তখনো পুব আকাশে সূর্য ওঠেনি। পড়েনি শিশির ভেজা ঘাসে কারো পায়ের পরশ। কুয়াশায় ঘন প্রকৃতি হয়ে আছে ধোঁয়াটে। বেলা খনিকটা বাড়লেও প্রকৃতিতে সূর্যের দেখা তখনো মেলেনি। কুয়াশা আর গাছের ছায়ায় সূর্যের আলো ছিল ম্রিয়মাণ। শিরশিরে হিম হাওয়া শরীরে জানান দেয় পুরোদমে শীত এসেছে রাজধানীতে। কুয়াশাচ্ছন্ন এমনি প্রকৃতিতে শুক্রবার সকালেই শুরু হয়েছে উত্সবপ্রিয় বাঙালির ‘পৌষমেলা-১৪২১’।
রমনার মূল ফটকে পা রাখতেই ভেসে আসে পৌষের গান—‘পৌষের কাছাকাছি রোদ মাখা সেই দিন/ফিরে আর আসবে কি কখনো’, ‘শ্যামলা বরণ বাংলা মায়ে/রূপ দেখ যা আয় রে আয়’, ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে/আয়রে ছুটে আয় আয় আয়...’। ‘শান্তির পায়রা উড়ূক পৌষের আকাশে’ এই প্রতিপাদ্য নিয়ে শুরু হয়েছে তিন দিনের পৌষ মেলা।
পৌষমেলা মূলত শীতের পিঠা পুলির উত্সব। আত্নীয়-স্বজন ও বন্ধুত্বের সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় করতে এ উত্সব বিশেষ ভূমিকা রাখে। এ বছর অসাম্প্রদায়িক এই মেলা পর্দাপণ করছে পঞ্চদশ বছরে।
সকাল ৭ টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এবং আগামীকাল বিকাল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত চলবে এই মেলা। রমনার বটমূলে তিন দিনব্যাপী মেলার উদ্বোধন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক। তিনি বলেন, ছয় ঋতুর দেশ বাংলাদেশ। এদেশের মতো আর কোন দেশে এমন ছয় ঋতুর বৈচিত্র চোখে পড়ে না। নতুন প্রজন্ম আমাদের এই ঋতুর বৈচিত্র, ঐহিয্যবাহী সংস্কৃতির নঙ্গে পরিচিত নয়। তাদের এ সব জানাতে হবে।
পৌষমেলা উদযাপন পরিষদের সভাপতি গোলাম কুদ্দুছ বলেন, ‘নতুন প্রজন্মের কাছে গ্রাম বাংলার ঐতিহ্য তুলে ধরতেই এ উত্সবের আয়োজন। ঐতিহ্যবাহী এই উত্সবগুলো মানুষে মানুষে মেলবন্ধন সৃষ্টি করে।’
আলোচনা শেষে অতিথিরা গ্রামীণ বাংলার ঐতিহ্যবাহী আইলা জ্বালিয়ে মেলার উদ্বোধন করেন। এ সময় আবৃত্তি শিল্পী রফিকুল ইসলাম পাঠ করেন শুকান্তের শীতের কবিতা ‘প্রাপ্তি’। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আরো উপস্থিত ছিলেন বাবুল বিশ্বাস, আবুল ফারাহ পলাশ প্রমুখ। পৌষ মেলার উদ্বোধনী অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মানজারে হাসিন সুইট।
পৌষমেলা প্রাঙ্গণে পিঠা পুলির পসরা সাজিয়ে বসেছিল ৪৫টি স্টল। এসব স্টলে শুধু পিঠাই নয়; রয়েছে নানা পণ্যসামগ্রীর দোকানও। গরম ধোঁয়া উড়ানো ভাপা, ঝাল ও সরষে ভর্তা দিয়ে চিতই, তেলের পিঠা ছাড়াও স্টলগুলোতে ছিল দুধরাজ, পুলি, পানতোয়া, পাটিসাপটা, ফুলঝুরি, ঝালপিঠা, গোলাপ ফুল পিঠা, খেজুরের পিঠা, সেমাই পিঠা, মেরা পিঠা, পাকান পিঠা, রস পিঠা, নারকেল পিঠা, চিড়ার মোয়া, কাউনের মোয়া, ঝালপোয়া ইত্যাদি। এছাড়া যান্ত্রিক নগরীর দুষ্প্রাপ্য খেঁজুরের রসের স্বাদও পাওয়া যাচ্ছে মেলায়।
মেলার সঙ্গে চলছে পৌষ বন্দনা করে সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। দলীয় সংগীত পরিবেশন করে বহ্নিশিখা শিল্পীগোষ্ঠী, সত্যেন সেন শিল্পীগোষ্টি, ক্রান্তি, ওস্তাদ মোমতাজ আলী সংগীত একাডেমী, ঋষিজ শিল্পী গোষ্ঠী ও উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। একক সঙ্গীত পরিবেশন করেন, সুজিত মোস্তফা, লিলি ইসলাম, আবু বকর সিদ্দিক, বিমল বিশ্বাস, আবিদা রহমান সেতু। দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে নৃত্যশ্রী, ধৃতী নওনালয় এর শিল্পীরা। দলীয় আবৃত্তি করে ‘প্রকাশ’ আবৃত্তি সংগঠন। এসময় গানের সুরে, নৃত্যের তালে ও কথার ছন্দে জমে ওঠে মেলার প্রাঙ্গণ।