তীব্র শীতে তিন জনের মৃত্যু

চলতি সপ্তাহে সারাদেশে শুরু হওয়া শৈত্যপ্রবাহের দাপট এখনও অব্যাহত আছে। শীতজনিত কারণে তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। ইত্তেফাক সংবাদদাতাদের পাঠানো খবরঃ

চাটমোহর (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, পাবনার চাটমোহরসহ চলনবিলাঞ্চলে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির পর শনিবার থেকে শীত জেঁকে বসেছে।  শীতের তীব্রতায় জনজীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা। সেই সাথে বয়ে যাওয়া উত্তরের হিমেল বাতাস শরীরে কাঁটার মতো বিঁধছে। গতকাল ২য় দিনের মতো সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। এই অবস্থায় শিশু ও বৃদ্ধসহ মানুষ, গৃহপালিত পশুপাখি শীতের তীব্রতায় কাবু হয়ে পড়েছে। শীতজনিত রোগে আক্রান্তদের হাসপাতালে ভীড় করতে দেখা গেছে। শীতজনিত কারণে এ অঞ্চলে ২ জন মারা গেছেন। এরা হলেন চাটমোহরের শান্তি বালা (৭৫) ও ভাঙ্গুড়ার খানমরিচের আবেদ আলী (৭০)।
জীবননগর (চুয়াডাঙ্গা) সংবাদদাতা জানান, মৃদু শৈত্যপ্রবাহের কারণে গতকাল এ উপজেলায় রৌদ্রের মুখ দেখা যায়নি। চুয়াডাঙ্গা আবহাওয়া অফিস গতকাল এ জেলায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রার রেকর্ড করেছে ৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। হাড় কাঁপানো তীব্র শীতে জীবননগরে আরো একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। রবিবার রাত আনুমানিক ৯টার দিক উপজেলার মোক্তারপুর গ্রামের জাহাবক্স মন্ডল (৭৮) তীব্র শীতের মধ্যে অসুস্থ হয়ে মারা যায় বলে গ্রামবাসী জানিয়েছে।
বেড়া (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, পাবনা জেলার বেড়া উপজেলাতে কয়েকদিন ধরে  তীব্র শীতে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। মাঝে মধ্য সূর্য উঠলেও কুয়াশার আড়ালে তা ঢেকে যায়। তীব্র শীত আর ঘন কুয়াশার সাথে ঠান্ডা বাতাস কাবু করে ফেলছে মানুষকে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে চরাঞ্চলের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ। প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্রের অভাব আর খোলা মাঠে বাড়ির অবস্থানের কারণে শীত যেন দু:স্বপ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে তাদের কাছে। এখন পর্যন্ত কোন সাহায্য পায়নি তারা। হাসপাতালে ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। শিশু এবং বৃদ্ধরা শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় সবচেয়ে  বেশি ভুগছে। উপজেলার উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রগুলোতেও ঠান্ডায় আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি।
সৈয়দপুর (নীলফামারী) সংবাদদাতা জানান, নীলফামারীর সৈয়দপুরে আবারও শীত জেঁকে বসেছে। মাঘের শুরুতে এই কনকনে ঠান্ডা ও হিমেল হাওয়ায় জনজীবন স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে করে গরিব ও অসহায় মানুষ শীতবস্ত্রের অভাবে অবর্ণনীয় কষ্টে পড়েছেন। কয়েকদিন আগে বৃষ্টিপাতের পর এই ঠান্ডা অনেকটা হুল ফোটার মতো মনে হচ্ছে। বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া কেউ বাইরে বেরুতে পারছেন না। গত কয়েকদিন ধরে সারাদিন সূর্যের দেখা মিলছে না। হঠাত্ আবহাওয়ার এই পরিবর্তনে শীতজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। হাসপাতালগুলোতে শিশু ও বৃদ্ধদের শীতজনিত রোগে আক্রান্ত জয়ে ভর্তি হতে দেখা গেছে।
কটিয়াদী (কিশোরগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে হাড় কাঁপানো শীতে জবুথবু হয়ে পড়েছে পরিবেশ। গত কয়েক দিন ধরে সূর্যের দেখা মিলেনি। সকাল থেকে বেলা বাড়ার সাথে সাথে শুরু হয় তীব্র বাতাস। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া মানুষজন ঘরের বাইরে বের হচ্ছে না। বিকাল থেকে শুরু হয় শৈত্যপ্রবাহ। শীতের এই তীব্রতা উপেক্ষা করে শ্রমিক, রিকশাচালক, অটোচালকসহ কর্মমুখী মানুষ বেরিয়ে পড়ে কাজের সন্ধানে। সবচেয়ে বিপাকে পড়েছে শ্রমজীবী মানুষ।  রাস্তার পাশে দোকানের সামনে ও গ্রামের বিভিন্ন স্থানে মানুষ খড়কুটায় আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে। এদিকে পৌর শহরের গরম কাপড়ের দোকানগুলোতে উপচেপড়া ভীড় জমছে।
