জাতীয় পার্টি (জাপা) চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ সরকার ও বিএনপির সমালোচনা করলেও জামায়াতকে নিজেদের ‘শত্রু নয়’ বলে মন্তব্য করলেন।
বৃহস্পতিবার জাপার মহাসমাবেশে তিনি বিএনপিকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন, ‘কোন মুখে রাজনীতি করেন, লজ্জা করে না? আপনাদের লজ্জা নেই। খালেদা জিয়া-আপনি যে প্রতিহিংসার রাজনীতির সংস্কৃতির ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন, এখন আপনিই সেই ইতিহাসের শাস্তি ভোগ করছেন।’ আর সরকারের সমালোচনায় বললেন ‘সরকার সুশাসন দিতে ব্যর্থ হয়েছে। দেশে চলছে গুম, খুন, অপহরণ ও দুর্নীতি’। বিদ্যুত্- গ্যাসের দাম বাড়ালে সংসদ থেকে বের হয়ে রাজপথে আন্দোলনে নামারও ‘হুমকি’ দেন তিনি।
দলের ২৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত এই মহাসমাবেশে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ও বিরোধী দলীয় নেতা রওশন এরশাদ বিভিন্ন সময়ে দল ছেড়ে যাওয়া নেতাদের আবার ফিরে আসার আহ্বান জানান। সমাবেশে এরশাদের সহোদর জিএম কাদের, দলের সাবেক মহাসচিব এবিএম রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশীদ এবং দুই প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু ও মশিউর রহমান রাঙ্গাসহ নানা কারণে এতদিন এরশাদ থেকে যারা দূরে সরে ছিলেন তারা উপস্থিত থাকলেও বক্তব্য দেয়ার সুযোগ পাননি। রওশন ও জিএম কাদের একই গাড়িতে করে সমাবেশে এসেছিলেন।
এরশাদ বিএনপি সম্পর্কে বলেন, ‘বিএনপির যুবরাজ তারেক রহমান বঙ্গবন্ধুকে রাজাকার বলেছেন। শেম, শেম (লজ্জা)। সবাই (উপস্থিত নেতা-কর্মীদের উদ্দেশ্য করে) বলো-শেম, শেম। যে বঙ্গবন্ধুকে রাজাকার বলতে পারে-সে কি কোনো সুস্থ মানুষ? এ কী সুস্থ রাজনীতি!’ তিনি বলেন, এই বিএনপি আমাকে পাঁচটি বছর সংসদে বসতে দেয়নি। আমাদের ১৪৫টি সমাবেশে ১৪৪ ধারা জারি করেছিল বিএনপি সরকার। এই সংস্কৃতি আপনি (খালেদা জিয়া) শুরু করেছিলেন। এখন সেটি আপনার ওপর এসেছে।’
খালেদা জিয়ার উদ্দেশে তিনি বলেন, আপনার দুই ছেলে বাইরে, দেখা হয় না। এটি আপনারই সৃষ্টি প্রতিহিংসার রাজনীতির ফল। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। আপনি আপনার ইতিহাসের ফল ভোগ করছেন। আমরা ক্রিকেট বা ফুটবলে চ্যাম্পিয়ন হই। আপনি আমাদের দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন করেছেন। জাতির মাথা হেঁট করেছেন। এখন আপনি কোন মুখে রাজনীতি করছেন? আপনি এই দেশে জঙ্গীবাদ সৃষ্টি করেছেন। বিচারক হত্যা করেছেন। আমার জন্য আপনি স্পেশাল কোর্ট বানিয়েছিলেন। এখন আপনি বলছেন-আপনার জন্য নাকি বিশেষ আদালত স্থাপন করা হয়েছে। ইতিহাস আপনাকে শাস্তি দিচ্ছে।
সরকারের সমালোচনা করে এরশাদ বলেন, দেশে এখন কি দেখছি? হত্যা, খুন, গুম আর অপহরণ। আমি আগেও বলেছিলাম-ঘরে থাকলে খুন, আর বাইরে গেলে গুম। নতুন প্রজন্মের হাতে পিস্তল আর রামদা দেখছি। ছয় বছরে আপনাদের নিজেদের অন্তর্কলহে ১৭২ জন খুন হয়েছে। দেশে এখন সুশাসন নেই। বিচারবিভাগ প্রশ্নবিদ্ধ। হলমার্ক ও ডেসটিনির কথা সবাই জানে। আপনারা ১৪ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করেছেন। ওই টাকা দেশে ফিরিয়ে আনুন, বিদ্যুত্-গ্যাসে ভর্তুকি দিন। তা না করে বিদ্যুত্-গ্যাসের দাম বাড়ানো হলে আমরা সংসদ থেকে বের হয়ে আসবো, রাজপথে আন্দোলনে নামবো।
জামায়াতের ডাকা হরতালের বিষয়ে তিনি বলেন ‘রাজনীতিতে এখন সহমর্মিতা নেই, শ্রদ্ধাবোধ নেই। জামায়াত তো আমাদের শত্রু নয়। আমরা আশা করেছিলাম, দুই মাস আগে ডাকা আমাদের সমাবেশের দিন হরতাল হবে না। কিন্তু জামায়াত হরতাল প্রত্যাহার করেনি।’ তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের প্রত্যাশা অনুযায়ী কোথায় এখন গণতন্ত্র? সন্ত্রাসমুক্ত শিক্ষাঙ্গণ ও দুর্নীতিমুক্ত সমাজ কোথায়? সংগ্রাম ও আন্দোলনের মধ্য দিয়ে আমরাই জনগণের সেই প্রত্যাশা পূরণ করব। ছাত্ররাজনীতির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে একসঙ্গে আলোচনায় বসতে তিনি সব দলের প্রতি আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, সংসদীয় পদ্ধতির জন্য নয়, আমার ভয়ে রাষ্ট্রপতি শাসিত পদ্ধতি বাদ দেয়া হয়েছে। বিচারপতি শাহাবুদ্দিন বেইমানি না করলে আমরা আবারও ক্ষমতায় যেতাম। সময়-সুযোগ পেলে এই বেইমানকে কাঠগড়ায় দাঁড় করাবো। সমাবেশ থেকে প্রাদেশিক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনসহ দলের ১৮ দফা প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করেন এরশাদ।
রওশন এরশাদ বলেন, যখনই নির্বাচন আসে তখনই আমাদের দলে বিভক্তি সৃষ্টি হয়। এরশাদের নির্দেশেই ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নিয়েছি।
জাপার সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রেজাউল ইসলাম ভূঁইয়ার পরিচালনায় এতে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন- সাইদুর রহমান ট্যাপা, এসএম ফয়সল চিশতি, জহিরুল আলম জহির, হাজী আলাউদ্দিন, অধ্যাপক ইকবাল হোসেন রাজু, দিদারুল আলম দিদার ও শাহআলম তালুকদার প্রমুখ।