রাজধানীতে ছড়িয়ে আছে মৃত্যুফাঁদ

রাজধানীতে ছড়িয়ে আছে অনেক মৃত্যুফাঁদ। এর মধ্যে রয়েছে অরক্ষিত গভীর নলকূপের খোলা পাইপ এবং ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল। এসব মৃত্যুফাঁদকে বিপদমুক্ত রাখার উদ্যোগ নেই সংশ্লিষ্টদের। নিশ্চিত বিপদের এ স্থানগুলো উন্মুুক্ত থাকছে মাসের পর মাস। ঢাকা ওয়াসা, দুই সিটি করপোরেশন ও তিতাস গ্যাস বিভাগের আওতায় থাকা এসব মৃত্যুফাঁদ হাতছানি দেয় প্রতিনিয়ত।

সম্প্রতি রাজধানীর শাহজাহানপুরে অরক্ষিত গভীর নলকূপের খোলা পাইপের ভেতরে পড়ে প্রাণ গেল শিশু জিহাদের। ঠিক একই রকম আরেকটি পাইপের দেখা পাওয়া গেছে সচিবালয়ের কোণে। এছাড়া নূর হোসেন স্কয়ার সংলগ্ন সচিবালয়ের উত্তর-পূর্ব কোণে ফুটপাতের ওপর একটি মোটা আকৃতির পাইপ খোলা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। রাজধানীতে ডিপ টিউবওয়েল স্থাপনের জন্য ওয়াসার কাছ থেকে অনুমতি নেয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে অনেকেই অবৈধভাবে ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন করে।
ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিম এ খান বলেন, রাজধানীতে ওয়াসার ডিপটিউবওয়েল আছে ৬৭৯টি। সবগুলো টিউবওয়েলই সচল রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। তবে ২/৪টি অচল থাকলেও সেটি সংরক্ষিত কেপিআই এলাকায় থাকায় সেখানে বাইরের লোকের প্রবেশ নিষেধ বলে জানান তিনি। 
এদিকে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা যায়, রাজধানীতে ১৫ হাজারেরও বেশি ম্যানহোল রয়েছে। এসবের বেশির ভাগই ঢাকা ওয়াসার। বাকিগুলো ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন, বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি (বিটিসিএল) ও তিতাস গ্যাস কোম্পানির।
বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানেরও ম্যানহোলের মতো গভীর গর্ত রয়েছে। তাদের কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবেই মাটির নিচে বিভিন্ন প্রযুক্তি স্থাপন করতে হয়। এসব কারণে সংশ্লিষ্টরা গভীর গর্ত করে উপরিভাগে ঢাকনাও লাগিয়ে দেন।
এদিকে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার সড়কে ম্যানহোল থাকলেও এর ঢাকনা থাকে না। স্থানীয়রা জানায়, ম্যানহোলের এসব ঢাকনা প্রায়ই চুরি হয়ে যায়। তাদের অভিযোগ, এ অপকর্মে ফেরিওয়ালা, মাদকাসক্ত ও সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা জড়িত। এছাড়া ম্যানহোলের ঢাকনা চুরি হওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নতুন করে ঢাকনা দেয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখায় না। এলাকাবাসীর পক্ষ থেকে একাধিকবার অভিযোগ করেও কোন লাভ হয় না। পারস্পরিক দোষারোপের মধ্য দিয়েই পার পেয়ে যায় সেবাদানকারী সংস্থাগুলো। ফলে দিনের পর দিন রাজধানীর ঢাকনাবিহীন ম্যানহোলগুলো অরক্ষিতই পড়ে থাকে। 
সরেজমিন নগরীর ফকিরাপুল, মতিঝিল,  নয়া পল্টন, পুরানা পল্টন, মালিবাগ, মগবাজার, রামপুরা, বাড্ডা, বাসাবো, গোড়ান, তালতলা, শান্তিনগর, মোহাম্মদপুর, আজিমপুর, রাজারবাগ, মুগদা, জুরাইন, গোপীবাগ, শহীদবাগ, কদমতলা, সবুজবাগ, ইসলামবাগ, চকবাজার, নয়াবাজার, সূত্রাপুরসহ  বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বেশির ভাগ অলিগলির ম্যানহোলে ঢাকনা নেই। এছাড়া রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান ও ধানমন্ডির রাস্তাগুলোর অধিকাংশ ম্যানহোলও ঢাকনাবিহীন মৃত্যুফাঁদ হয়ে আছে। অনেক দুর্ঘটনা ঘটলেও ব্যবস্থা নিচ্ছে না কর্তৃপক্ষ।