ঈশ্বরদী (পাবনা) সংবাদদাতা জানান, শৈত্যপ্রবাহে কাহিল হয়ে পড়েছে ঈশ্বরদীর মানুষ। সোমবারও দেখা মেলেনি সূর্য্যের। ২৪ ঘন্টার ব্যবধানে তাপমাত্রা ৩.৩ ডিগ্রী নেমেছে। রবিবার তাপমাত্রা ছিল ১১.৩ ডিগ্রী। আর সোমবার তাপমাত্রা ৮ ডিগ্রী রেকর্ড করা হয়েছে। উত্তরের হিমেল দমকা বাতাসে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। সর্বত্র নেমে এসেছে স্থবিরতা। রেল স্টেশন এলাকায় ও বাসস্ট্যান্ডে এবং বিভিন্ন রাস্তার ধারে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের জন্য চেষ্টা করছে।
উল্লাপাড়া (সিরাজগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, প্রচণ্ড শীত ও উত্তরের হিমেল হাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে উল্লাপাড়ার জনজীবন। তিনদিন ধরে সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। সকালে কুয়াশার সঙ্গে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি মানুষের দুর্ভোগকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি অনেক কমে গেছে। সকাল ১০টা পর্যন্ত পৌরশহরের রাস্তাঘাটগুলো ফাঁকা থাকছে। এদিকে ফুটপাতের পুরানো গরম কাপড়ের দোকানগুলোতে মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। করতোয়া পাড়ের, চরসাত বাড়িয়া, গুচ্ছগ্রাম, আদর্শ গ্রাম, চরঘাটিনা ও লক্ষীপুর গ্রামের অভাবী পরিবারগুলো রাতে তাদের ভাঙ্গা ঘরে খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণ করছেন। রাস্তায় দিনের বেলায় হেডলাইট জ্বালিয়ে যানবাহন চলাচল করছে।
ঝিনাইগাতী (শেরপুর) সংবাদদাতা জানান, শেরপুরের সীমান্তবর্তী উপজেলার গারো পাহাড়ে গত ক’দিনের কনকনে শীত ঘনকুয়াশা ও হিমেল হাওয়ায় জন-বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত শনিবার গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হয়। এরপর থেকে শীতের তীব্রতা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। মেঘলা আকাশ আর ঘনকুয়াশায় গত দু’দিনে সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। উপজেলা ট্রাইবাল ওয়েল ফেয়ার এ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান নবেস খকসী, নলকুড়া ইউপি চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান ডেফলাই বেদেপল্লীর সর্দার মাসুদ রানা বলেন, হাড় কাপানো শীতে দরিদ্র, ছিন্নমূল, আদিবাসী ও বেদেপল্লীর লোকজন বেশি কষ্ট পাচ্ছে। পাহাড়ি জনপদের লোকজন আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে। প্রচণ্ড শীত ঘনকুয়াশা আর হিমেল হাওয়ায় শ্রমজীবী লোকজন কাজে বের হতে পারছে না। প্রচণ্ড শীতের কারণে সন্ধ্যার পর রাস্তাঘাট হয়ে পড়ছে জনশূন্য।
মুক্তাগাছা (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা জানান, চলমান শৈত্য প্রবাহের প্রভাবে ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় প্রচণ্ড শীত পড়েছে। গত তিনদিন ধরে সূর্যের দেখা মেলেনি। হাড় কাঁপানো শীতের মধ্যে গরম কাপড়ের অভাবে গ্রামাঞ্চলের দরিদ্র পরিবারগুলো অবর্ণনীয় কষ্ট ভোগ করছে। বেড়েছে শীত জনিত রোগের প্রকোপ। সোমবার কালিবাড়ি, গাবতলী, রসুলপুর, দুল্লাসহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, শীতের প্রকোপ থেকে বাঁচতে লোকজন খড়, গোবরের ঘুটে বা লাকড়ি জ্বালিয়ে দলবদ্ধভাবে আগুন পোহাচ্ছে। গত শনিবার সামান্য বৃষ্টি হবার পর থেকেই এই এলাকায় প্রচণ্ড শীত পড়েছে। শীতের কারণে জমিতে বোরো ধানের চারা লাগাতে পারছেন না বলে কৃষকরা জানিয়েছেন।
