জাতির সব অর্জনই ম্লান করে দিতে পারে মাদক

দেশে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার ঘটলেও প্রতিকারে তেমন কোন কার্যকরী ভূমিকা নেই। যতটুকু কার্যক্রম চলে তাও মাদকের ভয়াবহ বিস্তারের দিক থেকে উল্লেখ করার মতো কিছু নয়। মাদকের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত হচ্ছে ইয়াবা। এটি সহজলভ্য হওয়ায় মাদকসেবীরা ফেনসিডিল ও হেরোইন ব্যবহার কমিয়ে দিয়েছে। তাছাড়া একসঙ্গে অনেক ইয়াবা নিরাপদে  বহন করা যায়। ইয়াবা গ্রামাঞ্চল, এমনকি প্রতিটি পাড়া-মহল্লা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। গ্রামের অশিক্ষিত লোকও ইয়াবা চেনে, তারা এর নাম দিয়েছে বাবা ট্যাবলেট। গ্রামের ঘরে ঘরে বাড়ছে ইয়াবাসেবী। এমন পরিস্থিতিতে দেশের প্রতিটি পরিবার মাদকের ঝুঁকিতে রয়েছে। সর্বনাশা মাদকের থাবায় ঝড়ে পড়ছে কোমলমতি তরুণ-তরুণী ও কিশোর-কিশোরীরা। এছাড়াও প্রায় সকল পেশা, ধর্ম, বর্ণের লোককে ইয়াবা পেয়ে বসেছে। মাদকের ব্যবহার সম্মিলতিভাবে নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিকার করা না হলে জাতির সব অর্জনই ম্লান হয়ে যাবে। গতকাল মঙ্গলবার মাদক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে ‘মাদক নিয়ন্ত্রণে কি করণীয় ও এর প্রতিরোধের উপায়’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় বক্তারা এসব কথা বলেন। সভায় তারা মাদকের ভয়াবহ বিস্তার ও তরুণ সমাজকে ধ্বংসের চিত্র তুলে ধরেন। এতে মনোরোগ বিজ্ঞানী, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব, শিক্ষকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যাক্তিরা তাদের মতামত তুলে ধরেন।

