অবরোধ, শীত উপেক্ষা করে মানুষের স্রোত

আজ আখেরি মোনাজাত

‘আল্লাহু আল্লাহু’ ধ্বনিতে এখন মুখরিত তুরাগ তীর। অবরোধ, শীত, ঠাণ্ডা বাতাস উপেক্ষা করে দেশ-বিদেশের লাখ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসল্লির জিকির আসকার ইবাদত বন্দেগীতে টঙ্গীর ইজতেমা ময়দান এখন এক পবিত্র পুণ্যভূমিতে পরিণত হয়েছে। আজ রবিবার বহু প্রত্যাশিত আখেরি মোনাজাতের মধ্যে দিয়ে শেষ হবে তিন দিনব্যাপী বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। আখেরি মোনাজাতে নিজ নিজ গুনাহ মাফ এবং আত্মশুদ্ধির জন্য মহান আল্লাহ তাআলার দরবারে বিশেষ রহমত কামনা করা হবে।

গতকাল শনিবার ইজতেমা প্রাঙ্গণ ও আশপাশের এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, শুধু মানুষ আর মানুষ। অনেকেই অবরোধসহ বিভিন্ন কারণে গত দুইদিন ইজতেমায় অংশ না নিলেও আজ বহু কাঙ্ক্ষিত আখেরি মোনাজাতে শরিক হয়ে আল্লাহর দরবারে দুই হাত তুলে পাপ মোচনের আশায় ছুটে আসছেন দূর-দূরান্ত থেকে। গতকাল টঙ্গী অভিমুখী বাস, ট্রাক, ট্রেন, লঞ্চসহ বিভিন্ন যানবাহন ছিল মানুষে ঠাসা। আবার অনেককেই পায়ে হেঁটে ইজতেমাস্থলে পৌঁছতে দেখা গেছে। মোনাজাতে শরিক হতে বিপুল সংখ্যক নারীও টঙ্গীর আশপাশে এসে অবস্থান নিয়েছেন। অনেকে তাদের আত্মীয়-স্বজনদের বাড়িতে উঠেছেন। আজ আখেরি মোনাজাতের আগ পর্যন্ত এ জনস্রোত অব্যাহত থাকবে।
আখেরি মোনাজাত: আজ রবিবার ইজতেমা ময়দানের বিদেশি নিবাসের পূর্বপাশে স্থাপিত মোনাজাত মঞ্চে সকাল ১১টার দিকে বহু কাঙ্ক্ষিত আখেরি মোনাজাত শুরু হবে। এর মধ্যে দিয়ে শেষ হবে তাবলিগ জামাত আয়োজিত ৫০তম বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ এ মোনাজাতে প্রায় ২০ লাখেরও বেশি মুসল্লি অংশ নেবেন বলে আয়োজকরা আশা করছেন। এর আগে অনুষ্ঠিত হবে হেদায়েতি বয়ান। ভারতের হযরত মাওলানা মুহাম্মদ সা’দ হেদায়েতি বয়ান করবেন। তাবলিগ জামাতের শীর্ষস্থানীয় মুরুব্বীদের পরামর্শের ভিত্তিতে তাবলিগ জামাতের দিল্লীর মারকাজের শূরা সদস্য হযরত মাওলানা মুহাম্মদ সা’দ ফজিলতপূর্ণ এ আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রথম পর্বের আখেরি মোনাজাতে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া বিশেষ ব্যবস্থায় অংশ নেবেন বলে জানা গেছে। এছাড়া লাখ লাখ মুসল্লির সঙ্গে মন্ত্রী পরিষদের সদস্যবর্গ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সরকারের পদস্থ কর্মকর্তা ও বিদেশি কূটনীতিকরা অংশ নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
আখেরি মোনাজাত প্রচারের জন্য গণযোগাযোগ অধিদপ্তর ইজতেমা ময়দান হতে আব্দুল্লাহপুর ও বিমানবন্দর রোড পর্যন্ত এবং গাজীপুর জেলা তথ্য অফিস ইজতেমা ময়দান হতে চেরাগআলী, টঙ্গী রেল স্টেশন, স্টেশন রোড ও আশপাশের অলিগলিতে পর্যাপ্ত মাইক সংযোগের ব্যবস্থা করেছে বলে জানিয়েছেন জেলা তথ্য অফিসার নাসিমা আক্তার।
মোনাজাত উপলক্ষে মুসল্লিদের সুবিধার্থে শনিবার বিকাল থেকেই ওই এলাকায় যানবাহন চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। রবিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বলবত্ থাকবে। সূত্র জানায়, আজ ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক ও টঙ্গী-কালিগঞ্জ সড়কে দুপুর পর্যন্ত যানচলাচল বন্ধ থাকবে। এছাড়া যানচলাচল বন্ধের কারণে টঙ্গী ও আশপাশের এলাকার কল-কারখানা আজ বন্ধ রাখা হবে।
