সংলাপ হবে কী নিয়ে!

সংবিধান অনুযায়ী সরকারের পাঁচ বছর মেয়াদ পূরণের আগে অর্থাত্ ২০১৯ সালের আগে নির্বাচনে সায় নেই সরকারের। বিএনপি দ্রুত আগাম নির্বাচনের পাশাপাশি নির্দলীয় সরকারের অধীনে সেটি অনুষ্ঠানেরও দাবি জানাচ্ছে। এ নিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী অবস্থানে দুই পক্ষ। দাবি আদায়ে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার ডাকা দেশব্যাপী লাগাতার অবরোধে গতকাল ষষ্ঠদিন পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেকে আহত হয়েছেন, কয়েকজনের প্রাণও গেছে। উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে কেউ কেউ সংলাপের তাগিদ দিচ্ছেন। কিন্তু এই সংলাপের প্রয়োজনীয়তা কেন এবং এর এজেন্ডা কী হবে— তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহলে। তাদের মতে, দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায় অনুযায়ী সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটেছে। কখন, কার অধীনে কীভাবে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে— অর্থাত্ নির্বাচিত সরকারের ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়া বাতলানো আছে সংবিধানে। বিদ্যমান সংবিধান অনুযায়ী এক মুহূর্তের জন্যও অনির্বাচিত সরকার গঠনের কোনো সুযোগ নেই। বিএনপির দাবির সঙ্গে বিদ্যমান সংবিধানের অবস্থান বিপরীতমুখী। ফলে কোনো কারণে সরকার ২০১৯ সালের আগেই নির্বাচন দিতে সম্মত হলেও সেটি বিদ্যমান সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে থেকেই করতে হবে। এক্ষেত্রে বিএনপিকেও নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করা উচিত। সাংবিধানিক কাঠামোর ভেতরে থেকে সংলাপ বা নির্বাচনের আগ্রহ থাকলে তা খোলাসা করা হলে সমাধানের উপায় বের হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দেবে বলে মনে করছেন এই মতদাতারা।