মতবিনিময় সভায় বক্তারা মাদকের উেসর কথা উল্লেখ করে জানান, পাশ্ববর্তী দেশ ভারতের সীমান্তে রয়েছে শতাধিক ফেনসিডিল তৈরির কারখানা। সেখান থেকে বস্তায় বস্তায় ফেনসিডিল আসছে । সীমান্ত থেকে ট্রাক, কাভার্ডভ্যান ও নাইটকোচযোগে ফেনসিডিল রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে। বেশিরভাগ হেরোইন আসে বিমানবন্দর দিয়ে। সীমান্তপথে হেরোইন তুলনামূলক কম আসে। ইয়াবা আসে কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলার ৪০-৫০ টি পয়েন্ট দিয়ে। সেন্টমার্টিন ও শাহপরীর দ্বীপ দিয়ে ফিশিংবোটসহ বিভিন্ন নৌযানে করে আসছে ইয়াবা। টেকনাফের প্রতি ঘরে ঘরে ইয়াবা ব্যবসায়ী রয়েছে। এরা সবাই কোটিপতি। মিয়ানমার সীমান্তে গড়ে ওঠেছে ইয়াবা তৈরির কারখানা। যদিও সেখানে ইয়াবা ব্যবহার হয় না। মিয়ানমারে এটি কুটির শিল্প। এভাবে তারা প্রতিমাসে বিপুল টাকার ব্যবসা করছে। সর্বনাশ হচ্ছে বাংলাদেশের। ইয়াবার সর্ববৃহত্ বাজার বাংলাদেশ।
বক্তারা বলেন, ভারতে তৈরি হলেও ফেনসিডিল ভারতে ব্যবহার হয় না। এর বিশাল মার্কেট বাংলাদেশ। একইভাবে মাদক ব্যবসায়ীরা কোটি কোটি টাকা আয় করছে ফেনসিডিল দিয়ে। আর ধ্বংস হচ্ছে বাংরাদেশের শিক্ষিত তরুণরা। দেশে তৃতীয় স্তরে রয়েছে হেরোইনসহ অন্যান্য মাদকের চাহিদা। বাংলাদেশের সাথে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সুসম্পর্ক রয়েছে। বিজিবি ও বিএসএফ-এর ডিজি পর্যায়ের বৈঠকে মাদকের ভয়াবহ বিস্তার সম্পর্কে আলোচনা এবং প্রতিকার সম্পর্কেও দু’দেশ একমত হয়েছে। কিন্তু আলোচনার পর ফলাফল শুন্য।
বক্তারা বলেন, ভারত ও মিয়ানমার সরকার প্রতিবেশি বাংলাদেশের জনগণের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে তরুণ সমাজকে রক্ষার্থে ফেনসিডিল ও ইয়াবার উত্পাদন বন্ধ এবং হেরোইনসহ অন্যান্য মাদক বাংলাদেশে প্রবেশ বন্ধ করলেই মাদক নিয়ন্ত্রণ সহজেই সম্ভব। এর জন্য মিয়ানমার ও ভারত সরকারের সদিচ্ছা থাকতে হবে। উত্স বন্ধ হলে মাদক আপনাআপনি বন্ধ হয়ে যাবে।
তারা বলেন, এক সময় থাইল্যান্ড থেকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদশে ইয়াবা আসত। থাইল্যান্ডে ইয়াবার ব্যাপক বিস্তার ছিল। একই অবস্থা ছিল সিঙ্গাপুরে। ওই দুই দেশে মাদক ব্যবসায়ী ও পাচারকারীদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে মৃত্যুদ্ল ঘোষণা করা হয়। থাইল্যান্ডে এক মাসে চার শতাধিক মাদক ব্যবসায়ীকে প্রকাশ্যে গুলি করে মৃত্যুদ্ল কার্যকর করা হয়। সিঙ্গাপুরেও একই ব্যবস্থা নেয়া হয়। বর্তমানে ওই দুই দেশে কোন ধরনের মাদকের ব্যবহার নেই। অথচ বাংলাদেশের চিত্র উল্টো। এখানে মাদক ব্যবসায়ী ও পাচারকারীদের বিরুদ্ধে শক্ত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। মাদক ব্যবসায়ী ও পাচারকারীরা গ্রেফতার হলেও জামিনে বের হয়ে ফের মাদক ব্যবসা চালায়। এ দেশে থাইল্যান্ডের মতো মৃত্যুদ্ল দেয়া হলে মাদক নিয়ন্ত্রণ সহজেই সম্ভব। রক্ষা পেয়ে যেত তরুণ সমাজ।
মতবিনিময় সভায় বক্তারা আরো বলেন, মাদকের কারণে বর্বরতা, নিষ্ঠুরতাসহ অপরাধ বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ দেশে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিক্যাল কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ইয়াবা আসক্তের সংখ্যা বেশি। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে ইয়াবা ব্যবহার ব্যাপক। মাদক কেনার টাকার জন্য আসক্তরা ছিনতাই, ডাকাতি ও টাকার বিনিময়ে খুনসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এমনকি মা বাবা ও সন্তাদেরকেও খুন করতে দ্বিধা বোধ করে না মাদকাসক্তরা। সম্প্রতি পুলিশ ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান ও তার স্ত্রীকে একমাত্র কন্যা স্কুলপড়ুয়া ছাত্রী ঐশী চামেলীবাগের বাসায় নির্মমভাবে হত্যা করে। ঐশী ইয়াবা আসক্ত ছিল। গত বছর অক্টোবরে মানিকগঞ্জের সিঙাইরে মাদকাসক্ত পুত্র সাইদুর রহমান তার বাবা মহিউদ্দিন প্রামাণিক (৬০) ও মা সুফিয়া প্রামাণিককে (৫০) কুপিয়ে হত্যা করে। মাদক কেনার টাকা না দেয়ায় তাদেরকে খুন করা হয়। ওই বছরই সিলেট গোলাপগঞ্জে মাদকাসক্ত পুত্র ফরুখ মিয়া তার মা শামসুন্নাহার (৫০), শিশু ছেলে তানভীর আহমদ (৪), বড় বোন নাজনীন নাহার (৩৬) ও আত্মীয় হনুফা বেগমকে (৭০) কুপিয়ে হত্যা করে। মায়ের কাছে মাদক কেনার টাকা চাইলে টাকা না দিয়ে উল্টো ধমক দিলে ফরুখ এ চারজনকে হত্যা করে।
প্রতিকারের উপায় হিসেবে বক্তারা বলেন, ইয়াবাসহ মাদকাসক্তদের মস্তিষ্কের বেশি ক্ষতি হয়। লোপ পায় মনুষত্ব। সবসময় তারা অস্থির থাকে। কাকে হত্যা করছে তা তারা বুঝে না। খুন করেও তাদের মধ্যে অনুশোচনা নেই। ইয়াবা ব্যবহারকারীদের প্রাথমিকভাবে কিছুদিন যৌন ক্ষমতা থাকলেও তারা পরবর্তীতে স্থায়ীভাবে যৌনক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তারা কিডনি, ক্যান্সার, লিভার, এইডসসহ বিভিন্ন মরণ ও জটিল রোগে আক্রান্ত হয়। যা ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। যেসব ঘরে পিতা মাতার মধ্যে দ্বন্দ্ব থাকে তাদের সন্তানদের মধ্যে ইয়াবা আসক্ত হওয়ার শংকা  বেশি। আগে ঘর থেকেই ইয়াবার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করতে হবে। মাদকের ক্ষতির দিকটা পাঠ্যপুস্তকে সম্পৃক্ত করতে হবে। শিক্ষকরা ছাত্র-ছাত্রীদের মাদকের ক্ষতির দিক ভালোভাবে ক্লাশের মধ্যে উপস্থাপন করলে বড় একটি শ্রেণীকে প্রতিকারের আওতায় আনা সম্ভব। এছাড়াও মসজিদের ইমামদেরকে এর মধ্যে সম্পৃক্ত করা যায়। প্রতি শুক্রবার জুম্মার নামাজের খুতবায় মাদকের ক্ষতির দিক তুলে ধরলেও এই দানবের হাত থেকে প্রতিকার পাওয়াসম্ভব। এছাড়া অন্যান্য ধর্মাম্বল্মবীদের ক্ষেত্রে ধর্মগুরুদের সম্পৃক্ত করা যায়। আর মাদকাসক্তদেরকে সুস্থ করে তেলার পর এরা পরবর্তীতে যাতে আর আসক্ত না হতে পারে সেক্ষেত্রে পুনর্বাসন  জরুরি। আগামীতে যাদের হাতে নেতৃত্ব যাবে তারাই মাদকাসক্ত হচ্ছে। বক্তারা আশংকা প্রকাশ করে বলেন, এ অবস্থা যদি চলতে থাকে, তাহলে আগামী দশ বছর পর পর এ দেশ মেধাশুন্য  হয়ে যেতে পারে।

 মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. বজলুর রহমানের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত মহাপরিচালক আমির হোসেন, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সুভাষ সিংহ, সিপিবির নেতা ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব রুহিন হোসেন প্রিন্স এবং বিশিষ্ট মনরোগ বিজ্ঞানী ডা. মুহিত কামাল ও ডা. ফারুক আলম প্রমুখ।