অনেক এলাকায় স্থানীয় বাসিন্দারা ঢাকনাবিহীন অনেক ম্যানহোলে নিজ উদ্যোগে বাঁশের কঞ্চি রেখে এর মাথায় লাল কাপড় বেঁধে রেখেছেন। আবার অনেক স্থানে গাছের ডালপালা দিয়ে রেখেছেন তারা। এসব রাস্তা দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে স্কুলশিক্ষার্থীসহ পথচারীরা দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন। উল্লেখ্য, চলতি বছরের ৪ মে রাজধানীর রমনা থানাধীন নয়াটোলা পার্কসংলগ্ন গ্রিনওয়ে গলির ম্যানহোলে পড়ে অনন্যা নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। অনন্যা গলির বাসিন্দা সিরাজুল ইসলামের মেয়ে।
রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকার বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, বিমানবন্দরের কাছে ওয়াসার পয়ঃনিষ্কাশন লাইনের ম্যানহোলের ঢাকনা রাস্তার চেয়ে অনেক উঁচু। রাতে চালকরা একটু অসচেতন হলেই দুর্ঘটনা থেকে আর রেহাই নেই। প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা।
মো:মোতালেব নামের এক রিকশাচালক বলেন, কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে ঢাকায় এসেছি পেটের তাগিদে। এসে ভাড়ায় রিকশা চালানো শুরু করলাম। একদিন ওয়াসার স্যুয়ারেজ লাইন মেরামতের জন্য খোঁড়া গর্তে পড়ে তার রিকশার চাকা ভেঙে যায়। সেদিনের উপার্জন তো গেলই সাথে আরো কয়েকশ টাকা জরিমানা হলো। ওই রিকশায় এক মা তার ছেলেকে নিয়ে স্কুল থেকে বাসায় ফিরছিলেন। তারাও আহত হলেন।
ফকিরাপুলের বাসিন্দা আমিনুল ইসলামের শিশুপুত্র কিন্ডারগার্টেনে পড়ে। প্রতিদিনের মতো সেদিনও সকাল ৮টায় স্কুলে যাওয়ার পথে কৌতূহলী হয়ে এদিক-ওদিক তাকাতে গিয়ে পড়ে গেল খোলা ম্যানহোলে। ভেঙে গেল পা। একমাস স্কুলে যাওয়া বন্ধ ছিল তার।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. সিরাজুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে জানান, ঢাকার ম্যানহোলগুলো অনেক পুরনো। এগুলো মেরামত করা জরুরি। এসব পাহারা দেয়ার মতো লোকবলও নেই করপোরেশনের। তিনি জানান, চুরির কারণে এমন ঘটনা ঘটছে। নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও করপোরেশন এসব ম্যানহোল মেরামতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
নগর সড়ক খনন নীতিমালায় বলা আছে, যে কোন সরকারি, বেসরকারি সংস্থা বা ব্যক্তিমালিকদের প্রয়োজনে নগরীর সড়ক খনন করতে পারবে। এর জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হয়। ম্যানহোল করলে তার রক্ষণাবেক্ষণ করার বিধান রয়েছে সংশ্লিষ্টদের। এসবের সমন্বয় করার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের। তবে কেউই নিজ নিজ দায়িত্বের ব্যাপারে সচেতন নয়। ফলে দিনদিন ম্যানহোল অব্যবস্থাপনা বাড়ছে। ম্যানহোলগুলো নগরবাসীর জন্য মৃত্যুফাঁদে পরিণত হচ্ছে।

এ ব্যাপারে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাকসিম এ খান বলেন, বর্তমানে ঢাকা শহরে ম্যানহোল খোলা থাকার কোন খবর তার কাছে নেই। তিনি বলেন, মাঝেমধ্যেই মাদকসেবীরা ম্যানহোলের ঢাকনাগুলো চুরি করে নিয়ে যায়। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সেগুলো পুনঃস্থাপন করা হয়।