এ বিষয়ে দেশের প্রবীণ আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক-উল হক গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘রাজনৈতিক সমঝোতা হলে সংবিধান বাধা হয়ে দেখা দেবে না। সমঝোতা হলে প্রয়োজনে সংবিধান সংশোধন হবে, আবার সমঝোতায় অন্য কোনো ফর্মুলাও বের করা যেতে পারে। কিন্তু সেই সমঝোতার জন্যই সংলাপটা জরুরি। দেশের গণমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে দুই নেত্রীকে সংলাপে বসতে হবে। নির্বাচনের পর যেন আর ঝগড়াঝাটি না হয়, সেজন্যই সংলাপে গণমান্য লোকদেরও রাখার কথা বলছি।’ তিনি বলেন, বিচারপতি এবিএম খায়রুল হকের রায়ে দশম ও একাদশ নির্বাচনের ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের বিষয়ে বলা আছে। কিন্তু সেখানেও নির্বাচিত ব্যক্তিদের নিয়েই সরকার গঠনের কথা বলা হয়েছে। সেজন্য শুধু তত্ত্বাবধায়ক-তত্ত্বাবধায়ক না করে বিএনপিরও বাস্তবতার নিরিখে কথা বলা দরকার।
ব্যারিস্টার রফিক আরো বলেন, চলমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের পথ কি, এই প্রশ্নের জবাবে আমি এক কথায় বলবো— মধ্যবর্তী নির্বাচনই সমাধানের একমাত্র পথ।
বর্তমান পরিস্থিতি থেকে বের হওয়ার জন্য ‘আলোচনা’র কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খানও। তিনি গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, ‘সংলাপে বসে সমঝোতার পথ বের করতে হবে। মূল সমস্যা কোথায়, সেখান থেকে বের হওয়ার উপায় কি— আলোচনায় বসে সেগুলোই ঠিক করতে হবে। আলোচনায় না বসে বাইরে থেকে শুধু কথাযুদ্ধ চালিয়ে গেলে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন বলেন, নির্বাচন নিয়ে যখনই সংকট দেখা দেয়, তখন সব ক্ষমতাসীনরাই সংবিধানের দোহাই দেন। ’৯৬ ও ২০০৬ সালে বেগম খালেদা জিয়াকেও আমরা সংবিধানের দোহাই দিতে দেখেছি। পাঁচ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে এখনকার সরকারও একই কথা বলছে। আমাদের মনে রাখা দরকার, যখন যারা ক্ষমতায় থাকে সবাই যার যার মতো সংবিধান সাজিয়ে নেয়। ১৯৭৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সামরিক সরকারগুলোও সংবিধাানকে ইচ্ছামতো ব্যবহার করেছে। যদি সংবিধান আমাদের কাছে এত পবিত্র গ্রন্থ হয়ে থাকে তাহলে ’৭২ এর সংবিধান আমরা ফিরে পেলাম না কেন? কাজেই সংবিধান সমস্যা নয়, সংকটটি রাজনৈতিক। তিনি বলেন, শুধু উপদেশ-পরামর্শ না দিয়ে সুশীল সমাজেরও এখন উদ্যোগী হওয়ার সময় এসেছে। জনগণকে সম্পৃক্ত করে তাদের উচিত একটি মঞ্চ বানানো। সেই মঞ্চের একটিই দাবি হবে- ক্ষমতাসীনদের এবং ক্ষমতার বাইরে যারা রয়েছেন তাদেরকে অবিলম্বে সংলাপে বসতে হবে। তার মতে, সংলাপে বসেই সমাধানের উপায় বের করতে হবে।
রফিক-উল হক, ড. আকবর আলী খান ও সৈয়দ আনোয়ার হোসেন সংলাপের ওপর সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করলেও কেউ কেউ এমনও বলছেন, নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে সরকার ও বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আসলেই আলোচনার প্রয়োজন আছে কি? দেশের সংবিধান, প্রচলিত আইন ও নির্বাচনী বিধি-বিধানেই বিষয়টির জবাব রয়েছে। সব পক্ষ সংবিধান মোতাবেক অগ্রসর হওয়ার পর প্রয়োজনে আগাম নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হতে পারে। তারা এটিও বলছেন, সংসদ নিজে উদ্যোগী হয়ে কিংবা স্বপ্রণোদিতভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সংবিধান থেকে তুলে দেয়নি। সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল সংক্রান্ত উচ্চ আদালতের রায়ের প্রেক্ষিতেই সংসদকে তা বাস্তবায়ন করতে হয়েছে। সংবিধানের বিষয়ে আদালতের এখতিয়ার সম্পর্কেও প্রচলিত আইন ও সংবিধানে বলা আছে। সে মোতাবেকই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রশ্নে আদালতের রায় বাস্তবায়ন করেছে জাতীয় সংসদ।
এই বিতর্ক সম্পর্কে ট্রান্সফারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল, বাংলাদেশ-টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, সংবিধান তো পাথরে খোদাই করা কোনো জিনিস নয়। সেটি পরিবর্তন-সংশোধনশীল। কেউ যদি বলেন যে, সংবিধানে হাত দেয়া যাবে না, তাহলে তাদেরকে এই প্রশ্নও করা যেতে পারে, ’৭২ এর সংবিধান কি এখন আছে? তত্ত্বাবধায়ক তো সংবিধানে ছিল না, সেটি কীভাবে যুক্ত করা হয়েছিল? আমরা কি এটাও নিশ্চিত করে বলতে পারবো যে পঞ্চদশ বা ষোড়শ-ই সংবিধানের শেষ সংশোধনী? আর কোনদিন সংবিধান সংশোধন হবে না? তিনি বলেন, দেশবাসী আলোচনার মাধ্যমে শান্তি চায়। সেই আলোচনা কিসের ভিত্তিতে হবে তাও ঠিক করতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকেই। মূল কথা- সমাধানের চাবিকাঠি দুই নেত্রীর হাতে।
এদিকে, খালেদা জিয়ার ডাকা অবরোধকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সংঘাত-সংঘর্ষের পাশাপাশি চোরাগোপ্তা হামলার ঘটনাও ঘটছে। বিশেষ করে, দিনের বেলায় পরিস্থিতি অনেকটা স্বাভাবিক থাকলেও সন্ধ্যার পর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যানবাহনে অগ্নিসংযোগ, ভাংচুর ও পেট্রোল বোমা নিক্ষেপের খবর পাওয়া যাচ্ছে। যানবাহনে দুর্বৃত্তদের দেয়া আগুনে ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন দগ্ধও হয়েছেন। কখন গায়ে ককটেল, পেট্রোল বোমা বা গুলি এসে পড়ে— এরকম আতঙ্ক নিয়েই জীবিকার তাগিদে ঘর থেকে বের হচ্ছে মানুষ।

এই অবস্থার অবসানে করণীয় কি? জবাবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য অধ্যাপক আবদুল মান্নান ইত্তেফাককে বলেন ‘এখন যা ঘটছে, এটি কোনো আন্দোলনের সংজ্ঞায় পড়ে না। এটিকে এক কথায় সন্ত্রাস বলা যায়। অতীতেও আমরা বিভিন্ন আন্দোলন দেখেছি, কিন্তু এরকম সন্ত্রাসী কার্যক্রম দেখিনি।’ সংলাপে বসার তাগিদ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘মধ্যবর্তী নির্বাচন চাইলে বিএনপিকে অবশ্যই সংবিধান মেনে আলোচনায় আসতে হবে। তারা সংবিধান, নির্বাচন, সরকার ও সংসদ-কিছুই মানবেন না, তাহলে আলোচনা কাদের সঙ্গে হবে, কি নিয়ে হবে? অধ্যাপক মান্নান আরো বলেন, ‘যুদ্ধের ময়দানেও আলোচনা চলে, তবে নিয়ম-নীতির ভেতরে থেকে সেটি করতে হয়।’