নালিতাবাড়ী (শেরপুর) সংবাদদাত জানান, শীতে কাঁপছে শেরপুরের সীমান্তবর্তী নালিতাবাড়ী উপজেলার গারোপাহাড়ের মানুষজন। হতদরিদ্র পাহাড়ি মানুষগুলো প্রয়োজনীয় শীতবস্ত্রের অভাবে তীব্র কষ্ট পাচ্ছে। বিশেষ করে পাহাড়ের অভ্যন্তরে বসবাসকারী মানুষের কষ্টের যেন অন্ত নেই। দিনের বেলাতেই ঘনকুয়াশায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে পাহাড়ি জনপথ। সারাদিন সুর্যের দেখা মিলছে না। তাই প্রয়োজন ছাড়া ঘর থেকে বের হচ্ছে না এলাকাবাসি।
সূত্রমতে, গত ৩ দিন যাবত সীমান্তের নালিতাবাড়ী উপজেলার সমেশ্চুড়া, মধুটিলা, বুরুঙ্গা, বারোমারী, কালাপানি, দাওধারা, কাটাবাড়ি, হাতিপাগার, নাকুগাঁও, কালাকুমা, তারানী, পানিহাটাসহ প্রত্যন্ত পাহাড়ি পল­ীগুলোতে চলছে প্রচণ্ড শীতের তীব্রতা। উত্তর থেকে হিমালয়ের হিমবায়ু আর ঘনকুয়াশায় জেঁকে বসেছে হাড় কাঁপানো শীত।
রাজশাহী অফিস জানায়, রাজশাহী অঞ্চলে চলছে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ। উত্তরের হাড় কাঁপানো ঠাণ্ডা বাতাসে কাবু হয়ে পড়েছে পদ্মা পাড়ের মানুষ। গত তিন দিন ধরে রাজশাহী অঞ্চলে বেড়েছে শীতের তীব্রতা। তবে গতকাল সোমবার ঘন কুয়াশার চাদর ভেদ করে ভোরের সূর্যের দেখা মিলেছে দুপুরে, যদিও সূর্যের এই কিরণ খোলা আকাশের নীচের শীতার্ত মানুষগুলোর শরীরে উষ্ণতা ছড়াতে পারেনি। শৈত্যপ্রবাহে চরম দুর্ভোগে পড়েছে শিশু ও বৃদ্ধরা। আক্রান্ত হচ্ছেন ঠাণ্ডাজনিত বিভিন্ন রোগে। হাসপাতালে বাড়ছে নিউমোনিয়ায় নবজাতকের সংখ্যা। শ্বাসকষ্ট নিয়ে ভর্তি হচ্ছেন অ্যাজমায় আক্রান্ত রোগীরা।
রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক আজিজুল হক জানান, শীত বেড়ে যাওয়ায় সব বয়সের মানুষ ঠাণ্ডাজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। হাসপাতালে ঠাণ্ডাজনিত রোগীর সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে। এসব রোগীর মধ্যে শিশু ও বয়স্কদের সংখ্যাই বেশি।
ঝিনাইগাতী (শেরপুর) সংবাদদাতা জানান, শেরপুরের সীমান্তবর্তী উপজেলার গারো পাহাড়ে গত ক’দিনের কনকনে শীত, ঘন কুয়াশা ও হিমেল হাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গত শনিবার গুঁড়িগুঁড়ি বৃষ্টি হয়। এরপর থেকে শীতের তীব্রতা ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। মেঘলা আকাশ আর ঘন কুয়াশায় গত দুদিনে সূর্যের মুখ দেখা যায়নি। উপজেলা ট্রাইবাল ওয়েল ফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান নবেস খকসী, নলকুড়া ইউপি চেয়ারম্যান খলিলুর রহমান, ডেফলাই বেদেপল্লীর সর্দার মাসুদ রানা বলেন, হাড় কাঁপানো শীতে দরিদ্র, ছিন্নমূল, আদিবাসী ও বেদেপল্লীর লোকজন বেশি কষ্ট পাচ্ছে। পাহাড়ী জনপদের লোকজন আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে। শ্রমজীবী লোকজন কাজে বের হতে পারছে না। সন্ধ্যার পর রাস্তা-ঘাট হয়ে পড়ছে জনশূন্য।

রংপুর প্রতিনিধি জানান, গত দুদিন ধরে রংপুর বিভাগে অব্যাহত শৈত্যপ্রবাহ আর কনকনে হিমেল হাওয়ায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। দেখা মিলছে না সূর্যের। রংপুর আবহাওয়া অফিস সূত্র জানায়, গতকাল সোমবার রংপুরে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১১ ডিগ্রী সেলসিয়াস ও সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ১৬ দশমিক ৪ ডিগ্রী সেলসিয়াস। এই শীত আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকতে পারে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়া অফিস। শীতবস্ত্রের অভাবে কাতরাচ্ছে বিভাগের লাখ লাখ দরিদ্র ও হতদরিদ্র মানুষ। সরকারি ও বেসরকারিভাবে পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র না পাওয়ায় তাদের দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। ছিন্নমূল মানুষ খড়কুটো জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। হাড় কাঁপানো শীতে মানুষের পাশাপাশি কাবু হয়ে পড়েছে গবাদী পশু-পাখিও।