উল্লেখ্য, গত ৯ জানুয়ারি শুরু হয়েছে বিশ্ব ইজতেমার প্রথম পর্ব। আজ প্রথম পর্ব শেষে মাঝে ৪ দিন বিরতি দিয়ে দ্বিতীয় পর্ব শুরু হবে আগামী ১৬ জানুয়ারি।
যেসব পথে গাড়ি চলবে:শনিবার রাত ১১টার পর থেকে গাজীপুরের ভোগড়া বাইপাস থেকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, আশুলিয়া-বাইপাইল, কামারপাড়া, স্টেশন রোড থেকে মীরের বাজার পর্যন্ত গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকবে। বিকল্প পথ হিসেবে ময়মনসিংহ ও সিলেট থেকে যারা ঢাকা যাবেন, তাদের ভোগড়া বাইপাস থেকে মীরের বাজার হয়ে কাঁচপুর দিয়ে অতিক্রম করতে হবে। আবার যারা রাজশাহীসহ উত্তরবঙ্গ থেকে ঢাকা যাবেন, তাদের নবীনগর-চন্দ্রা কিংবা আশুলিয়া-বাইপাইলের ধৌড় ব্রিজ হয়ে বেড়িবাঁধ দিয়ে অতিক্রম করতে বলা হয়েছে। মোনাজাতের দিন ঢাকা থেকে ইজতেমাস্থলগামী মুসল্লিদের টঙ্গী ব্রীজ পরিহার করে আব্দুল্লাহপুর-আশুলিয়া সড়ক ধরে পায়ে হেঁটে ইজতেমা ময়দানের পশ্চিমপাশের ভাসমান সেতু দিয়ে ময়দানের ভেতরে প্রবেশের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।
বিশেষ ট্রেন: টঙ্গীর রেলওয়ে স্টেশনের কর্মকর্তা জানান, আখেরি মোনাজাত উপলক্ষে আখাউড়া, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন রুটে প্রায় ৩০টি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এছাড়া আখেরি মোনাজাতের আগে ও পরে সকল ট্রেন টঙ্গী স্টেশনে যাত্রা বিরতি করবে। 
বয়ান: গতকাল বাদ জোহর মাওলানা শওকত আলী ইমান আমল, জাহান্নাম, জান্নাত ও দাওয়াতে মেহনতের উপর গুরুত্বপূর্ণ বয়ান রাখেন। তিনি বলেন, মানুষ যখন স্বেচ্ছাচারী জীবন-যাপন করে তখন তারা পেরেশানিতে পড়ে। তাই রাসূলে পাক (সা.) এর জীবন ব্যবস্থাকে অনুসরণ করতে হবে। ফিরে আসতে হবে আল্লাহর দ্বীন অনুযায়ী জীবন ব্যবস্থার মধ্যে। তবেই কামিয়াব হওয়া যাবে। আল্লাহর রহমতের নেকবান্দা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। ঈমানী মেহনতের মাধ্যমে ঈমানকে মজবুত করতে হবে। তবেই দো-জাহানের শান্তি মিলবে।
পাঁচ মুসল্লির মৃত্যু: শনিবার দুপুর পর্যন্ত বিশ্ব ইজতেমায় আগত পাঁচ মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে। শুক্রবার রাত ১১টার দিকে ইজতেমা মাঠেই অসুস্থ হয়ে মারা যান জাহাঙ্গীর আলম (৭০)। তিনি ঢাকার দক্ষিণ বাড্ডার মাহমুদুল হাসানের ছেলে। একই দিন সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মারা যান মো. আবদুস সালাম (৫০)। তিনি গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার কিত্তনীয়া এলাকার মহর আলীর ছেলে। রাত ১২টা ৪০ মিনিটের দিকে মারা যান নাটোরের নলডাঙ্গা এলাকার মৃত নাদের মন্ডলের ছেলে কফিল উদ্দিন (৬৫)। শনিবার সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে অসুস্থ হয়ে পড়েন লিয়াকত আলী (৭৫)। তাত্ক্ষণিক টঙ্গী হাসপাতালে নেয়া হলে সেখানে তার মৃত্যু হয়। সকাল ৯টা ২০ মিনিটের দিকে মারা যান কিশোরগঞ্জের ভৈরব থানার ভৈরবপুর এলাকার খাইরুল আমিন (৫৪)। এনিয়ে ইজতেমায় আগত মোট ৭ জন মুসল্লি মারা গেলেন। এছাড়া ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের মধ্যে বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত ২১ জনকে টঙ্গী হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। গুরুতর অসুস্থ ৭ জনকে ঢাকায় পাঠানো হয়। ৩১২২ জন রোগী প্রাথমিক চিকিত্সা নিয়েছেন।
