ভরা মৌসুমেও সিলেটের সব পর্যটন স্পট নীরব নিস্তব্ধ

মাইলের পর মাইল ঢেউ খেলানো সবুজ চা বাগান– বাগান নয় যেন থরে থরে সাজানো সবুজ গালিচা। সেই গালিচা পেরিয়ে দূরের নীল আকাশে হেলান দেয়া উঁচু পাহাড় থেকে নেমে আসা সফেদ ঝর্ণা লতাগুল্মকে হিমশীতল পরশ দিয়ে অবিরত নেমে চলেছে নিচের দিকে। পাদদেশে বিশাল আকৃতির পাথর সেই ঝর্ণার সে গ্ধকর দৃশ্য। পাথরের উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সেই স্বচ্ছ স্রোতের পরশমাখা হাত ছবিকেও হারায় মানায়।

সূর্য উঠার সাথে সাথে কুয়াশার চাদর সরে গিয়ে বিশাল হাওরের বুক ভেসে ওঠে জেলেদের মাছ ধরার দৃশ্য। আর সূর্যের উত্তাপ নিতে নিতে সেই হাওরগুলোতে নানা প্রজাতির ডানামেলা অতিথি পাখি আকাশ থেকে ঝাপটে পড়ে মাছ ধরতে, মাছ নিয়ে ছুটে যায় দিগন্তরেখা বরাবর-এমন দৃশ্য মানষকে অভিভূত করে। হারিয়ে যেতে চায় মন কোন সুদূরে। এমন দৃশ্য উপভোগ করতে প্রতি শীত মৌসুমে দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার পর্যটক সিলেটে চলে আসেন। কিন্তু চলমান রাজনৈতিক অবরোধে সিলেট অঞ্চলের সব কটি পর্যটন স্পটে এখন শুনশান নীরবতা। সকাল গড়িয়ে দুপুর, তারপর সন্ধ্যা যেন সব গ্রাস করে ফেলে বিভিন্ন পর্যটন স্পট।
প্রকৃতি কন্যা জাফলং, মাধবকুণ্ড, হামহাম জলপ্রপাত, খাসিয়া-জৈন্তিয়া পাহাড়ের মনলোভা দৃশ্য, মনোমুগ্ধকর খাসিয়া পল্লী, তামাবিল স্থলবন্দর, ভারতের চেরাপুঞ্জির নিচে ভোলাগঞ্জে সাদা পাথরের স্তূপ ও কোয়ারিতে হাজার হাজার নারী-পুরুষের কর্মমুখর পরিবেশ, সবুজ চা বাগান, খাদিম ফরেস্ট, টাঙ্গুয়া ও হাকালুকির হাওর, টেকের ঘাট, যাদুকাটা নদী, বারাইক্কা টিলা, শ্রীমঙ্গলে টি-রিসোর্ট, বিছনাকান্দি, পান্তুমাই ঝর্ণা, মাধবপুর লেক, গোলাপগঞ্জে শ্রীচৈতন্যের মন্দির, সিলেট ও সুনামগঞ্জে হাসন রাজার মিউজিয়াম, ডলুরা শহীদ মিনার, টিলাগড় ইকোপার্ক, ঐতিহাসিক ক্বিন ব্রিজ, আলী আমজাদের ঘড়ি, ভিআইপি সার্কিট হাউজ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, এমসি কলেজ ক্যাম্পাস, ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, জকিগঞ্জে বরাক-সুরমা কুশিয়ারা তিন নদীর মোহনায় অমলসিদ,   মৌলভীবাজারের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, সাতছড়ি রেইন ফরেস্ট, গোয়াইনঘাটে রাতারগুল ফরেস্ট, স্বচ্ছ জলের বহমান ধারার লালাখাল। এছাড়াও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন নাজিমগড় রিসোর্ট, জাকারিয়া সিটি, ড্রিমল্যান্ড পার্ক রয়েছে এখানে। কোথাও কোন কোলাহল নেই।
হরতাল, অবরোধ আর সহিংস ঘটনায় সিলেটের পর্যটন ব্যবসাসহ অন্যান্য ব্যবসায়ও মারাত্মক ধস নেমেছে–মন্তব্য করে ব্যবসায়ীরা বলেন, “পর্যটননির্ভর হোটেল-মোটেলতো বটেই, পরিবহন ব্যবসায় মারাত্মক ক্ষতির সম্মুখীন।” তারা জানান, অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংক ঋণ নিয়ে বিপাকে আছেন। আমদানি-রপ্তানি ব্যবসার সাথে জড়িত কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, সিলেটের শুল্ক স্টেশন দিয়ে পণ্য আমদানি-রফতানি স্বাভাবিক রাখতে হিমশিম খাচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা। পণ্যবাহী ট্রাকে আগুন দেয়ার ঘটনায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সহিংসতা এড়াতে ব্যবসায়ীরা দিনের পরিবর্তে গভীর রাতে ট্রাক দিয়ে পণ্য পরিবহন করছেন। এতে ট্রাক ভাড়া প্রায় আড়াই গুণ দিতে হচ্ছে। প্রশ্ন করে বলেন, এই অবস্থায় ক’দিন চলা যাবে।
বিভিন্ন পর্যটন স্পট পরিদর্শন ও খোঁজ-খবর নিয়ে জানা যায় পর্যটন স্পটগুলোতে লোক নেই। ঐসব স্পটের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও ক্রেতার অভাবে বিপাকে। অনেকেই না খেয়ে আছেন। এসময়ে সিলেটের হোটেলে-রেস্টুরেন্টে বুকিং দিয়েও সিট না পাওয়ার কথা। কিন্তু হোটেল-মোটেল এখন খালি যাচ্ছে। হযরত শাহজালাল (র.) এর মাজার সংলগ্ন বেশকিছু হোটেলের ম্যানেজাররা জানান, তারা যেখানে ব্যবস্থা থাকার কথা সেখানে এখন তারা অলস সময় কটাচ্ছেন, গেস্ট নেই। সিলেট চেম্বারের পরিচালক শিপার আহমদ বলেন, এখন আমরা বলির পাঠা, আমাদের কথা কেউ চিন্তাও করে না। কর্মচারীদের বেতনও দেয়া এখন মুষ্কিল। “আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকেছে। গত বছরও পর্যটন নির্ভর হোটেল ব্যবসায়ীসহ সকল ব্যবসায়ী মার খেয়েছে। এই বছর আশায় ছিলাম হয়তো লোকসানটা কোন রকমে কাটিয়ে উঠবো। কিন্তু সে আশার গুড়ে বালি”, মন্তব্য করে সিলেট ‘মেট্রো ইন্টারন্যাশনাল’ হোটেলের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও সিলেট হোটেল এন্ড গেস্ট হাইজ ওনার্স গ্রুপের সাবেক প্রেসিডেন্ট খলিলুর রহমান মাসুম গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, “আমরা দেশের স্থিতিশীলতা চাই। প্রতিদিন সিলেটে ৩-৪ কোটি টাকার ক্ষতি হচ্ছে। সাধারণ মানুষ অর্থনৈতিক চাপে পড়েছে।”

সরকার ও বিরোধীদলের প্রতি শান্তিপূর্ণ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানিয়ে সিলেটের ব্যবসায়ী নেতৃবৃন্দ বলেন, “ব্যবসা-বাণিজ্য বিনাশ হওয়ার আগে আমাদের বাঁচান।”