সহিংসতায় দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন ঝুঁকিতে দেশ

বাংলাদেশে নতুন করে দেখা দেয়া রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংসতার ফলে দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়নের ঝুঁকি বাড়ছে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হচ্ছে। সহিংস পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তা অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সরাসারি বাধাগ্রস্তই করবে না বরং মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার সম্ভাবনার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।

এমনিতেই তীব্র জ্বালানি সংকট ও ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদের কারণে এখানে ব্যবসা পরিচালনা কঠিন। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ইতিমধ্যেই দেশের রফতানি ও রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় পিছিয়ে আছে। রাজনৈতিক এই সহিংসতা অব্যাহত থাকলে প্রধান রফতানি আয় তৈরি পোশাক শিল্প দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ চাহিদা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, ভোক্তার আস্থা নষ্ট করবে। সেই সাথে রাজস্ব আদায়ে বিরূপ প্রভাব পড়বে এবং মূল্যস্ফীতি বাড়বে। হরতাল ও অবরোধ চলাকালে ব্যবসা ও শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক সুদ মওকুফ করার জন্য ব্যবসায়ীরা দাবি জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সি ফিচও তাদের প্রতিবেদনে সম্প্রতি উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। হংকং ভিত্তিক সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বিরোধ বাড়ছে, এর ফলে অনিশ্চয়তা সৃষ্টি হয়েছে। ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে ৩০০ মানুষ নিহত হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেও উত্তেজনা চরমে উঠেছে। ফলে এ ধরনের পরিস্থিতিতে বৈদেশিক বিনিয়োগকারীদের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন হতে পারে।
অবশ্য বাংলাদেশে অস্থির রাজনীতি ও অবরোধের পরও বিগত সময়ে অর্থনীতি তার শক্তিশালী অবস্থান প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে। ২০১৪ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ১ শতাংশ। ২০১৩ সালের শেষ দিকে কয়েক মাস জুড়ে আন্দোলন চলতে থাকায় কারখানা সচল রাখতে শ্রমিকরা রাতেও কাজ করেছিলেন।
তবে এ পরিস্থিতি চলতে থাকলে ব্যবসায়ীরা তাদের সিদ্ধান্ত বদলাতে পারেন। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা তাদের বিনিয়োগ অন্য দেশে সরিয়ে নিয়ে যেতে পারেন। ফিচ মনে করে, বাংলাদেশে গভীর সমস্যা হলো চলতে থাকা রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং সহিংসতার পুনরাবৃত্তি। বাংলাদেশের উন্নয়নে তৈরি পোশাক শিল্প বড় ভূমিকা রাখছে। এদেশে মোট রফতানির ৮১ ভাগ হলো তৈরি পোশাক শিল্প, যা মোট জাতীয় উত্পাদনের (জিডিপি) ১৫ শতাংশ। অর্থাত্ একটি বড় খাতে রফতানি খাত নির্ভর হয়ে পড়ার ফলে দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকি সৃষ্টি করছে। একটি খাত ক্ষতিগ্রস্ত হলে পুরো রফতানি খাতই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বৈদেশিক লেনদেন ভারসাম্যে বিরূপ প্রভাব পড়বে বলে মনে করে সংস্থাটি।
ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি প্রত্যাহার না হলে আইনগত ব্যবস্থার হুমকি
ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই দেশের অর্থনীতির স্বার্থে হরতাল-অবরোধের মতো নেতিবাচক রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে। শনিবার সংগঠনের কার্যালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সভাপতি কাজী আকরামউদ্দিন আহমদ বলেন, এ ধরনের কর্মসূচির বিপক্ষে কঠোর অবস্থানে রয়েছে এফবিসিসিআই। সম্ভব হলে আইনের আশ্রয় গ্রহণ করার হুমকিও দেন তিনি।
তিনি উল্লেখ করেন, বিরাজমান সংঘাতময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি সামগ্রিক অর্থনীতির উপর যে বিরূপ প্রভাব ফেলছে তা বিবেচনায় নিয়ে অবরোধ কর্মসূচি প্রত্যাহার করার জন্য সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলসমূহের প্রতি আকুল আবেদন জানাচ্ছি। দেশের সার্বিক আর্থসামাজিক উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জনের গতিশীলতা অব্যাহত রাখার স্বার্থে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ফলপ্রসূ আলোচনার মাধ্যমে বিদ্যমান রাজনৈতিক সংকট মোকাবেলায় ও সমাধানের পথ বের করা হোক—এটাই ব্যবসায়ী সমাজ কামনা করে।
তিনি জানান, গত কিছুদিনের অবরোধ কর্মসূচিতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবহন, উত্পাদন এবং পর্যটন  খাত। অবরোধের কারণে পরিবহন চলাচল বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ২ লাখেরও বেশি বাস, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান অলস পড়ে আছে এবং ২০ লাখেরও বেশি পরিবহন শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। সব মিলিয়ে পরিবহন খাতে দৈনিক প্রায় ২০০ কোটি টাকা ক্ষতি হচ্ছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে উত্পাদন এবং পণ্য পরিবহন (সাপ্লাই চেইন) ব্যবস্থায়।
তিনি বলেন, পরিবহন না থাকায় কৃষি পণ্য সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটছে যার কারণে কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কাঁচামাল সরবরাহ না হওয়ায় উত্পাদন কর্মকাণ্ডও ব্যাহত হচ্ছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প পুঁজিহারা হচ্ছে। উত্পাদন ব্যবস্থা বন্ধ থাকা সত্ত্বেও শিল্প প্রতিষ্ঠানের খরচ মিটানোর জন্য অতিরিক্ত সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে ব্যাংকে শ্রেণিবিন্যাসকৃত ঋণের পরিমাণ আশংকাজনকভাবে বেড়ে যাচ্ছে, যা ব্যাংকিং ব্যবস্থার উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
চলমান অবরোধ কর্মসূচির জন্য দেশের পর্যটন খাত বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে। দেশের মোট বিনিয়োগের প্রায় ৮০ শতাংশ বেসরকারি খাতের। রফতানি এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও সিংহভাগ অবদানই বেসরকারি খাতের। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে যদি বেসরকারি খাতের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয় তাহলে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং দেশে মানবিক বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। একদিনের হরতাল বা অবরোধে দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে থাকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, চলমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি না হলে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বিকেএমইএর আহ্বান

গতকাল বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) পক্ষ থেকে রাজনৈতিক অবরোধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানানো হয়েছে। এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি একেএম সেলিম ওসমান উল্লেখ করেন, বর্তমান অস্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে কারখানায় সকল কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পরও আমরা সময়মত নিট পণ্যের চালান জাহাজিকরণ করা যাচ্ছে না। ফলে এলসির শর্তানুযায়ী উচ্চ খরচে আকাশপথে পণ্য রফতানি করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন রফতানিকারকগণ বিপুল আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, তেমনি সময়মত পণ্য রফতানি কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার কারণে ক্রেতারাও আস্থা হারাচ্ছেন।