খোলা আকাশের নিচে মুসল্লিরা: বৃহস্পতিবার বিকালের আগেই ইজতেমা মাঠ লাখ-লাখ ধর্মপ্রাণ মুসল্লিতে কানায়-কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। তারপরও বিশ্ব ইজতেমা মাঠের দিকে বানের পানির মতো ছুটছেন মুসল্লিরা। শনিবার সকালে ইজতেমা মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, যেসব মুসল্লি­ বাস, ট্রাক, ট্রেন, নৌকা, লঞ্চ, রিকশা-ভ্যানে করে দূর-দূরান্ত থেকে আসছেন মূল মাঠে তাদের স্থান সংকুলান করা যাচ্ছে না। মাঠ ছাপিয়ে ধর্মপ্রাণ লাখ-লাখ মুসল্লি­ এখন খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন।
যৌতুকবিহীন বিয়ে: গতকাল বাদ আছর বিশ্ব ইজতেমায় ১২০ জোড়া যৌতুকবিহীন বিয়ে অনুষ্ঠিত হয়েছে। তাবলিগের রেওয়াজ অনুযায়ী ইজতেমার দ্বিতীয় দিন বাদ আছর বয়ান মঞ্চের পাশে বসে যৌতুকবিহীন বিয়ের আসর। বিয়েতে মোহরানা ধার্য করা হয় দেড়শ’ তোলা রূপা বা এর সমমূল্য অর্থ। বিয়ের পর নবদম্পতিদের সুখ-সমৃদ্ধিময় জীবন কামনা করে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের দরবারে মোনাজাতের মাধ্যমে দোয়া করা হয় এবং মঞ্চের আশপাশের মুসল্লিদের মাঝে খোরমা, খেজুর ও মিষ্টি বিতরণ করা হয়।
চিল্লাভুক্ত হচ্ছেন মুসল্লিরা: ইজতেমার প্যান্ডেলের উত্তর-পশ্চিমে ‘তাশকিলের কামরা’ স্থাপন করা হয়েছে। বিভিন্ন খিত্তা থেকে বিভিন্ন মেয়াদে চিল্লায় অংশ গ্রহণেচ্ছু মুসল্লিদের এ কামরায় আনা হচ্ছে এবং তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। পরে কাকরাইলের মসজিদের তাবলিগি মুরুব্বীদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এলাকা ভাগ করে তাদের দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাবলিগের কাজে পাঠনো হবে।
অবৈধ দোকান, চড়াদাম: ইজতেমা মাঠের আশপাশে গজিয়ে উঠেছে হাজার হাজার অবৈধ দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক দলের নেতাদের ছত্রছায়ায় এ সকল অবৈধ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান বসানো হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এর মাধ্যমে সুযোগ সন্ধানীরা হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। এদিকে এসব দোকানপাটে জিনিসপত্রের দাম অনেক চড়া। চাল-ডালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। ইজতেমায় আগত মুসল্লিরা এক প্রকার বাধ্য হয়েই এসব কিনছেন। ব্যবসায়ীরা বলছেন, ২০ দলীয় জোটের ডাকা অবরোধের কারণে মালামাল সরবরাহ কম থাকায় মূল্য একটু বেশি।

১৭ জন আটক, ১০ মামলা: ইজতেমা মাঠ ও আশপাশ এলাকা শুক্রবার রাত থেকে শনিবার সকাল পর্যন্ত পকেটমার ও ছিনতাইকারীসহ নানা অভিযোগে ১৭ জনকে আটক করেছে পুলিশ ও র্যাব। এছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালত ইজতেমা মাঠের আশপাশ এলাকায় অভিযান চালিয়ে ভেজাল খাদ্য প্রস্তুত, সংরক্ষণ ও বিক্রির অপরাধে ১০টি মামলা এবং ১৩ হাজার টাকা জরিমানা করে। এছাড়া গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের পাশে লাগানো বিভিন্ন ব্যানার, ফেস্টুন ও সিনেমার অশ্লীল পোস্টার উচ্ছেদ করা হয়েছে।