত্তীর্ণ বলে বিবেচনায় আনা হয়েছে। কারিগরি ও পেশাগত ক্যাডারে যে ১৪৪ জনকে উত্তীর্ণ দেখানো হয়েছে তাদের নাম আগে প্রকাশিত ফলাফলে ছিল না। ফলাফল স্থগিত ২৪ জনের মধ্যে ১৯ জন উত্তীর্ণ দেখানো হয়।
প্রিলিমিনারি পরীক্ষা থেকেই বিতর্ক শুরু
দুই হাজার ৫২টি পদে নিয়োগ দিতে ২০১৩ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ৩৪তম বিসিএসের প্রজ্ঞাপন প্রকাশ করে পিএসসি। ওই বছরের ২৪ মে প্রিলিমিনারি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। এতে এক লাখ ৯৬ হাজার পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। প্রিলিমিনারি পরীক্ষার ফল ৮ জুলাই প্রকাশ করা হয়। এতে ১২ হাজার ৩৩ জন উত্তীর্ণ হন। প্রথমবারের মতো প্রিলিমিনারিতে কোটাপদ্ধতি চালু করায় অনেক মেধাবী বঞ্চিত হন। অপেক্ষাকৃত কম নম্বর পেয়ে আদিবাসী ও মুক্তিযোদ্ধা কোটায় অনেকেই উত্তীর্ণ হন। এখান থেকে শুরু হয় বিতর্ক। এ নিয়ে সারাদেশে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়লে গত ১০ জুলাই ফল পুনর্মূল্যায়নের সিদ্ধান্ত নেয় পিএসসি। এরপর ১৪ জুলাই প্রচলিত পদ্ধতিতে সংশোধিত ফল প্রকাশ করা হয়। এতে মোট ৪৬ হাজার ২৫০ জন পরীক্ষার্থী উত্তীর্ণ হন। আগের উত্তীর্ণ সবাইকে রেখেই পুনর্মূল্যায়িত ফল দেয়া হয়েছে বলে পিএসসি দাবি করলেও প্রথমবার উত্তীর্ণ ২৮১ জন আদিবাসী বাদ পড়েন। এ নিয়ে বঞ্চিত আদিবাসীরা পিএসসি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কাছে লিখিত আবেদন করেন। বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করেন তারা।
এরপরেও তাদের উত্তীর্ণের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত না হওয়ায় আগের ফলে উত্তীর্ণ ৫৯  জনের পক্ষে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া গত বছরের ২৮ জুলাই হাইকোর্টে রিট করেন। ওই রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি নাঈমা হায়দার ও বিচারপতি জাফর আহমেদের হাইকোর্ট বেঞ্চ গত বছরের ৩১ জুলাই এক আদেশে প্রথম ফলে উত্তীর্ণ ৫৯ রিটকারীসহ ২৮১ জনকে বাদ দিয়ে প্রকাশিত ফল কেন অবৈধ ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চায়। এছাড়া পুনর্মূল্যায়িত ফলে আদিবাসী কোটায় আবেদনকারীদের বাদ দেয়ার কারণও জানতে চায় হাইকোর্ট। পরে হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী আদিবাসী কোটার প্রার্থীরাও লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেয়ার সুযোগ পান। এত বিপুলসংখ্যক প্রার্থীর লিখিত পরীক্ষা নেয়া নিয়ে সংকটে পড়ে পিএসসি। এরপর গত বছরের মার্চে লিখিত পরীক্ষা হয়। আগামী ২৬ জানুয়ারি থেকে ৩৪তম বিসিএসের মৌখিক পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা।